ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

বোরোর রেকর্ড দামেও লোকসানে কৃষক

চলতি বোরো মৌসুমে গত বোরো মৌসুমের তুলনায় ধানের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। জাতভেদে প্রতি মণ ধানের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। তার পরও লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কৃষিজ উপকরণ, বিশেষ করে সার, কীটনাশক, শ্রমিক খরচ, সেচ ও অনান্য খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ধানের দাম বাড়ার পরও কৃষক এই লোকসানে পড়েছেন।

আবার বাজারে ধানের সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে চালের বাজার অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছেন মিলাররা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালের মোকামে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁরা।

কৃষকরা বলছেন, প্রতি বিঘা জমিতে গত বছরের চেয়ে চলতি বছর সার প্রয়োগে এক হাজার টাকা, কীটনাশকে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, শ্রমিক খরচ এক থেকে তিন হাজার টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে। গত বছর প্রতি বস্তা সারের দাম ছিল ৮০০ টাকা।

চলতি বছর সেটি বেড়ে ইউরিয়া সার ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। পটাশ সার ৭০০ থেকে দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৪০০ টাকা। প্রতি বিঘা ধানে কীটনাশক স্প্রে করতে খরচ হয়েছিল দুই থেকে চার হাজার টাকা। বর্তমানে খরচ হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা।

এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য বাড়তি খরচ তো আছেই। আবার অনেক জেলায় বিঘাপ্রতি ফলন দুই থেকে চার মণ কম হয়েছে। গত বছর প্রতি মণ ধানের দাম এক হাজার টাকার নিচে ছিল। সে সময় ফলন ভালো হওয়ায় মুনাফা করতে পেরেছিলেন কৃষক। চলতি বছর ধানের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু খরচ বাড়ার সঙ্গে ফলন কম হওয়ায় লোকসানে পড়েছেন কৃষক।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের কৃষক রতন আলী বলেন, ‘এ বছর বোরো মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলায় বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। পোকার আক্রমণও বেশি ছিল। দাবদাহে বেশি সেচ দিতে হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছিলেন। আগের বছর বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছিল ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। এ বছর খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। সেচ ও শ্রমিক খরচ বেশি হওয়ায় এই বাড়তি খরচ হয়েছে। ধানের ফলন ভালো হলে পুষিয়ে নেওয়া যেত। ’

একই অবস্থা কুড়িগ্রাম জেলার কৃষকদের। গত বোরো মৌসুমের তুলনায় এ বছর বোরো ধানের দাম মণপ্রতি জাতভেদে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়লেও উৎপাদন খরচ বাড়ায় কমে গেছে লাভের অঙ্ক। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নন্দীরকুঠি গ্রামের কৃষক জাহের আলী বলেন, ‘গত বছর প্রতি বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করতে খরচ পড়েছিল ২০ হাজার টাকা। ওই সময় ধানের দর ছিল প্রতি মণ গড়ে ৮৫০ টাকা। ফলন হয়েছিল গড়ে প্রতি বিঘায় ২৭ মণ। সে হিসেবে প্রতি বিঘা জমির ধান বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২৩ হাজার টাকা। এ বছর ধানের দাম প্রায় দেড় শ টাকা বেড়েছে। ফলে এক হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি করতে পারছি। কিন্তু এ বছর প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে খরচ পড়েছে ২৩ হাজার টাকার বেশি। ধান পেয়েছি ২৫ মণের কম। ধান বিক্রি করে পেয়েছি প্রায় ২৫ হাজার টাকা, যে জন্য ধানের দাম বাড়লেও লাভ হয়েছে খুব কম। ’

সবচেয়ে বেশি বিপদে চুক্তিভিত্তিক কৃষক

বোরো ধান চাষ করে বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন চুক্তিতে জমি চাষ করা কৃষকরা। সব খরচের পাশাপাশি বর্গাচাষিদের এবার বিঘাপ্রতি বাড়তি প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দিনাজপুর সদর উপজেলার কমলপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘গত বোরো মৌসুমের চেয়ে এবার বোরো মৌসুমে ধানের দাম বেশি। কিন্তু সার, কীটনাশক ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় উচ্চমূল্যে জমি চুক্তি নিয়ে চাষ করা বর্গাচাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাঁরা প্রতি একর জমি ৮০ হাজার টাকায় বছর চুক্তি নিয়েছেন। যাঁদের জমি, তাঁদের তো ক্ষতি কিছুটা কম। কিন্তু জমি বর্গা নিয়ে যাঁরা চাষ করেছেন, তাঁরা খুব বিপদে আছেন। ’

কৃষকের কাছে যখন ধান থাকে না, তখন দাম বাড়ে

নওগাঁ জেলার বৃহত্তর ধান বেচাকেনার হাট মহাদেবপুর উপজেলার চকগৌরিতে গত ২৭ জুন হাট বসেছিল। ওই দিন চকগৌরি হাটে মানভেদে প্রতি মণ ব্রিধান২৮ জাতের ধান এক হাজার ১১০ থেকে এক হাজার ১৫০ টাকা, সুভলতা এক হাজার ১৮০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা, জিরাশাইল এক হাজার ২৪০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা এবং কাটারিভোগ এক হাজার ২৯০ থেকে এক হাজার ৩১০ টাকা দরে বেচাকেনা হয়। অথচ এই ধান মৌসুমের শুরুতে বেচাকেনা হয়েছে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা কম দামে। প্রতি মণ ব্রিধান২৮ ছিল সর্বোচ্চ এক হাজার ৮০ টাকা, সুভলতা এক হাজার ১০০ টাকা। এ ছাড়া জিরাশাইল এক হাজার ১৮০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা এবং কাটারিভোগ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে কৃষকের কাছে ধানের মজুদ প্রায় শেষ। ফলে বাজারে ধানের দাম বাড়ছে। মৌসুমের শুরুতে সরকারিভাবে ন্যায্য দামে ধান সংগ্রহ করা গেলে কৃষকরা কিছুটা লাভবান হতেন। কিন্তু সরকারের ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে গতি না থাকায় চলতি মৌসুমে পাঁচ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত ৭ মে থেকে শুরু হয়েছে ধান সংগ্রহ, শেষ হবে ৩১ আগস্ট। জুন মাস শেষে মোট ধানের মাত্র ৩০ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, যদিও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে বর্তমানে ধানের মজুদ খুবই কম। মজুদ যা রয়েছে সব ব্যবসায়ী ও মিলারদের কাছে। এ কারণে সরকারি সংগ্রহের সুফল কৃষকরা পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা ধান বিক্রি করে দেন। কারণ ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ ও অনান্য খরচ মেটানোর চাপ থাকে। ফলে বাজারে কম দামে তাঁরা ধান বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ওই সময়টায় যদি সরকারের ধান সংগ্রহ কার্যক্রম গতিশীল থাকে, তাহলে কৃষক কিছুটা উপকৃত হন। সেটি না হওয়ায় গত এক যুগের বেশি সময় ধরে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সরকার একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে ন্যূনতম লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। উল্টো তারা মিলার ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করছে। ’

তিনি বলেন, ‘কয়েক কোটি টন ধান উৎপাদিত হলেও সংগ্রহ হয় মাত্র পাঁচ লাখ টন। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার ধান দিতে গিয়ে বহু রকম হয়রানির শিকার হন কৃষক। এ কারণে কৃষকের ক্ষেত থেকেই ধান সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু করতে হবে। পাশাপাশি চাল সংগ্রহ কমিয়ে কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম আরো বাড়াতে হবে। সরকারের খাদ্যগুদাম ৫০ লাখ টনে উন্নীত করতে হবে।

কৃত্রিম সংকট মিলারদের

ভরা মৌসুমেও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম দুই থেকে চার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন মিল মালিক ও আড়তদাররা। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ও বন্যার অজুহাতে তাঁরা এই খরচ বাড়িয়েছেন; যার নেতিবাচক প্রভাব শিগগিরই রাজধানীর বাজারে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ কারণে বাজারে এখন থেকে অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। সরকার মোটা চাল সংগ্রহের পাশাপাশি সরু চাল কেনা শুরু করলে বাজারের এই অস্থিরতা কমবে। সেই সঙ্গে ধান-চাল সংগ্রহের উদ্দেশ্যও সফল হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘বর্তমানে বোরোর ভরা মৌসুম চলছে। বাজারে ধানের সরবরাহে সংকট নেই। এই সময় চালের দাম বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে মানভেদে প্রতি কেজি চালের দাম দু-তিন টাকা বেড়েছে। কারণ এখনো জেলার বেশির ভাগ চালকল বোরো মৌসুমের ধান থেকে চাল উৎপাদন শুরু করেনি। মোকামে চালের সরবরাহ সংকটের কারণে বর্তমানে বেশি দামে চাল বেচাকেনা হচ্ছে। চালকলগুলো পুরোপুরি চালু হলে দ্রুত চালের বাজার আবারও নিয়ন্ত্রণে আসবে। ’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

বোরোর রেকর্ড দামেও লোকসানে কৃষক

আপডেট টাইম : ০৫:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুলাই ২০২৪

চলতি বোরো মৌসুমে গত বোরো মৌসুমের তুলনায় ধানের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। জাতভেদে প্রতি মণ ধানের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। তার পরও লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কৃষিজ উপকরণ, বিশেষ করে সার, কীটনাশক, শ্রমিক খরচ, সেচ ও অনান্য খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ধানের দাম বাড়ার পরও কৃষক এই লোকসানে পড়েছেন।

আবার বাজারে ধানের সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে চালের বাজার অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছেন মিলাররা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালের মোকামে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁরা।

কৃষকরা বলছেন, প্রতি বিঘা জমিতে গত বছরের চেয়ে চলতি বছর সার প্রয়োগে এক হাজার টাকা, কীটনাশকে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, শ্রমিক খরচ এক থেকে তিন হাজার টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে। গত বছর প্রতি বস্তা সারের দাম ছিল ৮০০ টাকা।

চলতি বছর সেটি বেড়ে ইউরিয়া সার ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। পটাশ সার ৭০০ থেকে দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৪০০ টাকা। প্রতি বিঘা ধানে কীটনাশক স্প্রে করতে খরচ হয়েছিল দুই থেকে চার হাজার টাকা। বর্তমানে খরচ হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা।

এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য বাড়তি খরচ তো আছেই। আবার অনেক জেলায় বিঘাপ্রতি ফলন দুই থেকে চার মণ কম হয়েছে। গত বছর প্রতি মণ ধানের দাম এক হাজার টাকার নিচে ছিল। সে সময় ফলন ভালো হওয়ায় মুনাফা করতে পেরেছিলেন কৃষক। চলতি বছর ধানের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু খরচ বাড়ার সঙ্গে ফলন কম হওয়ায় লোকসানে পড়েছেন কৃষক।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের কৃষক রতন আলী বলেন, ‘এ বছর বোরো মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলায় বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। পোকার আক্রমণও বেশি ছিল। দাবদাহে বেশি সেচ দিতে হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছিলেন। আগের বছর বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছিল ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। এ বছর খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। সেচ ও শ্রমিক খরচ বেশি হওয়ায় এই বাড়তি খরচ হয়েছে। ধানের ফলন ভালো হলে পুষিয়ে নেওয়া যেত। ’

একই অবস্থা কুড়িগ্রাম জেলার কৃষকদের। গত বোরো মৌসুমের তুলনায় এ বছর বোরো ধানের দাম মণপ্রতি জাতভেদে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়লেও উৎপাদন খরচ বাড়ায় কমে গেছে লাভের অঙ্ক। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নন্দীরকুঠি গ্রামের কৃষক জাহের আলী বলেন, ‘গত বছর প্রতি বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করতে খরচ পড়েছিল ২০ হাজার টাকা। ওই সময় ধানের দর ছিল প্রতি মণ গড়ে ৮৫০ টাকা। ফলন হয়েছিল গড়ে প্রতি বিঘায় ২৭ মণ। সে হিসেবে প্রতি বিঘা জমির ধান বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২৩ হাজার টাকা। এ বছর ধানের দাম প্রায় দেড় শ টাকা বেড়েছে। ফলে এক হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি করতে পারছি। কিন্তু এ বছর প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে খরচ পড়েছে ২৩ হাজার টাকার বেশি। ধান পেয়েছি ২৫ মণের কম। ধান বিক্রি করে পেয়েছি প্রায় ২৫ হাজার টাকা, যে জন্য ধানের দাম বাড়লেও লাভ হয়েছে খুব কম। ’

সবচেয়ে বেশি বিপদে চুক্তিভিত্তিক কৃষক

বোরো ধান চাষ করে বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন চুক্তিতে জমি চাষ করা কৃষকরা। সব খরচের পাশাপাশি বর্গাচাষিদের এবার বিঘাপ্রতি বাড়তি প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দিনাজপুর সদর উপজেলার কমলপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘গত বোরো মৌসুমের চেয়ে এবার বোরো মৌসুমে ধানের দাম বেশি। কিন্তু সার, কীটনাশক ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় উচ্চমূল্যে জমি চুক্তি নিয়ে চাষ করা বর্গাচাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাঁরা প্রতি একর জমি ৮০ হাজার টাকায় বছর চুক্তি নিয়েছেন। যাঁদের জমি, তাঁদের তো ক্ষতি কিছুটা কম। কিন্তু জমি বর্গা নিয়ে যাঁরা চাষ করেছেন, তাঁরা খুব বিপদে আছেন। ’

কৃষকের কাছে যখন ধান থাকে না, তখন দাম বাড়ে

নওগাঁ জেলার বৃহত্তর ধান বেচাকেনার হাট মহাদেবপুর উপজেলার চকগৌরিতে গত ২৭ জুন হাট বসেছিল। ওই দিন চকগৌরি হাটে মানভেদে প্রতি মণ ব্রিধান২৮ জাতের ধান এক হাজার ১১০ থেকে এক হাজার ১৫০ টাকা, সুভলতা এক হাজার ১৮০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা, জিরাশাইল এক হাজার ২৪০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা এবং কাটারিভোগ এক হাজার ২৯০ থেকে এক হাজার ৩১০ টাকা দরে বেচাকেনা হয়। অথচ এই ধান মৌসুমের শুরুতে বেচাকেনা হয়েছে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা কম দামে। প্রতি মণ ব্রিধান২৮ ছিল সর্বোচ্চ এক হাজার ৮০ টাকা, সুভলতা এক হাজার ১০০ টাকা। এ ছাড়া জিরাশাইল এক হাজার ১৮০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা এবং কাটারিভোগ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে কৃষকের কাছে ধানের মজুদ প্রায় শেষ। ফলে বাজারে ধানের দাম বাড়ছে। মৌসুমের শুরুতে সরকারিভাবে ন্যায্য দামে ধান সংগ্রহ করা গেলে কৃষকরা কিছুটা লাভবান হতেন। কিন্তু সরকারের ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে গতি না থাকায় চলতি মৌসুমে পাঁচ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত ৭ মে থেকে শুরু হয়েছে ধান সংগ্রহ, শেষ হবে ৩১ আগস্ট। জুন মাস শেষে মোট ধানের মাত্র ৩০ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, যদিও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে বর্তমানে ধানের মজুদ খুবই কম। মজুদ যা রয়েছে সব ব্যবসায়ী ও মিলারদের কাছে। এ কারণে সরকারি সংগ্রহের সুফল কৃষকরা পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা ধান বিক্রি করে দেন। কারণ ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ ও অনান্য খরচ মেটানোর চাপ থাকে। ফলে বাজারে কম দামে তাঁরা ধান বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ওই সময়টায় যদি সরকারের ধান সংগ্রহ কার্যক্রম গতিশীল থাকে, তাহলে কৃষক কিছুটা উপকৃত হন। সেটি না হওয়ায় গত এক যুগের বেশি সময় ধরে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সরকার একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে ন্যূনতম লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। উল্টো তারা মিলার ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করছে। ’

তিনি বলেন, ‘কয়েক কোটি টন ধান উৎপাদিত হলেও সংগ্রহ হয় মাত্র পাঁচ লাখ টন। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার ধান দিতে গিয়ে বহু রকম হয়রানির শিকার হন কৃষক। এ কারণে কৃষকের ক্ষেত থেকেই ধান সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু করতে হবে। পাশাপাশি চাল সংগ্রহ কমিয়ে কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম আরো বাড়াতে হবে। সরকারের খাদ্যগুদাম ৫০ লাখ টনে উন্নীত করতে হবে।

কৃত্রিম সংকট মিলারদের

ভরা মৌসুমেও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম দুই থেকে চার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন মিল মালিক ও আড়তদাররা। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ও বন্যার অজুহাতে তাঁরা এই খরচ বাড়িয়েছেন; যার নেতিবাচক প্রভাব শিগগিরই রাজধানীর বাজারে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ কারণে বাজারে এখন থেকে অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। সরকার মোটা চাল সংগ্রহের পাশাপাশি সরু চাল কেনা শুরু করলে বাজারের এই অস্থিরতা কমবে। সেই সঙ্গে ধান-চাল সংগ্রহের উদ্দেশ্যও সফল হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘বর্তমানে বোরোর ভরা মৌসুম চলছে। বাজারে ধানের সরবরাহে সংকট নেই। এই সময় চালের দাম বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে মানভেদে প্রতি কেজি চালের দাম দু-তিন টাকা বেড়েছে। কারণ এখনো জেলার বেশির ভাগ চালকল বোরো মৌসুমের ধান থেকে চাল উৎপাদন শুরু করেনি। মোকামে চালের সরবরাহ সংকটের কারণে বর্তমানে বেশি দামে চাল বেচাকেনা হচ্ছে। চালকলগুলো পুরোপুরি চালু হলে দ্রুত চালের বাজার আবারও নিয়ন্ত্রণে আসবে। ’