ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

বাংলার পিঠা বাংলার ঘরে ঘরে

ফজলুল হক এক বিচিত্র মানুষ। খেয়ালের বশে তিনি অনেক কিছু করতেন। খুব স্বপ্নবান পুরুষ। নতুন কিছু করার ব্যাপারে তার অনেক আগ্রহ। এ দেশে তিনিই প্রথম ছোটদের চলচ্চিত্র ‘সান অব পাকিস্তান’ নির্মাণ করেন। হাউজিং ব্যবসার সূত্রপাত করেন। তিনি প্রথম বাংলা ডায়াল ঘড়ির প্রচলন করেন। রেস্টুরেন্টে খিচুড়ি আর হাঁসের মাংসের মেন্যু চালু করেন। সবচেয়ে বড় সাফল্য তিনিই প্রথম চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’র (পঞ্চাশ দশকে প্রকাশিত) সম্পাদক ছিলেন।

সময়কাল ১৯৬৮। তখন তার চলচ্চিত্রের অফিস ছিল ঢাকার ৯১ নওয়াবপুর রোডে। সম্পর্কে তিনি আমার পিতা। আমি তার জ্যেষ্ঠ সন্তান। একদিন তিনি বেবিট্যাক্সি করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেছেন। সারাদিন অফিসে অনেক কাজ করেছেন। ক্লান্ত দেহমন। বেবিট্যাক্সিটা কিছুদূর গিয়ে গরগর শব্দ করে থেমে গেল। বেবিট্যাক্সি নামের সেই বাহনটি এখন আর দেখা যায় না। বেবিট্যাক্সি যানবাহনটি আজকের দিনের সিএনজিচালিত বাহনের মতো। তখন বেবিট্যাক্সি চেপে ঢাকার বাইরে যাওয়া যেত।

বাবা চুপ হয়ে বসেছিলেন। গাড়ি নষ্ট হওয়ায় বাবার ধ্যান ভাঙল। তিনি কিছুটা বিরক্ত। গাড়ি স্টার্ট নিয়ে আবার কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। বাবা মহাবিরক্ত। গাড়ি বন্ধ হচ্ছে আবার চালু হচ্ছে।

তখন বাবা ড্রাইভারকে বললেন, তুমি কি গাড়ি চালাও নাকি অন্যকিছু করো?

লোকটা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, স্যার আমি দিনের বেলা পিঠা বানাই।

মানে!

পিঠা বানাই। সেই পিঠা লোকজন কিনে নিয়ে যায়।

কোথায় বানাও?

কেরানীগঞ্জে। সেখান থেকে ঢাকায় পিঠা আসে।

বাবা খুব মজা পেলেন।

তুমি কাল আমার অফিসে আসতে পারবে?

পারব স্যার?

তখন ঢাকা শহরে গলি বা রাস্তার ধারে পিঠাওয়ালী ছিল না। পিঠার প্রচলন ছিল গ্রামগঞ্জে। বাবা অভিনব আইডিয়া করলেন। পিঠা খাওয়াবেন বাঙালিদের। আমার বড় চাচিÑ ড. ফজলুল করীমের সহধর্মিণী। তিনি রান্না করে সবাইকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। বাবা তার সঙ্গে আলোচনা করলেন। আমার মা প্রখ্যাত লেখক রাবেয়া খাতুন সব শুনে ক্ষেপে গেলেন। বাবার চিন্তা পাগলামি মনে করলেন।

বাবা বললেন, তুমি খিচুড়ি রান্না করে দেবে। আর হাঁসের মাংস। আশা করি বিক্রি ভালোই হবে। চাচি রেঁধে পাঠালেনÑশিঙাড়া, সমুচা, এসব। জায়গা খোঁজা শুরু হলো। পল্টনে চলচ্চিত্র পরিচালক ইবনে মিজানের বাড়ির উল্টোদিকে খালি ঘর পাওয়া গেল। আশপাশে ডোবানালা। কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্ট নেই। দোকানের নাম দেওয়া হয় ‘পিঠাঘর’ আর পিঠাঘরের স্লোগান ছিল ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি।’ ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রতিষ্ঠিত হলো পিঠার দোকান। কবি শামসুর রাহমান এই পিঠাঘরের উদ্বোধন করেন।

দোকান কী করে চলবে এসব নিয়ে বাবার কোনো ভাবান্তর নেই। ১৯৬৯ থেকে ‘আমি কে তুমি কে, বাঙালি বাঙালি।’ এই স্লোগান তখন সবখানে। নাগরিক জীবনে পিঠা তখন অদ্ভুত আবেশ নিয়ে এলো। খুব স্বল্প সময়ে খুব জনপ্রিয় হলো ‘পিঠাঘর’।

মধ্যবিত্ত মানসিকতায় সেই প্রথম পিঠার প্রচলন শুরু হলো। বাংলার খাবার নাগরিক জীবনে নতুন ধারা তৈরি করল। যিনি বাবার কাছে প্রথম পিঠাপুলির কথা উচ্চারণ করেছিলেন সেই বেবিট্যাক্সিচালকের নাম ছিল ধনু মিয়া। তিনিই পরে বিখ্যাত পিঠা বানানোর কারিগর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

দুই

বাঙালি খাদ্যরসিক জাতি। বাঙালির খাদ্য ঐতিহ্যের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ঐতিহ্য। ডাল-ভাত ছাড়া বাঙালি কিন্তু ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালি হিসেবে পরিচিত। পিঠা বাঙালির আরেক ঐতিহ্য। শীতের শুরুতে বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠার উৎসব। কত রকমের পিঠা যে বাঙালি রমণীরা বানাতে জানে তার কোনো হিসাব নেই। অঘ্রাণে নতুন ধান ওঠে। নতুন ধানের সুবাসে ম-ম করে বাংলার মাঠ প্রান্তর। বাংলার মায়েরা তখন নতুন ধানের ঢেঁকিছাঁটা চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠা তৈরি করে। পিঠা যেন বাংলার ঘরে নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসে। জীবনের সঙ্গে মিশে থাকে পিঠার ঘ্রাণ। পিঠা যেন সামাজিক উৎসবের প্রতীক। বিবাহ, জামাইয়ের আগমন, প্রতিবেশীদের পিঠার আমন্ত্রণ জানানোÑ এ রকম নানা অনুষ্ঠানে পিঠার ব্যবহার দেখা যায়। কোনো কোনো জেলায় পিঠা পাঠিয়ে যে কোনো আমন্ত্রণ জানানোর রীতিও আছে। আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এলে তাকে পিঠা দিয়ে বরণ করা হয়। আপ্যায়নের প্রধান অনুষদ পিঠা। এই সেদিনও নিমন্ত্রণ দেওয়ার সময় এক থালা পিঠা পাঠানো হতো বাড়ি বাড়ি।

আমাদের সমাজে পিঠার বিচিত্র সম্ভার। নারকেল দুধ, খেঁজুর গুড়, চালের গুঁড়া ব্যবহার করে শত শত রকমের পিঠা তৈরি করা হয়। কত রকমের যে পিঠা, নাম বলে শেষ করা যাবে না। নকশি পিঠা, পাটিসাপটা, তেলের পিঠা, পাকন পিঠা, ভাপা পিঠা, ফুল, চিতই, চাপটি, পানতোয়া, ঝালপোয়া, পুলি, ক্ষীরপুলি, মালাই পিঠা, দুধ চিতই, মালাই, মেরা পিঠা, সন্দেশ, সেমাই পিঠা, চুই পিঠা, তালের পিঠা, ঝিঁনুক পিঠা, ইলিশ পিঠা, নারকেল পিঠা, কলা পিঠাসহ কত রকমের পিঠা যে তৈরি হয় বাংলার ঘরে ঘরে।

আমার বাবা ফজলুল হক ষাট দশকের শেষে সেই সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাংলার ঘরে ঘরে তিনি পিঠাকে ‘অভিজাত’ খাবার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। আজ সর্বত্র যখন যথেষ্ট পরিমাণে পিঠার ব্যবহার দেখি নাগরিকদের মধ্যে তখন স্মরণে আসে ফজলুল হকের কথা। তার অবদান আমরা কী করে ভুলব!

তিন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ উঠিয়ে দেওয়া হয়। ভেঙে দেওয়া হয় পিঠাঘরের যন্ত্রপাতি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠার একটি দোকান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে অশ্রুসজল চোখে বাবা তাকিয়ে দেখেছেন জীর্ণ দোকানের শীর্ণ অবয়ব।

পরে বাবা ‘সোনার চামচ’ নামে একটি দোকান আবার চালু করেন। পরে ’৮০-র দশকে চালু হয় খাবার দাবার পিঠাঘর। সে আরেক কাহিনি। অন্যত্র বলা যাবে।

ফরিদুর রেজা সাগর : শিশুসাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

বাংলার পিঠা বাংলার ঘরে ঘরে

আপডেট টাইম : ০৫:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ফজলুল হক এক বিচিত্র মানুষ। খেয়ালের বশে তিনি অনেক কিছু করতেন। খুব স্বপ্নবান পুরুষ। নতুন কিছু করার ব্যাপারে তার অনেক আগ্রহ। এ দেশে তিনিই প্রথম ছোটদের চলচ্চিত্র ‘সান অব পাকিস্তান’ নির্মাণ করেন। হাউজিং ব্যবসার সূত্রপাত করেন। তিনি প্রথম বাংলা ডায়াল ঘড়ির প্রচলন করেন। রেস্টুরেন্টে খিচুড়ি আর হাঁসের মাংসের মেন্যু চালু করেন। সবচেয়ে বড় সাফল্য তিনিই প্রথম চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’র (পঞ্চাশ দশকে প্রকাশিত) সম্পাদক ছিলেন।

সময়কাল ১৯৬৮। তখন তার চলচ্চিত্রের অফিস ছিল ঢাকার ৯১ নওয়াবপুর রোডে। সম্পর্কে তিনি আমার পিতা। আমি তার জ্যেষ্ঠ সন্তান। একদিন তিনি বেবিট্যাক্সি করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেছেন। সারাদিন অফিসে অনেক কাজ করেছেন। ক্লান্ত দেহমন। বেবিট্যাক্সিটা কিছুদূর গিয়ে গরগর শব্দ করে থেমে গেল। বেবিট্যাক্সি নামের সেই বাহনটি এখন আর দেখা যায় না। বেবিট্যাক্সি যানবাহনটি আজকের দিনের সিএনজিচালিত বাহনের মতো। তখন বেবিট্যাক্সি চেপে ঢাকার বাইরে যাওয়া যেত।

বাবা চুপ হয়ে বসেছিলেন। গাড়ি নষ্ট হওয়ায় বাবার ধ্যান ভাঙল। তিনি কিছুটা বিরক্ত। গাড়ি স্টার্ট নিয়ে আবার কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। বাবা মহাবিরক্ত। গাড়ি বন্ধ হচ্ছে আবার চালু হচ্ছে।

তখন বাবা ড্রাইভারকে বললেন, তুমি কি গাড়ি চালাও নাকি অন্যকিছু করো?

লোকটা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, স্যার আমি দিনের বেলা পিঠা বানাই।

মানে!

পিঠা বানাই। সেই পিঠা লোকজন কিনে নিয়ে যায়।

কোথায় বানাও?

কেরানীগঞ্জে। সেখান থেকে ঢাকায় পিঠা আসে।

বাবা খুব মজা পেলেন।

তুমি কাল আমার অফিসে আসতে পারবে?

পারব স্যার?

তখন ঢাকা শহরে গলি বা রাস্তার ধারে পিঠাওয়ালী ছিল না। পিঠার প্রচলন ছিল গ্রামগঞ্জে। বাবা অভিনব আইডিয়া করলেন। পিঠা খাওয়াবেন বাঙালিদের। আমার বড় চাচিÑ ড. ফজলুল করীমের সহধর্মিণী। তিনি রান্না করে সবাইকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। বাবা তার সঙ্গে আলোচনা করলেন। আমার মা প্রখ্যাত লেখক রাবেয়া খাতুন সব শুনে ক্ষেপে গেলেন। বাবার চিন্তা পাগলামি মনে করলেন।

বাবা বললেন, তুমি খিচুড়ি রান্না করে দেবে। আর হাঁসের মাংস। আশা করি বিক্রি ভালোই হবে। চাচি রেঁধে পাঠালেনÑশিঙাড়া, সমুচা, এসব। জায়গা খোঁজা শুরু হলো। পল্টনে চলচ্চিত্র পরিচালক ইবনে মিজানের বাড়ির উল্টোদিকে খালি ঘর পাওয়া গেল। আশপাশে ডোবানালা। কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্ট নেই। দোকানের নাম দেওয়া হয় ‘পিঠাঘর’ আর পিঠাঘরের স্লোগান ছিল ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি।’ ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রতিষ্ঠিত হলো পিঠার দোকান। কবি শামসুর রাহমান এই পিঠাঘরের উদ্বোধন করেন।

দোকান কী করে চলবে এসব নিয়ে বাবার কোনো ভাবান্তর নেই। ১৯৬৯ থেকে ‘আমি কে তুমি কে, বাঙালি বাঙালি।’ এই স্লোগান তখন সবখানে। নাগরিক জীবনে পিঠা তখন অদ্ভুত আবেশ নিয়ে এলো। খুব স্বল্প সময়ে খুব জনপ্রিয় হলো ‘পিঠাঘর’।

মধ্যবিত্ত মানসিকতায় সেই প্রথম পিঠার প্রচলন শুরু হলো। বাংলার খাবার নাগরিক জীবনে নতুন ধারা তৈরি করল। যিনি বাবার কাছে প্রথম পিঠাপুলির কথা উচ্চারণ করেছিলেন সেই বেবিট্যাক্সিচালকের নাম ছিল ধনু মিয়া। তিনিই পরে বিখ্যাত পিঠা বানানোর কারিগর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

দুই

বাঙালি খাদ্যরসিক জাতি। বাঙালির খাদ্য ঐতিহ্যের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ঐতিহ্য। ডাল-ভাত ছাড়া বাঙালি কিন্তু ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালি হিসেবে পরিচিত। পিঠা বাঙালির আরেক ঐতিহ্য। শীতের শুরুতে বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠার উৎসব। কত রকমের পিঠা যে বাঙালি রমণীরা বানাতে জানে তার কোনো হিসাব নেই। অঘ্রাণে নতুন ধান ওঠে। নতুন ধানের সুবাসে ম-ম করে বাংলার মাঠ প্রান্তর। বাংলার মায়েরা তখন নতুন ধানের ঢেঁকিছাঁটা চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠা তৈরি করে। পিঠা যেন বাংলার ঘরে নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসে। জীবনের সঙ্গে মিশে থাকে পিঠার ঘ্রাণ। পিঠা যেন সামাজিক উৎসবের প্রতীক। বিবাহ, জামাইয়ের আগমন, প্রতিবেশীদের পিঠার আমন্ত্রণ জানানোÑ এ রকম নানা অনুষ্ঠানে পিঠার ব্যবহার দেখা যায়। কোনো কোনো জেলায় পিঠা পাঠিয়ে যে কোনো আমন্ত্রণ জানানোর রীতিও আছে। আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এলে তাকে পিঠা দিয়ে বরণ করা হয়। আপ্যায়নের প্রধান অনুষদ পিঠা। এই সেদিনও নিমন্ত্রণ দেওয়ার সময় এক থালা পিঠা পাঠানো হতো বাড়ি বাড়ি।

আমাদের সমাজে পিঠার বিচিত্র সম্ভার। নারকেল দুধ, খেঁজুর গুড়, চালের গুঁড়া ব্যবহার করে শত শত রকমের পিঠা তৈরি করা হয়। কত রকমের যে পিঠা, নাম বলে শেষ করা যাবে না। নকশি পিঠা, পাটিসাপটা, তেলের পিঠা, পাকন পিঠা, ভাপা পিঠা, ফুল, চিতই, চাপটি, পানতোয়া, ঝালপোয়া, পুলি, ক্ষীরপুলি, মালাই পিঠা, দুধ চিতই, মালাই, মেরা পিঠা, সন্দেশ, সেমাই পিঠা, চুই পিঠা, তালের পিঠা, ঝিঁনুক পিঠা, ইলিশ পিঠা, নারকেল পিঠা, কলা পিঠাসহ কত রকমের পিঠা যে তৈরি হয় বাংলার ঘরে ঘরে।

আমার বাবা ফজলুল হক ষাট দশকের শেষে সেই সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাংলার ঘরে ঘরে তিনি পিঠাকে ‘অভিজাত’ খাবার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। আজ সর্বত্র যখন যথেষ্ট পরিমাণে পিঠার ব্যবহার দেখি নাগরিকদের মধ্যে তখন স্মরণে আসে ফজলুল হকের কথা। তার অবদান আমরা কী করে ভুলব!

তিন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ উঠিয়ে দেওয়া হয়। ভেঙে দেওয়া হয় পিঠাঘরের যন্ত্রপাতি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠার একটি দোকান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে অশ্রুসজল চোখে বাবা তাকিয়ে দেখেছেন জীর্ণ দোকানের শীর্ণ অবয়ব।

পরে বাবা ‘সোনার চামচ’ নামে একটি দোকান আবার চালু করেন। পরে ’৮০-র দশকে চালু হয় খাবার দাবার পিঠাঘর। সে আরেক কাহিনি। অন্যত্র বলা যাবে।

ফরিদুর রেজা সাগর : শিশুসাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব