ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

আওয়ামী লীগে ভাসছে দেশ

পীর হাবিবুর রহমান ।।

আওয়ামী লীগে ভাসছে দেশ। চারদিকে এত আওয়ামী লীগ। থই থই করছে। যেখানে যাই সেখানে আওয়ামী লীগ। এতদিন এত আওয়ামী লীগ ছিল কোথায়?

আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের বারবার বলছেন, হাইব্রিড আওয়ামী লীগের কথা। আখের গোছাতে মতলবী, সুবিধাবাদী, স্বার্থপররা ভিড় করছে। বসন্তের কোকিলের এত গান দলে আজ। বানের স্রোতের মতো সবাই আওয়ামী লীগ হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিরা ক্ষমতার পাদপ্রদীপে বসে রোজ দলে টানছেন। এমনকি হাত ধরে শত শত বিএনপি তো বটেই জামায়াত নেতাকর্মীরাও আওয়ামী লীগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরকারি দলে যোগ দিচ্ছেন। নাশকতার মামলায় চার্জভুক্ত আসামিরাও ফুল নিয়ে যোগ দিচ্ছেন। আজ চারদিকে যেন আর কোনো দল নেই। আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। এতদিন এত আওয়ামী লীগ কোথায় ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। দুনিয়া কাঁপানো রাজনীতিবিদ যার আঙুলি হেলনে স্বাধীনতার মন্ত্রে যে জাতি এক মোহনায় মিলিত হয়েছিল, সেই জাতির মহাত্তম নেতা বঙ্গবন্ধু যাকে দলে টানতে পারেননি, মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা যাদের আদর্শ বদলাতে পারেননি বরং পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন অথচ বিস্ময়করভাবে সত্য হচ্ছে- রাতারাতি তাদের আওয়ামী লীগ বানিয়ে দিচ্ছেন মাঠনেতা-মন্ত্রী-এমপিরা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এত আওয়ামী লীগার কোথাও দেখা যায়নি। কী দুঃসময় উত্তাল স্রোতের উজানে নৌকা টেনেছেন নেতাকর্মীরা। একজন সমর্থক খুঁজে পাননি। ৮১ সালে দেশে ফিরে দলের হাল ধরে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন- কত উত্থান-পতন দেখেছেন-তবু এমন সমর্থক কোথাও মেলেনি। কোথাও দল চালানোর মতো অনুদান আসেনি সেই দুঃসময়গুলোতে। অথচ আজ দলের ক্ষমতার সুবাতাস এতটাই তীব্র যে সর্বত্র শুধু আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। এমন অবস্থায় স্বাধীনতা উত্তরকাল ছাড়া আর কখনও হয়নি।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের রাতেই প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল নেতাদের বিস্মিত করে। হতবাক করে দেয়। পরদিন সকালে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ, জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিমসহ দলের বড় বড় নেতা ও সদ্য বিদায়ী হেভিওয়েট মন্ত্রীরা গেলেন সংবাদ সম্মেলন করতে। তাদের সঙ্গেই কোনো লোকজন নেই। অথচ দুদিন আগেই তারা যেখানে দলীয় অফিসে, সচিবালয়ে, সংসদে, মন্ত্রীপাড়ায় মানুষ আর মানুষ। একরাতে সব উধাও। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর ঢাকায় সাবেক মেয়র মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ হানিফের নেতৃত্বে প্রথম যে মিছিলটি বের হয় তাতে এক শ মানুষও ছিল না। কিন্তু এখন মন্ত্রীপাড়ায়, দলীয় কার্যালয়, সংসদে, সচিবালয়ে মন্ত্রী-এমপিদের ‍ঘিরে, নেতাদের ঘিরে কী নারী, কী পুরুষ, শুধু মানুষ আর মানুষ। শুধু কী দলেই? তাও নয়। পেশাজীবীদের মধ্যে সর্বত্র আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত যুগের শুরুতে দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্নস্থানে যখন হামলার শিকার, আহত, সেই সময় কেউ পাশে নেই। চিকিৎসার দায়ভার বড় বড় নেতাদের এলাকার কর্মীদেরও শেখ হাসিনা বহন করেছেন। সেই সময় আন্দোলন-সংগ্রামে যুবলীগ আর যুবমহিলা লীগ ছাড়া দলের কোনো অঙ্গই মাঠে নামতে পারেনি। ভয়াল ওয়ান ইলেভেনে চিত্র ছিল আরও করুণ।

এখন সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদীরা বানের স্রোতের মতো এসে ভিড় করেছে আওয়ামী লীগে। ব্যবসা-বাণিজ্য তদবির, টেনডারসহ অর্থনৈতিকভাবে ভাগ্য ফেরাতে প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে, কোথাও বা ধরে রাখতে, কেউবা মামলা থেকে রেহাই পেতে এই পথ নিয়েছেন। আওয়ামী লীগেরও একদল মন্ত্রী-নেতা যাদের অতীত ত্যাগ-সংগ্রামের কঠিন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা নেই, তারাও কেউ কেউ অর্থনেশায় আশক্ত হয়েছেন। তৃণমূল থেকে ইউপি নির্বাচন নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের খবর দেশজুড়ে বয়েই যায়নি, দলকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে। কমিটি বাণিজ্যের খবর ও দলের অনেক অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দিকে রয়েছে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে দলে ভেড়ানো, পদ-পদবী মনোনয়নদান যেমন ঘটেছে, সেখানে নব্য আওয়ামী লীগের দাপটে কোণঠাসা চিরদিন পথহারা কর্মীনেতাদের অনেকে যারা এই ধারায় গা ভাসাননি।

একদিন দলের পোস্টার, সমাবেশ করতে যে দল আর্থিক কারণে হিমশিম খেয়েছে, সেই দল এবার আসন্ন জাতীয় সম্মেলন ঘিরে ব্যয়বহুল সাজসজ্জা থেকে উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজনে টাকার কোনো সমস্যা দেখছেন না। নেতারাও গা ভাসিয়েছেন। এখানেও শেষ হয়নি। শেখ হাসিনাই প্রশ্ন তুলেছেন। এত সাজসজ্জার টাকা আসছে কোথা থেকে? চাঁদা তোলার ওপর তিনি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ৭৫’র ১৫ আগস্টের পর যে দল জাহীয় শোক দিবস এলে মিলাদ মাহফিল করানোর আয়োজন করতে হিমশিম খেতো, সেখানে এবারের জাতীয় শোকদিবসে অনেক স্থানে অনেক এমপি-নেতা একাধিক গরু জবাই করে কাঙালি ভোজের নামে খানা উৎসবের অসুস্থ প্রতিযোগিতা করছেন। ক্ষমতার রাজনীতি দলের ভেতর-বাহিরের অনেকের জীবনে এমন পরিবর্তন এনেছে যে- তারা এতদিন কী ছিলেন, কোথায় ছিলেন, কত টাকার মালিক ছিলেন, কতটা ছিল সম্পদ, সব ভুলে গেছেন। মনে হচ্ছে- এমন সুযোগ আর আসবে না।

তাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, খাই খাই স্বভাব ছাড়তে। কিন্তু খাই খাই স্বভাব খাই খাই নেশা থেকে যে আজ সর্বত্র আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। দলের নেতৃত্ব তা রুখতে পারছে না। কিভাবে রুখবেন তার রোডম্যাপ করছেন না। এমনকি শেখ হাসিনার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জানের মায়ায় জামায়াত ছেড়ে আসাদেরও দলে নিচ্ছেন মন্ত্রী-এমপি-নেতারা। সব দেখে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুধু কী সুবিধাবাদী লোকজন? শুধু কী সুযোগসন্ধানীরাই দলে স্রোতের মতো আসছেন? আওয়ামী লীগের সঙ্গে যারা জোট বেঁধে সরকার ও সংসদে আছেন, তারাও এমন বক্তৃতা করেন- যার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের আর বলার কিছুই থাকে না। এমনকি সংসদে বিরোধীদল ‍যেটি রয়েছে, সেটিও সরকারের অংশীদার। তারাও যে ভাষায় বলেন তাতে সরকারি দলই লজ্জা পায়।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য কার্যকর বিরোধীদল যেমন দরকার, তেমনি আদর্শিক কর্মী নির্ভর শক্তিশালী সরকারি দলও প্রয়োজন। কিন্তু যা বসছে তাতে দুর্বল বিরোধী দল যেমন পীড়নে পতিত। আর সুবিধাবাদীদের স্রোতে সরকারি দল বাহিরে যতটা ভিতরে ততটাই ফাঁপা। যেটি রাজনৈতিক দল, গণতন্ত্র আর শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অর্থবহ নয়।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

আওয়ামী লীগে ভাসছে দেশ

আপডেট টাইম : ০৭:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অক্টোবর ২০১৬

পীর হাবিবুর রহমান ।।

আওয়ামী লীগে ভাসছে দেশ। চারদিকে এত আওয়ামী লীগ। থই থই করছে। যেখানে যাই সেখানে আওয়ামী লীগ। এতদিন এত আওয়ামী লীগ ছিল কোথায়?

আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের বারবার বলছেন, হাইব্রিড আওয়ামী লীগের কথা। আখের গোছাতে মতলবী, সুবিধাবাদী, স্বার্থপররা ভিড় করছে। বসন্তের কোকিলের এত গান দলে আজ। বানের স্রোতের মতো সবাই আওয়ামী লীগ হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিরা ক্ষমতার পাদপ্রদীপে বসে রোজ দলে টানছেন। এমনকি হাত ধরে শত শত বিএনপি তো বটেই জামায়াত নেতাকর্মীরাও আওয়ামী লীগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরকারি দলে যোগ দিচ্ছেন। নাশকতার মামলায় চার্জভুক্ত আসামিরাও ফুল নিয়ে যোগ দিচ্ছেন। আজ চারদিকে যেন আর কোনো দল নেই। আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। এতদিন এত আওয়ামী লীগ কোথায় ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। দুনিয়া কাঁপানো রাজনীতিবিদ যার আঙুলি হেলনে স্বাধীনতার মন্ত্রে যে জাতি এক মোহনায় মিলিত হয়েছিল, সেই জাতির মহাত্তম নেতা বঙ্গবন্ধু যাকে দলে টানতে পারেননি, মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা যাদের আদর্শ বদলাতে পারেননি বরং পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন অথচ বিস্ময়করভাবে সত্য হচ্ছে- রাতারাতি তাদের আওয়ামী লীগ বানিয়ে দিচ্ছেন মাঠনেতা-মন্ত্রী-এমপিরা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এত আওয়ামী লীগার কোথাও দেখা যায়নি। কী দুঃসময় উত্তাল স্রোতের উজানে নৌকা টেনেছেন নেতাকর্মীরা। একজন সমর্থক খুঁজে পাননি। ৮১ সালে দেশে ফিরে দলের হাল ধরে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন- কত উত্থান-পতন দেখেছেন-তবু এমন সমর্থক কোথাও মেলেনি। কোথাও দল চালানোর মতো অনুদান আসেনি সেই দুঃসময়গুলোতে। অথচ আজ দলের ক্ষমতার সুবাতাস এতটাই তীব্র যে সর্বত্র শুধু আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। এমন অবস্থায় স্বাধীনতা উত্তরকাল ছাড়া আর কখনও হয়নি।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের রাতেই প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল নেতাদের বিস্মিত করে। হতবাক করে দেয়। পরদিন সকালে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ, জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিমসহ দলের বড় বড় নেতা ও সদ্য বিদায়ী হেভিওয়েট মন্ত্রীরা গেলেন সংবাদ সম্মেলন করতে। তাদের সঙ্গেই কোনো লোকজন নেই। অথচ দুদিন আগেই তারা যেখানে দলীয় অফিসে, সচিবালয়ে, সংসদে, মন্ত্রীপাড়ায় মানুষ আর মানুষ। একরাতে সব উধাও। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর ঢাকায় সাবেক মেয়র মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ হানিফের নেতৃত্বে প্রথম যে মিছিলটি বের হয় তাতে এক শ মানুষও ছিল না। কিন্তু এখন মন্ত্রীপাড়ায়, দলীয় কার্যালয়, সংসদে, সচিবালয়ে মন্ত্রী-এমপিদের ‍ঘিরে, নেতাদের ঘিরে কী নারী, কী পুরুষ, শুধু মানুষ আর মানুষ। শুধু কী দলেই? তাও নয়। পেশাজীবীদের মধ্যে সর্বত্র আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত যুগের শুরুতে দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্নস্থানে যখন হামলার শিকার, আহত, সেই সময় কেউ পাশে নেই। চিকিৎসার দায়ভার বড় বড় নেতাদের এলাকার কর্মীদেরও শেখ হাসিনা বহন করেছেন। সেই সময় আন্দোলন-সংগ্রামে যুবলীগ আর যুবমহিলা লীগ ছাড়া দলের কোনো অঙ্গই মাঠে নামতে পারেনি। ভয়াল ওয়ান ইলেভেনে চিত্র ছিল আরও করুণ।

এখন সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদীরা বানের স্রোতের মতো এসে ভিড় করেছে আওয়ামী লীগে। ব্যবসা-বাণিজ্য তদবির, টেনডারসহ অর্থনৈতিকভাবে ভাগ্য ফেরাতে প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে, কোথাও বা ধরে রাখতে, কেউবা মামলা থেকে রেহাই পেতে এই পথ নিয়েছেন। আওয়ামী লীগেরও একদল মন্ত্রী-নেতা যাদের অতীত ত্যাগ-সংগ্রামের কঠিন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা নেই, তারাও কেউ কেউ অর্থনেশায় আশক্ত হয়েছেন। তৃণমূল থেকে ইউপি নির্বাচন নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের খবর দেশজুড়ে বয়েই যায়নি, দলকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে। কমিটি বাণিজ্যের খবর ও দলের অনেক অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দিকে রয়েছে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে দলে ভেড়ানো, পদ-পদবী মনোনয়নদান যেমন ঘটেছে, সেখানে নব্য আওয়ামী লীগের দাপটে কোণঠাসা চিরদিন পথহারা কর্মীনেতাদের অনেকে যারা এই ধারায় গা ভাসাননি।

একদিন দলের পোস্টার, সমাবেশ করতে যে দল আর্থিক কারণে হিমশিম খেয়েছে, সেই দল এবার আসন্ন জাতীয় সম্মেলন ঘিরে ব্যয়বহুল সাজসজ্জা থেকে উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজনে টাকার কোনো সমস্যা দেখছেন না। নেতারাও গা ভাসিয়েছেন। এখানেও শেষ হয়নি। শেখ হাসিনাই প্রশ্ন তুলেছেন। এত সাজসজ্জার টাকা আসছে কোথা থেকে? চাঁদা তোলার ওপর তিনি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ৭৫’র ১৫ আগস্টের পর যে দল জাহীয় শোক দিবস এলে মিলাদ মাহফিল করানোর আয়োজন করতে হিমশিম খেতো, সেখানে এবারের জাতীয় শোকদিবসে অনেক স্থানে অনেক এমপি-নেতা একাধিক গরু জবাই করে কাঙালি ভোজের নামে খানা উৎসবের অসুস্থ প্রতিযোগিতা করছেন। ক্ষমতার রাজনীতি দলের ভেতর-বাহিরের অনেকের জীবনে এমন পরিবর্তন এনেছে যে- তারা এতদিন কী ছিলেন, কোথায় ছিলেন, কত টাকার মালিক ছিলেন, কতটা ছিল সম্পদ, সব ভুলে গেছেন। মনে হচ্ছে- এমন সুযোগ আর আসবে না।

তাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, খাই খাই স্বভাব ছাড়তে। কিন্তু খাই খাই স্বভাব খাই খাই নেশা থেকে যে আজ সর্বত্র আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। দলের নেতৃত্ব তা রুখতে পারছে না। কিভাবে রুখবেন তার রোডম্যাপ করছেন না। এমনকি শেখ হাসিনার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জানের মায়ায় জামায়াত ছেড়ে আসাদেরও দলে নিচ্ছেন মন্ত্রী-এমপি-নেতারা। সব দেখে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুধু কী সুবিধাবাদী লোকজন? শুধু কী সুযোগসন্ধানীরাই দলে স্রোতের মতো আসছেন? আওয়ামী লীগের সঙ্গে যারা জোট বেঁধে সরকার ও সংসদে আছেন, তারাও এমন বক্তৃতা করেন- যার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের আর বলার কিছুই থাকে না। এমনকি সংসদে বিরোধীদল ‍যেটি রয়েছে, সেটিও সরকারের অংশীদার। তারাও যে ভাষায় বলেন তাতে সরকারি দলই লজ্জা পায়।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য কার্যকর বিরোধীদল যেমন দরকার, তেমনি আদর্শিক কর্মী নির্ভর শক্তিশালী সরকারি দলও প্রয়োজন। কিন্তু যা বসছে তাতে দুর্বল বিরোধী দল যেমন পীড়নে পতিত। আর সুবিধাবাদীদের স্রোতে সরকারি দল বাহিরে যতটা ভিতরে ততটাই ফাঁপা। যেটি রাজনৈতিক দল, গণতন্ত্র আর শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অর্থবহ নয়।