ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অপরাধ জগতে ‘পেন গান’! কতটা ভয়ংকর এই অস্ত্র

পুরান ঢাকার নয়াবাজারে এক যুবদল নেতাকে হত্যাচেষ্টায় ব্যবহার করা হয়েছে অদ্ভুত এক অস্ত্র—দেখতে অবিকল একটি কলম কিন্তু এতে লুকিয়ে আছে দশমিক ২২ ক্যালিবারের বুলেট। ওপরে পুশ-বাটন এবং সামনে সুচালো নিব থাকা এই ‘পেন গান’ বা কলম-পিস্তল সাধারণ মানুষের চোখে নির্দোষ, তবে অপরাধীদের কাছে এটি এক প্রাণঘাতী হাতিয়ার।

দেখতে সাধারণ কলমের মতো হলেও, এটি বহন করে প্রাণঘাতী ঝুঁকি। সহজে লুকিয়ে রাখা যায়, নজরদারির বাইরে রাখা যায়, এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ফলে অপরাধের ধরনে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে টার্গেট কিলিং বা পরিকল্পিত হামলায় ব্যবহার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু এটি সহজে শনাক্তযোগ্য নয়, তাই জনবহুল স্থানে এর ব্যবহার আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল দিনের বেলায় নয়াবাজারে ঘটনার তদন্তকালে পুলিশ এই অস্ত্র উদ্ধার করে। যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জ থেকে সন্দেহভাজন সোহেল ওরফে কাল্লু এবং সাইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকেই পাওয়া গেছে এই বিশেষ কলম-পিস্তল। গোয়েন্দারা এখন এর উৎস ও চোরাচালান রুট অনুসন্ধান করছেন।

ডিবি যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মো. নাসিরুল ইসলাম জানান, “নয়াবাজারের ঘটনার পর থেকে আমরা ছায়া তদন্ত চালাচ্ছিলাম। প্রথমে যাত্রাবাড়ী থেকে সাইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়, পরে কেরানীগঞ্জ থেকে কাল্লু ধরা হয়। কাল্লুর কাছ থেকে যে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, সেটি পেন গান। এটি কোনো সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র নয়। ঢাকায় এর আগে এমন অস্ত্র ব্যবহারের রেকর্ড আমাদের কাছে নেই।”

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আহত যুবদল নেতা রাসেলকে ৩ এপ্রিল নয়াবাজারের একটি বাসায় ডেকে নিয়ে গুলি করা হয়। পরিবারের দাবি, তিনি পরিচিতজনের ডাকে সেখানে গিয়েছিলেন। গুলির পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

অস্ত্রটি দেশে কীভাবে প্রবেশ করেছে, তা খুঁজে বের করতে এখন তদন্ত চলছে

পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত কলম-পিস্তলটি একটি সিগারেট প্যাকেটের মধ্যে লুকানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হয়তো ভারত বা পাকিস্তান থেকে পাচার হয়ে এসেছে। গ্রেপ্তার করা একজন আসামি জানিয়েছেন, অস্ত্রটি ৮০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছিল এবং পরে এটি বেশি দামে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। মাদকসংক্রান্ত বিরোধ থেকে এই ঘটনার পেছনে হাত থাকতে পারে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।

পেন গান দেখতে যেমন সাধারণ কলম, তেমনই আকারে ছোট হওয়ায় এটি সহজে লুকিয়ে রাখা যায়। সাধারণত দশমিক ২২ বা দশমিক ২৫ ক্যালিবারের গুলি ছুড়তে সক্ষম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একবারে একটি গুলি ছোড়ে। পুরনো সংস্করণে পিনফায়ার পদ্ধতি ব্যবহার হলেও আধুনিক সংস্করণে রিমফায়ার বা সেন্টার-ফায়ার কার্টিজ থাকে। ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জব্দ করা অস্ত্রটিতে কোনো কোম্পানির লোগো বা মার্কিং নেই, যার কারণে উৎস নির্ধারণ কঠিন।

ডিবির এক কর্মকর্তা আরও জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে এমন কলম-পিস্তল ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার অপরাধ জগতে এই ধরনের অস্ত্র নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশ দিয়ে বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা ও সরবরাহ চেইন শনাক্ত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন সময়মতো নিয়ন্ত্রণে না আনলে এটি বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও কঠোর নজরদারি।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

অপরাধ জগতে ‘পেন গান’! কতটা ভয়ংকর এই অস্ত্র

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

পুরান ঢাকার নয়াবাজারে এক যুবদল নেতাকে হত্যাচেষ্টায় ব্যবহার করা হয়েছে অদ্ভুত এক অস্ত্র—দেখতে অবিকল একটি কলম কিন্তু এতে লুকিয়ে আছে দশমিক ২২ ক্যালিবারের বুলেট। ওপরে পুশ-বাটন এবং সামনে সুচালো নিব থাকা এই ‘পেন গান’ বা কলম-পিস্তল সাধারণ মানুষের চোখে নির্দোষ, তবে অপরাধীদের কাছে এটি এক প্রাণঘাতী হাতিয়ার।

দেখতে সাধারণ কলমের মতো হলেও, এটি বহন করে প্রাণঘাতী ঝুঁকি। সহজে লুকিয়ে রাখা যায়, নজরদারির বাইরে রাখা যায়, এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ফলে অপরাধের ধরনে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে টার্গেট কিলিং বা পরিকল্পিত হামলায় ব্যবহার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু এটি সহজে শনাক্তযোগ্য নয়, তাই জনবহুল স্থানে এর ব্যবহার আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল দিনের বেলায় নয়াবাজারে ঘটনার তদন্তকালে পুলিশ এই অস্ত্র উদ্ধার করে। যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জ থেকে সন্দেহভাজন সোহেল ওরফে কাল্লু এবং সাইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকেই পাওয়া গেছে এই বিশেষ কলম-পিস্তল। গোয়েন্দারা এখন এর উৎস ও চোরাচালান রুট অনুসন্ধান করছেন।

ডিবি যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মো. নাসিরুল ইসলাম জানান, “নয়াবাজারের ঘটনার পর থেকে আমরা ছায়া তদন্ত চালাচ্ছিলাম। প্রথমে যাত্রাবাড়ী থেকে সাইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়, পরে কেরানীগঞ্জ থেকে কাল্লু ধরা হয়। কাল্লুর কাছ থেকে যে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, সেটি পেন গান। এটি কোনো সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র নয়। ঢাকায় এর আগে এমন অস্ত্র ব্যবহারের রেকর্ড আমাদের কাছে নেই।”

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আহত যুবদল নেতা রাসেলকে ৩ এপ্রিল নয়াবাজারের একটি বাসায় ডেকে নিয়ে গুলি করা হয়। পরিবারের দাবি, তিনি পরিচিতজনের ডাকে সেখানে গিয়েছিলেন। গুলির পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

অস্ত্রটি দেশে কীভাবে প্রবেশ করেছে, তা খুঁজে বের করতে এখন তদন্ত চলছে

পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত কলম-পিস্তলটি একটি সিগারেট প্যাকেটের মধ্যে লুকানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হয়তো ভারত বা পাকিস্তান থেকে পাচার হয়ে এসেছে। গ্রেপ্তার করা একজন আসামি জানিয়েছেন, অস্ত্রটি ৮০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছিল এবং পরে এটি বেশি দামে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। মাদকসংক্রান্ত বিরোধ থেকে এই ঘটনার পেছনে হাত থাকতে পারে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।

পেন গান দেখতে যেমন সাধারণ কলম, তেমনই আকারে ছোট হওয়ায় এটি সহজে লুকিয়ে রাখা যায়। সাধারণত দশমিক ২২ বা দশমিক ২৫ ক্যালিবারের গুলি ছুড়তে সক্ষম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একবারে একটি গুলি ছোড়ে। পুরনো সংস্করণে পিনফায়ার পদ্ধতি ব্যবহার হলেও আধুনিক সংস্করণে রিমফায়ার বা সেন্টার-ফায়ার কার্টিজ থাকে। ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জব্দ করা অস্ত্রটিতে কোনো কোম্পানির লোগো বা মার্কিং নেই, যার কারণে উৎস নির্ধারণ কঠিন।

ডিবির এক কর্মকর্তা আরও জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে এমন কলম-পিস্তল ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার অপরাধ জগতে এই ধরনের অস্ত্র নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশ দিয়ে বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা ও সরবরাহ চেইন শনাক্ত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন সময়মতো নিয়ন্ত্রণে না আনলে এটি বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও কঠোর নজরদারি।