ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, নদ-নদী, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত সহ প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্রে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশ। দক্ষিণে বঙ্গপোসাগর, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে সিকিম ও মেঘালয়, পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মায়ানমার। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মময় রাজনৈতিক জীবন।

এদেশের কৃষক-শ্রমিক, মুটে-মজুর ও মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পরাধীনতার শেকল থেকে আমাদের দেশ মাতৃকা ও বাঙালী জাতিকে মুক্ত করতে যিনি জীবনের সিংহভাগ সময় জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সুচিন্তিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিপিড়িত বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা যে সম্ভব তা সমগ্র পৃথিবীর মানুষের কাছে তিনি প্রমান করেছেন। বঙ্গবন্ধু কেবল বাঙালী জাতির অধিনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পৃথিবীর বঞ্চিত সমগ্র মানব গোষ্ঠির পথ-প্রদর্শক ও মহাননেতা। বঙ্গবন্ধু কেবল মাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি চেয়েছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবিক রাষ্ট্রীয় সভ্যতা, সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, সকল মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুখী সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনের মাধ্যমে বিশ্ব সভায় বাঙালী জাতির সুদৃঢ় অবস্থান সৃষ্টি করতে। এই মহাপুরুষের জন্ম না হলে হয়তো আজকের বাংলাদেশ আমরা পেতাম না।

বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, দর্শন বিশ্ব মানবতার জন্য তাঁর চিন্তা ধারাবাহিক ভাবে লিপিবদ্ধ করা দুঃসাধ্য বৈকি? প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সংক্ষেপে নব প্রজন্মের উদ্দেশ্যে লিপিবদ্ধ করার চিন্তা থেকে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। প্রারম্ভেই আমি টুঙ্গিপাড়ার থোকা থেকে শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা পথ পরিক্রমা সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৭ই মার্চ ১৯২০ সালে ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার আদরের খোকা। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়েরা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন তৃতীয় সন্তান।

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল পরিদর্শনে এলে শৈশবকাল থেকে ডানপিটে স্বভাবের শেখ মুজিব দাবী আদায়ের মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত হন। ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি শেখ ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। হন। তাঁদের দুই কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহেনা ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করার কারণে ১৯৩৯ সালে বঙ্গবন্ধুর কারা জীবন শুরু হয়। ১৯৪২ সালে বঙ্গবন্ধু এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন। ১৯৪৪ সালে শেখ মুজিব কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদানের মাধমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন। একই বছরে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৪৬ সালে শেখ মুজিব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকারীর দায়িত্ব লাভ করেন। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক যুব কর্মীদের সম্মেলনে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন উর্দুকে পাকিস্থানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘটের ডাকদিলে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন কিন্তু পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতার তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান। ফরিদপুরের কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারের প্রায় চার মাস পর ২১ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের দাবি দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তাদের ধর্মঘটকে সমর্থন জানান। আন্দোলনে যোগ দেয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে অযৌক্তিভাবে জরিমানা করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সৃষ্ট আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে জেলে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে না গিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। একই বছর পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হলে খাদ্যের দাবিতে তিনি আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৯৫০ সালের ১লা জানুয়ারি কঠোর আন্দোলনের কারণে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু কারাগারে অনশন শুরু করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতসহ অরো অনেকে নিহত হন। এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বিবৃতি দেন এবং একটানা অনশন অব্যাহত রাখেন। টানা অনশনে অসুস্থ হওয়ায় ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যগত কারণে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। ১৯৫৩ সালের ১৬ নভেম্বর প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়। বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ থেকে বিজয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভায় কৃষিমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভা বাতিল ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু করাচী থেকে ঢাকায় ফিরে এলে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জেল গেটেই নিরাপত্তা আইনে তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয়। কারা মুক্তির পর ১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঢাকার পল্টনের জনসভায় তিনি পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দাবী করেন। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ পূর্বক দলের নাম পরিবর্তন করে মুসলিম আওয়ামী লীগ থেকে আওয়ামী লীগ নামকরণ করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারী করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া হয় এবং তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। জামিনে মুক্তি পেলেও তাঁর গতিবিধির উপর নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকে। ঐ সময় তিনি বার বার গ্রেফতার হন এবং আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ৪ বছরের সামরিক শাসনের অবসানের পর ১৯৬২ সালের ১৮ জুন শেখ মুজিব মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল কমবাইন্ড অপজিশন পার্টি (কঅপ) গঠিত হওয়ার পর ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কঅপ এর পক্ষ থেকে মিস ফাতিমা জিন্নাহকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন করে, নির্বাচনী প্রচারনার সময় শেখ মুজিবকে নির্বাচনের ১৪ দিন আগে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। ঐ নির্বাচনে ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইয়ুব খান বন্দুকের নলে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সনদ ৬ দফা গৃহীত হয়। ৬ দফার পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গঠনে প্রচারণা শুরু করলে বঙ্গবন্ধুকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়। আইয়ুব সরকার ৩ মাসে শেখ মুজিবকে ৮ বার গ্রেফতার করে তাঁকে নির্জন কারাবাসে প্রেরণ করে।

 

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে ৩৫ জন বাঙ্গালী সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন। বঙ্গবন্ধু নিজেদের নিদোর্ষ দাবি করে আদালতে লিখিত বিবৃতি দেন। এই বিবৃতি বাংলার মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেলে শেখ মুজিবসহ সকলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সাধারণ মানুষের আন্দোলন পর্যায়ক্রমে তীব্র গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র সমাজ ছয় দফা দাবির সমর্থনে ১১ দফা দাবী উপস্থাপন করে। উদ্ভুত পরিস্থিতি ঠেকাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার ১৯৬৯ সালের ৩০ জানুয়ারি আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেয়া হলে শেখ মুজিব ওদের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে বিক্ষুব্ধ জনতা বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে সরকার নতি স্বীকারে বাধ্য হয়ে শেখ মুজিবসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ডাকসু এবং ছাত্রলীগ একসঙ্গে ঢাকায় বিশাল সম্বর্ধনা সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আইয়ুব খান রাওয়াল পিন্ডিতে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ৬ দফার পক্ষে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় অবস্থান নিলে বৈঠক কোন সিদ্ধান্ত ছাড়ায় ভন্ডুল হয়ে যায়। গোল টেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় আইয়ুব খান সামরিক প্রধান ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ক্ষমতায় এসে ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারী করেন। সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা

আপডেট টাইম : ০৬:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ অগাস্ট ২০২৩

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, নদ-নদী, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত সহ প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্রে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশ। দক্ষিণে বঙ্গপোসাগর, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে সিকিম ও মেঘালয়, পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মায়ানমার। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মময় রাজনৈতিক জীবন।

এদেশের কৃষক-শ্রমিক, মুটে-মজুর ও মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পরাধীনতার শেকল থেকে আমাদের দেশ মাতৃকা ও বাঙালী জাতিকে মুক্ত করতে যিনি জীবনের সিংহভাগ সময় জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সুচিন্তিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিপিড়িত বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা যে সম্ভব তা সমগ্র পৃথিবীর মানুষের কাছে তিনি প্রমান করেছেন। বঙ্গবন্ধু কেবল বাঙালী জাতির অধিনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পৃথিবীর বঞ্চিত সমগ্র মানব গোষ্ঠির পথ-প্রদর্শক ও মহাননেতা। বঙ্গবন্ধু কেবল মাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি চেয়েছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবিক রাষ্ট্রীয় সভ্যতা, সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, সকল মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুখী সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনের মাধ্যমে বিশ্ব সভায় বাঙালী জাতির সুদৃঢ় অবস্থান সৃষ্টি করতে। এই মহাপুরুষের জন্ম না হলে হয়তো আজকের বাংলাদেশ আমরা পেতাম না।

বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, দর্শন বিশ্ব মানবতার জন্য তাঁর চিন্তা ধারাবাহিক ভাবে লিপিবদ্ধ করা দুঃসাধ্য বৈকি? প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সংক্ষেপে নব প্রজন্মের উদ্দেশ্যে লিপিবদ্ধ করার চিন্তা থেকে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। প্রারম্ভেই আমি টুঙ্গিপাড়ার থোকা থেকে শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা পথ পরিক্রমা সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৭ই মার্চ ১৯২০ সালে ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার আদরের খোকা। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়েরা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন তৃতীয় সন্তান।

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল পরিদর্শনে এলে শৈশবকাল থেকে ডানপিটে স্বভাবের শেখ মুজিব দাবী আদায়ের মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত হন। ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি শেখ ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। হন। তাঁদের দুই কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহেনা ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করার কারণে ১৯৩৯ সালে বঙ্গবন্ধুর কারা জীবন শুরু হয়। ১৯৪২ সালে বঙ্গবন্ধু এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন। ১৯৪৪ সালে শেখ মুজিব কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদানের মাধমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন। একই বছরে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৪৬ সালে শেখ মুজিব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকারীর দায়িত্ব লাভ করেন। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক যুব কর্মীদের সম্মেলনে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন উর্দুকে পাকিস্থানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘটের ডাকদিলে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন কিন্তু পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতার তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান। ফরিদপুরের কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারের প্রায় চার মাস পর ২১ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের দাবি দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তাদের ধর্মঘটকে সমর্থন জানান। আন্দোলনে যোগ দেয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে অযৌক্তিভাবে জরিমানা করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সৃষ্ট আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে জেলে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে না গিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। একই বছর পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হলে খাদ্যের দাবিতে তিনি আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৯৫০ সালের ১লা জানুয়ারি কঠোর আন্দোলনের কারণে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু কারাগারে অনশন শুরু করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতসহ অরো অনেকে নিহত হন। এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বিবৃতি দেন এবং একটানা অনশন অব্যাহত রাখেন। টানা অনশনে অসুস্থ হওয়ায় ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যগত কারণে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। ১৯৫৩ সালের ১৬ নভেম্বর প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়। বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ থেকে বিজয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভায় কৃষিমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভা বাতিল ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু করাচী থেকে ঢাকায় ফিরে এলে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জেল গেটেই নিরাপত্তা আইনে তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয়। কারা মুক্তির পর ১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঢাকার পল্টনের জনসভায় তিনি পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দাবী করেন। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ পূর্বক দলের নাম পরিবর্তন করে মুসলিম আওয়ামী লীগ থেকে আওয়ামী লীগ নামকরণ করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারী করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া হয় এবং তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। জামিনে মুক্তি পেলেও তাঁর গতিবিধির উপর নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকে। ঐ সময় তিনি বার বার গ্রেফতার হন এবং আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ৪ বছরের সামরিক শাসনের অবসানের পর ১৯৬২ সালের ১৮ জুন শেখ মুজিব মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল কমবাইন্ড অপজিশন পার্টি (কঅপ) গঠিত হওয়ার পর ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কঅপ এর পক্ষ থেকে মিস ফাতিমা জিন্নাহকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন করে, নির্বাচনী প্রচারনার সময় শেখ মুজিবকে নির্বাচনের ১৪ দিন আগে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। ঐ নির্বাচনে ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইয়ুব খান বন্দুকের নলে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সনদ ৬ দফা গৃহীত হয়। ৬ দফার পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গঠনে প্রচারণা শুরু করলে বঙ্গবন্ধুকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়। আইয়ুব সরকার ৩ মাসে শেখ মুজিবকে ৮ বার গ্রেফতার করে তাঁকে নির্জন কারাবাসে প্রেরণ করে।

 

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে ৩৫ জন বাঙ্গালী সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন। বঙ্গবন্ধু নিজেদের নিদোর্ষ দাবি করে আদালতে লিখিত বিবৃতি দেন। এই বিবৃতি বাংলার মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেলে শেখ মুজিবসহ সকলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সাধারণ মানুষের আন্দোলন পর্যায়ক্রমে তীব্র গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র সমাজ ছয় দফা দাবির সমর্থনে ১১ দফা দাবী উপস্থাপন করে। উদ্ভুত পরিস্থিতি ঠেকাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার ১৯৬৯ সালের ৩০ জানুয়ারি আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেয়া হলে শেখ মুজিব ওদের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে বিক্ষুব্ধ জনতা বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে সরকার নতি স্বীকারে বাধ্য হয়ে শেখ মুজিবসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ডাকসু এবং ছাত্রলীগ একসঙ্গে ঢাকায় বিশাল সম্বর্ধনা সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আইয়ুব খান রাওয়াল পিন্ডিতে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ৬ দফার পক্ষে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় অবস্থান নিলে বৈঠক কোন সিদ্ধান্ত ছাড়ায় ভন্ডুল হয়ে যায়। গোল টেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় আইয়ুব খান সামরিক প্রধান ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ক্ষমতায় এসে ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারী করেন। সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন।