ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবুন

ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের আর কোনো নির্বাচনেই দলীয় প্রতীক ব্যবহার করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সোমবার দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিলম্বে হলেও এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। আইন সংশোধন করে ২০১৫ সালে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনব্যবস্থা চালু করেছিল বর্তমান সরকার। এর পর কয়েক দফায় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হয়েছে।

কোন্দল ও সহিংসতা ঠেকাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না দেওয়ার এই মত এসেছে। তবে একদম শুরু থেকেই গণমাধ্যমসহ নানা জায়গায় এটি বলা হচ্ছিল যে, প্রতীকের কারণে বিবাদ বাড়বে।

প্রান্তিক পর্যায়ে বিএনপি ভালো অবস্থানে না থাকায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা, বড় নেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি, লবিং, রমরমা মনোনয়ন বাণিজ্য এবং পরিণতিতে সহিংসতা, খুন ও জখম স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দলীয় প্রতীক দেওয়ার বিধান শুরু হওয়ার পর থেকে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই পরিবেশটা কয়েক বছর ধরে সহিংস হয়ে গিয়েছিল।

সরকালদলীয় প্রতীক পেতে সবাই মরিয়া। তৃণমূলের ঘরে ঘরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ঘরে ঘরে বিবাদ। নির্বাচনী হিংসার বহুবিধ ঘটনার কোনটার পেছনে কে বা কারা, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে জনগণ যেন এক গোলকধাঁধায় নিক্ষিপ্ত। এগুলোর কোনটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফল বা ক্ষমতা দখলের প্রকাশভঙ্গি বা কোনটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ বা কোন দলের কোন্দলের ফসল, কোনটা আবার একেবারেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন আর্থিক স্বার্থের লড়াই, তা সার্বিকভাবে বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

নৌকা প্রতীক পাওয়া মানেই হাতে যেন সেই এলাকা ও সেখানকার দলীয় মালিকানা দখলে চলে আসা। তাই এই মালিকান পেতে যা করা দরকার সেটা করতে কেউ কার্পণ্য করছিল না। জায়গামতো টাকা-পয়সা প্রদান করে নৌকা পাওয়ার প্রচেষ্টায় মনোনয়ন বাণিজ্যের বড় অভিযোগ খোদ দলের ভেতর থেকেই উচ্চারিত। কোথাও কোথাও এমন ঘটনাও ঘটছে যে, যাকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে কর্মী ও এলাকার ভোটার নেই। যাকে বঞ্চিত করা হলো তিনি ত্যাগী এবং তার তুমুল জনপ্রিয়। ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আর তাই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে হারাতে দলের ভেতরেই একটি অংশ উঠেপড়ে লেগে যাচ্ছিল। গোপালগঞ্জের মতো জায়গায়ও স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক হেরেছে দলীয় বিদ্রোহীর কাছে। এমনটা ঘটেছে এবারের সংসদ নির্বাচনেও। অনেক আসনেই দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে নৌকা প্রার্থী হেরেছেন।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন দেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থারও পরিপন্থী। দেশ চলছে সংসদীয় পদ্ধতিতে, অথচ স্থানীয় সরকার কাঠামোটা রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির। একজন চেয়ারম্যান বা মেয়র হয়ে উঠছেন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। সেই পদকে ঘিরেই সব প্রকল্প, পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত। যদি কাউন্সিলররা নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র করার বিধান থাকত তা হলে প্রতীক থাকলেও সবার জন্যই থাকত, কোনো একজনের জন্য বরাদ্দ হতো না। সংসদে কিন্তু সবাই মিলে সংসদীয় নেতা ঠিক করেন।

এতদিন পর এসে শাসক দলের বোধোদয় হয়েছে যে, একজনকে প্রতীক দিলে অন্যরা বিরোধিতায় নামেন। এতে দলে বিভেদ বাড়ে। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার আইন করে ইউপিসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা সরকারি দলের জন্য তো বটেই, দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্যই ভালো হয়নি। বরং দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত-সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। এখন ঘরে ঘরে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং আর কোন্দল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। সমাজের সুশাসনের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় দলীয় প্রতীক ব্যবহার করার মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা করা হয়েছে প্রতীকের মাধ্যমে যা সমাজকে আরও বিভক্ত করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের পছন্দমতো, এলাকায় উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে এমন মানুষকে নির্বাচিত করে আনার প্রক্রিয়াটাই বন্ধ হয়ে গেছে দলীয় প্রতীকের কারণে। গ্রামে আর জনপদে নির্বাচন এখন এক আতঙ্কের নাম।

প্রতীক থেকে সরে এসেছে ভালো কথা, কিন্তু স্থানীয় সরকার কাঠামোকে আরও স্বশাসন দেওয়া, আরও স্বাধীন করার কথাও ভাবতে হবে। এখনকার আইনে স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচিত সদস্যকে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করতে পারে। নির্বাহী বিভাগের কাছে এমনি একটি ক্ষমতা রয়েছে। এর অনেক রাজনৈতিক অপব্যবহারের নজির আছে। এর অর্থ হলো নির্বাহী বিভাগের পরিচালনায় ও নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হচ্ছে। এই আইনটি নিবর্তনমূলক। স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান বা মেয়র হোক বা কাউন্সিলর হোক, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসেন। বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরাও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। কিন্তু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তাকে বরখাস্ত বা তার সংসদ সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া যায় না। তা হলে স্থানীয় সরকারে এই বিধান কেন থাকবে? এতে করে সরকার কাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংবিধান মোতাবেক স্থানীয় স্তরে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার অর্থ হলো প্রান্তিক মানুষকে ক্ষমতায়িত করা। স্থানীয় সরকার যাতে পর্যাপ্ত শক্তি পায়, তার জন্য তাকে স্বাধীনভাবে বাজেট করার অধিকার দেওয়া দরকার। স্থানীয় সরকারগুলো কী কী অধিকার ও দায়িত্ব পাবে, কর্মী কোথা থেকে আসবে, সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক কী হবে, সরকারের কোন কোন অংশ স্থানীয় সরকারের আওতায় আসবে, তাদের কাজ কী কী হবে ইত্যাদি সবকিছু সংজ্ঞায়িত থাকা দরকার।

স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হলে শাসনব্যবস্থায় ও মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসবে। রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের কাজটা এভাবেই হয়। কেন্দ্রীভূত রাজনীতির জাঁতাকলে আমাদের স্থানীয় সরকার কাঠামোটা দাঁড়াতেই পারেনি। ফলে দেশটা বিকেন্দ্রীকরণের পথেই গেল না। দলতন্ত্র আর আমলাতন্ত্র এক হয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হতে না দিলে শাসনব্যবস্থায় মানুষের ভাবনা আসবে কীভাবে?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবুন

আপডেট টাইম : ০৬:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৪

ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের আর কোনো নির্বাচনেই দলীয় প্রতীক ব্যবহার করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সোমবার দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিলম্বে হলেও এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। আইন সংশোধন করে ২০১৫ সালে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনব্যবস্থা চালু করেছিল বর্তমান সরকার। এর পর কয়েক দফায় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হয়েছে।

কোন্দল ও সহিংসতা ঠেকাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না দেওয়ার এই মত এসেছে। তবে একদম শুরু থেকেই গণমাধ্যমসহ নানা জায়গায় এটি বলা হচ্ছিল যে, প্রতীকের কারণে বিবাদ বাড়বে।

প্রান্তিক পর্যায়ে বিএনপি ভালো অবস্থানে না থাকায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা, বড় নেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি, লবিং, রমরমা মনোনয়ন বাণিজ্য এবং পরিণতিতে সহিংসতা, খুন ও জখম স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দলীয় প্রতীক দেওয়ার বিধান শুরু হওয়ার পর থেকে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই পরিবেশটা কয়েক বছর ধরে সহিংস হয়ে গিয়েছিল।

সরকালদলীয় প্রতীক পেতে সবাই মরিয়া। তৃণমূলের ঘরে ঘরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ঘরে ঘরে বিবাদ। নির্বাচনী হিংসার বহুবিধ ঘটনার কোনটার পেছনে কে বা কারা, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে জনগণ যেন এক গোলকধাঁধায় নিক্ষিপ্ত। এগুলোর কোনটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফল বা ক্ষমতা দখলের প্রকাশভঙ্গি বা কোনটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ বা কোন দলের কোন্দলের ফসল, কোনটা আবার একেবারেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন আর্থিক স্বার্থের লড়াই, তা সার্বিকভাবে বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

নৌকা প্রতীক পাওয়া মানেই হাতে যেন সেই এলাকা ও সেখানকার দলীয় মালিকানা দখলে চলে আসা। তাই এই মালিকান পেতে যা করা দরকার সেটা করতে কেউ কার্পণ্য করছিল না। জায়গামতো টাকা-পয়সা প্রদান করে নৌকা পাওয়ার প্রচেষ্টায় মনোনয়ন বাণিজ্যের বড় অভিযোগ খোদ দলের ভেতর থেকেই উচ্চারিত। কোথাও কোথাও এমন ঘটনাও ঘটছে যে, যাকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে কর্মী ও এলাকার ভোটার নেই। যাকে বঞ্চিত করা হলো তিনি ত্যাগী এবং তার তুমুল জনপ্রিয়। ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আর তাই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে হারাতে দলের ভেতরেই একটি অংশ উঠেপড়ে লেগে যাচ্ছিল। গোপালগঞ্জের মতো জায়গায়ও স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক হেরেছে দলীয় বিদ্রোহীর কাছে। এমনটা ঘটেছে এবারের সংসদ নির্বাচনেও। অনেক আসনেই দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে নৌকা প্রার্থী হেরেছেন।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন দেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থারও পরিপন্থী। দেশ চলছে সংসদীয় পদ্ধতিতে, অথচ স্থানীয় সরকার কাঠামোটা রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির। একজন চেয়ারম্যান বা মেয়র হয়ে উঠছেন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। সেই পদকে ঘিরেই সব প্রকল্প, পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত। যদি কাউন্সিলররা নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র করার বিধান থাকত তা হলে প্রতীক থাকলেও সবার জন্যই থাকত, কোনো একজনের জন্য বরাদ্দ হতো না। সংসদে কিন্তু সবাই মিলে সংসদীয় নেতা ঠিক করেন।

এতদিন পর এসে শাসক দলের বোধোদয় হয়েছে যে, একজনকে প্রতীক দিলে অন্যরা বিরোধিতায় নামেন। এতে দলে বিভেদ বাড়ে। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার আইন করে ইউপিসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা সরকারি দলের জন্য তো বটেই, দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্যই ভালো হয়নি। বরং দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত-সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। এখন ঘরে ঘরে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং আর কোন্দল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। সমাজের সুশাসনের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় দলীয় প্রতীক ব্যবহার করার মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা করা হয়েছে প্রতীকের মাধ্যমে যা সমাজকে আরও বিভক্ত করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের পছন্দমতো, এলাকায় উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে এমন মানুষকে নির্বাচিত করে আনার প্রক্রিয়াটাই বন্ধ হয়ে গেছে দলীয় প্রতীকের কারণে। গ্রামে আর জনপদে নির্বাচন এখন এক আতঙ্কের নাম।

প্রতীক থেকে সরে এসেছে ভালো কথা, কিন্তু স্থানীয় সরকার কাঠামোকে আরও স্বশাসন দেওয়া, আরও স্বাধীন করার কথাও ভাবতে হবে। এখনকার আইনে স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচিত সদস্যকে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করতে পারে। নির্বাহী বিভাগের কাছে এমনি একটি ক্ষমতা রয়েছে। এর অনেক রাজনৈতিক অপব্যবহারের নজির আছে। এর অর্থ হলো নির্বাহী বিভাগের পরিচালনায় ও নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হচ্ছে। এই আইনটি নিবর্তনমূলক। স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান বা মেয়র হোক বা কাউন্সিলর হোক, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসেন। বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরাও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। কিন্তু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তাকে বরখাস্ত বা তার সংসদ সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া যায় না। তা হলে স্থানীয় সরকারে এই বিধান কেন থাকবে? এতে করে সরকার কাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংবিধান মোতাবেক স্থানীয় স্তরে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার অর্থ হলো প্রান্তিক মানুষকে ক্ষমতায়িত করা। স্থানীয় সরকার যাতে পর্যাপ্ত শক্তি পায়, তার জন্য তাকে স্বাধীনভাবে বাজেট করার অধিকার দেওয়া দরকার। স্থানীয় সরকারগুলো কী কী অধিকার ও দায়িত্ব পাবে, কর্মী কোথা থেকে আসবে, সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক কী হবে, সরকারের কোন কোন অংশ স্থানীয় সরকারের আওতায় আসবে, তাদের কাজ কী কী হবে ইত্যাদি সবকিছু সংজ্ঞায়িত থাকা দরকার।

স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হলে শাসনব্যবস্থায় ও মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসবে। রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের কাজটা এভাবেই হয়। কেন্দ্রীভূত রাজনীতির জাঁতাকলে আমাদের স্থানীয় সরকার কাঠামোটা দাঁড়াতেই পারেনি। ফলে দেশটা বিকেন্দ্রীকরণের পথেই গেল না। দলতন্ত্র আর আমলাতন্ত্র এক হয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হতে না দিলে শাসনব্যবস্থায় মানুষের ভাবনা আসবে কীভাবে?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন