বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই বিএনপির পক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হচ্ছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ বা আগামীকালের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম ঘোষণা করা হতে পারে বলে দলটির নির্ভরশীল সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির একটি সূত্রের দাবি, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিল করার পর দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হতে পারে। ফলে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী যেহেতু ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দাখিলের সময় নির্ধারিত সে অর্থে ১২ আগস্ট হতে পারে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে শেষ কর্মদিবস। তবে ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চূড়ান্ত ঘোষণার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চাইলে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অফিস
করতে পারেন। তবে এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে তার অফিস কক্ষে আমাদের সময়কে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে কিছুই বলার নেই। ১৩ আগস্টের পর দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। বিষয়টি একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। লুকোচুরির বিষয় নেই। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন পার্টির চেয়ারম্যান তারেক রহমান; দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি সেই দায়িত্ব অর্পণ করেছে।’
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার সময় স্বাক্ষর বা সম্মতি দিয়েছেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম অতি উৎসাহী হয়ে অনেক কিছু লিখেছে। এটা গণমাধ্যমের কোনো স্ট্যান্ডার্ড লেভেলের মধ্যে পড়ে না। তা ছাড়া মনোনয়ন ফরম তুলতে হলে স্বাক্ষর বা সম্মতির কিছু নেই। স্বাক্ষরের বিষয় আছে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে।
অবশ্য গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল নিজেই সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সচিবালয়ের কার্যালয়ে শুভাকাক্সক্ষীদের ভিড় দেখা যায়। অনেকেই তাকে শুভেচ্ছা জানান। তবে তিনি এই নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। মির্জা ফখরুলকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে হোক তারপর’। তবে সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা যায়। কার্যালয়ে বাইরে অপেক্ষমাণদের অনেককে বলতে শোনা যায় বিদায়ী শুভেচ্ছা জানাতে পেরে ভালো লাগছে। এ সময় দল বেঁধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মির্জা ফখরুলের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তিনি সচিবালয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস করেছেন। এরপর তিনি বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনে যান। বাসভবনেও শুভাকাক্সক্ষীরা শুভেচ্ছা জানাতে হাজির হন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গত কয়েক দিন ধরে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থেকে শুরু করে দলটির বিভিন্ন স্তরে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছিল। দলের অভ্যন্তরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খানের নাম আলোচনা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্তত দুজন সদস্য আমাদের সময়কে বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই অর্থে সজ্জন রাজনীতিক হিসেবে খ্যাতি রয়েছে মির্জা ফখরুলের। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান এবং ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর থেকে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া গণতন্ত্রিক আন্দোলনে দীর্ঘ সময় রাজপথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের নানা সংকটে নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন মির্জা ফখরুল। খালেদা জিয়ার অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেও বিএনপির হাল ধরেন তিনি।
আগামী ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। এ জন্য ইতোমধ্যে সংসদ সচিবালয় থেকে ভোটার তালিকা তথা সংসদ সদস্যদের নাম ইসি সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদিও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত; কিন্তু অতীতে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরত আনা হয়েছে। অতীতে সেই সময়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছিল রাষ্ট্রপতির ভূমিকা। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বিএনপি সরকার এবার দলের ভেতর থেকে সক্রিয় রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি করার অবস্থান নিয়েছে। সেই বিবেচনায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি আস্থা রাখছে বিএনপি ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রয়েছে বর্ণাঢ্য পারিবারিক ইতিহাস। তার বাবা মরহুম রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন কৃষি প্রতিমন্ত্রী। তার বড় চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুল ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরবর্তীকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির মহাসচিব ও ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
৭৯ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে তিনি শিক্ষকতা করেন।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























