জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তাকে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করে পুলিশের পক্ষ থেকে দুই দিনের রিমান্ড আবেদন জানানো হয়। আদালত তার রিমান্ড ও জামিনের আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছরেরও বেশি সময় পর মঙ্গলবার ভোরে ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় টানা তিনবারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। কিন্তু এতদিন তিনি কোথায় আত্মগোপনে ছিলেন, গতকাল দিনভর এই প্রশ্নটি বিভিন্ন মহলে জোরালোভাবে আলোচনায় আসে।
একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে পলাতক জীবনে শিরিন শারমীন চৌধুরী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারিতেই ছিলেন। মঙ্গলবার ভোরে নিকট আত্মীয় আরিফের ধানমন্ডির ৮/এ রোডের ৫৭ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের একদিন আগেই তিনি এই বাসাতে ওঠেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ওই বাসায় পৌঁছলে শিরিন শারমীন চৌধুরী তাদের বলেন, ‘আপনারা কেন আসছেন জানি, চলেন।’ এর পর তাকে মিন্টো রোড গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে আসার আগে তিনি সঙ্গে কিছু ওষুধ আনেন। গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে আনার পর তাকে দুই ঘণ্টা ঘুমানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, এভাবে কী ঘুম আসে প্রশ্ন করেন শিরিন শারমীন চৌধুরী।
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাদের শিরিন শারমীন চৌধুরী বলেছেন, ৫ আগস্ট সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসাতেই ছিলেন। দুপুরে যখন জানতে পারেন শেখ হাসিনা দেশত্যাগের জন্য গণভবন থেকে বেরিয়ে গেছেন, তখন তিনি সংসদ ভবনের ব্যক্তিগত স্টাফদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেন। তখন তারা পরামর্শ দেন বাসায় থাকাটা নিরাপদ হবে না। যে কোনো সময় এখানে হামলা হতে পারে। এর পর কালবিলম্ব না করে তিনি সপরিবারে সেনা হেফাজতে চলে যান।
৬০ বছর বয়সী শিরীন শারমিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন। এর পর ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত টানা এ পদে ছিলেন তিনি। গণ-অভ্যুত্থানের কিছুদিন পর গ্রেপ্তার হন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গ্রেপ্তারের পর শিরিন শারমীন চৌধুরী গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাদের বলেছেন, সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার পর দেশের ভেতরেই বিভিন্ন জায়গায় ‘আত্মগোপনে ছিলেন’।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেছেন, এতদিন তিনি (শিরিন শারমীন চৌধুরী) দেশেই ছিলেন। গ্রেপ্তারের আগে তিনি কোথায় কোথায় ছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান। গ্রেপ্তারও হন অনেকেই। জনরোষ থেকে বাঁচতে অনেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে বলেছিল তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিলেন। তখন সবার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও গত বছরের ২২ মে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতার সঙ্গে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল।
সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সপরিবারে ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে থাকা অবস্থাতেই ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর আসে।
গত বছরের এপ্রিল মাসে জুনায়েদ আহমেদ পলক আদালতকে জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের দিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ তারা প্রায় ১২ জন জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের একটি কক্ষে লুকিয়ে ছিলেন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যান। কিছুদিন পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিকালে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন। কিছুদিন পর গ্রেপ্তার হন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। কিন্তু শিরীন শারমিন চৌধুরীর কোনো খোঁজ তখন পাওয়া যায়নি। তিনি কতদিন সেনানিবাসে ছিলেন এবং কবে বের হন, সে বিষয়েও আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে জুলাই আন্দোলনে ঢাকার আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে জনৈক আশরাফুল হত্যাচেষ্টা মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা। তিনি জামিন এবং দুই দিনের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর এই আদেশ দেন।
এদিকে রিমান্ড শুনানির পর আদালত থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় হুড়োহুড়িতে সিঁড়িতে পড়ে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। তখন ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন। এর আগে এদিন ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আদালতে হাজির করে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। বেলা ৩টা ২০ মিনিটের দিকে তাকে শুনানিকালে এজলাসে তোলা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের লালবাগ জোনাল টিমের ইন্সপেক্টর মোহসীন উদ্দীন এই মামলায় ২ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
আদালতের এজলাসে নেওয়ার পর কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান শিরীন শারমিন। এ সময় কয়েকজন আইনজীবী তাকে সালাম দেন। হাত উঁচিয়ে সালামের উত্তর দেন তিনি। এর মিনিট পর বিচারক এজলাসে ওঠেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, এই আসামি ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী। তিনি বিনা ভোটে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের একজন উপকারভোগী। এ মামলায় তিনি এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি। এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এ মামলার ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এই ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত ও আলামত উদ্ধারের জন্য তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ জন্য তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করছি।
শিরীন শারমিনের পক্ষে অ্যাডভোকেট ইবনুল কাওসার এবং এবিএম হামিদুল মেজবাহ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদনের শুনানিতে বলেন, এ মামলায় ১৩০ জন আসামিÑ যার মধ্যে শিরীন শারমিন ৩ নম্বর আসামি। মামলায় শুধু তার নামটাই রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। ঘটনার ১০ মাস পর এ মামলা করা হয়েছে। শিরীন শারমিন চৌধুরী সরাসরি পদত্যাগপত্র জমা দেন। আর কাউকে কিন্তু এমনটা করতে দেখা যায়নি। বাদীর গুলি লেগেছে। তার জন্য আমাদের সহানুভূতি আছে। কিন্তু তিনি তো সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তখন তিনি রানিং স্পিকার। তার যেতে হলে তো প্রোটোকল নিয়ে যেতে হবে। এ ধরনের মামলা ছাড়া তার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই। স্পিকার হিসেবে শপথ নিলে আর দলীয় কোনো পদ থাকে না। তিনি নিউট্রাল হয়ে যান। ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি অসুস্থ, বয়স্ক লোক, দীর্ঘদিন পলাতক থাকলে শরীরের যা হয়। তাই তার রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করছি। শুনানি শেষে আদালত তার রিমান্ড ও জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তাকে আবার সিএমএম আদালতে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় আওয়ামীপন্থি কয়েকজন আইনজীবী জয় বাংলা সেøাগানসহ বিভিন্ন সেøাগান দেন। পরে তাকে একটু তাড়াহুড়ো করে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। নেওয়ার পথে তাড়াহুড়োতে সিঁড়িতে পড়ে যান শিরিন শারমীন চৌধুরী। এ সময় ব্যথায় চিৎকার দিয়ে ওঠেন। কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্যও তার সঙ্গে পড়ে যান। পরে তাকে টেনে তোলা হয়। পরে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে জয় বাংলা সেøাগান দেওয়ায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের তোপের মুখে পড়েন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও নিজেরা আলাপ করে বিষয়টির সমাধান করেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে লালবাগের আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে আন্দোলনকারীরা আন্দোলন করছিল। সেখানে দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। একটি গুলি আশরাফুল ওরফে ফাহিমের চোখে লাগে। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। এ ঘটনায় গত বছরের ২৫ মে শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১১৫/১২০ জনকে আসামি করে মামলা করেন আশরাফুল।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 






















