ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

কোকোকে মা বললেন— নাম না থাকলে বসা যাবে না

২৩ ডিসেম্বর ২০০২। তুষারে ঢাকা বেইজিং। তীব্র শীত আর কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ নিয়ে ঐতিহাসিক পিকিং ডাক রেস্টুরেন্টে হাজির হলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কিছুক্ষণ আগে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন তিনি। ডায়োতাই স্টেট গেস্ট হাউজে উঠেছেন।

বেইজিংয়ের সন্ধ্যার যানজট পেরিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের একটু আগেই নৈশভোজের দাওয়াতে পৌঁছে যান। আয়োজক চীনা কংগ্রেসের (পার্লামেন্টের) লেডি ভাইস চেয়ারম্যান তখনও এসে পৌঁছাননি। ডিনার রুমে ঢুকে হেড টেবিলে বসলেন বেগম খালেদা জিয়া। তার পেছনেই আসলেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। রুমে ঢুকেই সোজা বসতে গেলেন হেড টেবিলে ঠিক মায়ের সামনে। অমনি মা বলে উঠলেন, ‘দেখ দেখ তোর নাম আছে কি না? নাম না থাকলে কিন্তু এখানে বসা যাবে না।’ বলেই মুচকি হাসলেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

আর সাথে সাথেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলে প্রতিটি চেয়ারের সামনে লেখা নামগুলো পড়তে লাগলেন কোকো, খুঁজতে লাগলেন নিজের নাম। শুন্য হলে আমি বিস্ময়ভরে দেখছিলাম মা-ছেলের রসিকতা। মুগ্ধতা কাটলো ম্যাডাম যখন বললেন, দেখছো, আমরা আগে চলে আসছি। এখানে কোনও লোক নেই। বাংলাদেশে হলে এতক্ষণে কতো লোক হয়ে যেতো।

ঢাকায় খবর পাঠানোর তাড়া নিয়ে আমি হল থেকে বেরিয়ে এলাম। পথে পথে ভাবছিলাম মা-ছেলের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে, সেন্স অব হিউমার নিয়ে।

আরাফাত রহমান কোকোর সাথে প্রথম পরিচয় তাদের ঢাকা সেনানিবাসের বাড়িতে। সেদিন ইনকিলাবের রিপোর্টার হিসেবে আমি গিয়েছিলাম তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে। ঠিক সাক্ষাৎকার নয়, আসলে একটি ঘটনায় বেগম জিয়ার প্রতিক্রিয়া জানতে। স্মৃতি যদি প্রবঞ্চনা না করে এটা ১৯৯৭ সালের কথা। বিরোধী দলের ডাকে টানা হরতাল চলছিল। সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রতিবাদে।

ওই হরতালে সন্ধ্যায় বাইরে থেকে বাড়ি ফিরছিলেন বড় ছেলে তারেক রহমান। সেনানিবাসের মূল রাস্তা থেকে শহীদ মইনুল রোডে ঢুকে সামান্য এগোলেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি। মেইন রোড থেকে বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে তারেক রহমান দেখলেন শহীদ মইনুল রোডের প্রবেশমুখে বসানো হচ্ছে বাঁশকল। এটা যান ও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য দেয়া এক ধরনের ব্যারিকেড। বলা নেই, কওয়া নেই, বাড়ির সামনে বসানো হচ্ছে বাঁশকল। দেখে হতবাক তারেক রহমান! বাঁশকল লাগানোর কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাছে এর কারণ জানতে চান তিনি। সংশ্লিষ্টরা কোনও সদুত্তর না দিয়ে জড়িয়ে পড়েন বিতর্কে। খবর শুনে বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসেন খালেদা জিয়া। তার বাড়ির প্রবেশ পথে তার অনুমতি বা ইচ্ছা ছাড়া বাঁশকল বসাতে বারণ করেন তিনি । শেষ পর্যন্ত পিছু হটে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা।

একে তো হরতাল, তার উপরে আবার ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের ঘটনা বলে পুরো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই খবরের সন্ধানে ‘সংবাদপত্র’ লেখা স্কুটারে চড়ে ছুটে গেলাম। বনানী সৈনিক ক্লাবের গেট থেকে একটু দূরে নেমে গেলাম। সৈনিক ক্লাবের গেট পেরিয়ে হেঁটে চললাম ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে। হেঁটেই পৌঁছতে হলো ১০ নম্বর শহীদ মইনুল রোডের বাড়ির গেটে। নিরাপত্তা কর্মীরা আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললাম তারেক রহমানের কাছে এসেছি। তারা বললেন, তিনি না আসলে তারা আমাকে ভেতরে যেতে দেবেন না। রিসেপশন থেকে ভেতরে ফোন করে খবর দেয়া হলো। একটু পরেই আসলেন তারেক রহমান। তার সাথে ভেতরে গেলাম।

জিজ্ঞেস করলাম, কী ঘটনা ঘটেছে? বললেন, আম্মা কথা বলবেন। এ কথা বলে সামনের ছোট্ট বসার ঘরে নিয়ে আমাকে বসালেন। আর বললেন, আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। ততক্ষণে চা খেয়ে নিন। এই বলে ভেতরে গেলেন তিনি।

একটু পর ফিরলেন ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছোট ভাইকে বললেন, আমাকে একটু সময় দিতে। ততক্ষণে চা-নাস্তা এলো। অল্প-স্বল্প দু-চারটা কথা হলো কোকোর সঙ্গে। তার সঙ্গে সেদিনই প্রথম পরিচয়।

এখনও পরিষ্কার মনে পড়ে, ওই রাতে তারেক রহমানের চোখে-মুখে আমি উদ্বেগের ছাপ দেখেছি। কিন্তু আরাফাত রহমান কোকোর কথা-বার্তায় তারমধ্যে সামান্য উদ্বেগও দেখিনি। মনে হলো রাষ্ট্রচিন্তা-রাজনীতি ভাবনা থেকে তার অবস্থান অনেক দূরে। একেবারে সাদামাটা একজন উচ্ছল তরুণ। বাড়ির গেটে কী ঘটেছে তা নিয়ে এতটুকু চিন্তিত নন তিনি।

বছর কয়েক পরে আরেকবার তার সঙ্গে বসেছিলাম হাইকুর এক পাঁচতারা হোটেলের লবিতে, যা চীনের হাইনান প্রদেশের রাজধানী শহরে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের একদল আড্ডা জমিয়েছিল সেখানে। লবির পাশে হোটেলের ফ্যাক্স রুম। ওখান থেকে ফ্যাক্সে ঢাকায় যুগান্তর অফিসে খবর পাঠিয়ে লবিতে আসতেই কেউ একজন ডেকে বসালেন তাদের আড্ডায়। পরিচয় করিয়ে দিলেন আরাফাত রহমান কোকোর সাথে। অত্যন্ত সজ্জন, বন্ধুবৎসল কোকোকে আবার কাছ থেকে দেখলাম। সামান্য বাক্যালাপেই তার আন্তরিকতার ছোয়া পেলাম।

বছর তিনেক পরে আরেকবার ক্ষণিকের জন্য দেখা হলো আরাফাত রহমানের সাথে। সাভারের অদূরে আশুলিয়ায় তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘খালেদা জিয়া ওল্ড হোম’ এর উদ্বোধনীতে। আবারও কোকোর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তারেক রহমান। সামান্য হেসে কুশলাদি জানতে চাইলেন।

তারপর অনেকবার দেখা হয়েছে কোকোর সঙ্গে। তবে কোনও রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নয়। কখনও দেখেছি তার বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে। কখনও সিথি ভাবীকে নিয়ে মুভেনপিক বা ক্লাব জিলাটোতে। দেখা হলে সালাম দিলেই আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলতেন, ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিতেন।

তখন বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছিল। তাই প্রধানমন্ত্রী পুত্রকে রাতের বেলায় কোনও ধরনের নিরাপত্তা ছাড়া গুলশান-বনানীতে দেখে নিরাপত্তা কর্মীরা উদ্বিগ্ন হয়ে যেতেন। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে আরাফাত রহমান কোকোর কোনও ভাবনাই ছিল না। তার জন্য বাড়তি নিরাপত্তা কিংবা নিরাপত্তা দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়ার কথা বললে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। বলতেন, ওগুলো লাগবে না। আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে চলে যাবো।

সম্ভবত কোকোর সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল আজাদ মসজিদে ঈদের জামাতে। তারপর নিজ বাড়িতে বন্দিদশা, গ্রেফতার, নির্যাতন, কারাবরণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেলেন ব্যাংককে চিকিৎসা নিতে। রাষ্ট্রক্ষমতা-রাজনীতির সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক না থাকলেও রিমান্ডের নামে নির্মম নির্যাতনের শিকার হলেন তিনি। ক্রিকেটপাগল সদা প্রাণোচ্ছল তরুণ কোকোকে ঠেলে দেয়া হলো গুরুতর অসুস্থতার দিকে। অ্যাম্বুলেন্সে করে অক্সিজেন মাস্ক পরা কোকোকে আদালতে নিতে দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। ক্রীড়ামোদী সুস্থসবল কোকোকে গ্রেফতার পরবর্তী নির্যাতনে হুইল চেয়ারে বসিয়ে আদালতে হাজির করতেও দেখেছে। আদালতের সিঁড়িতে এক হাত বুকে রেখে আরেক হাতে নিরাপত্তী রক্ষীদের ওপর ভর দিয়ে হেঁটে চলা প্রচন্ড যন্ত্রণায় কোঁকড়ানো কোকোর মুখ টেলিভিশন-সংবাদপত্রে দেখেছেন সকলে। দুঃখ পেলেও নির্যাতনকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা ছাড়া তীব্র প্রতিবাদের সুযোগ ছিল না সেই সময়।

বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে দেয়া হলো সাজা। বাতিল করা হলো প্যারোল। ততদিনে ফুরিয়ে যায় কোকোর পাসপোর্টের মেয়াদ। আশির দশকের শেষভাগে মেলবোর্নের মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকাউন্টিংয়ে গ্র্যাজুয়েশনের সুবাদে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকার নাগরিকত্ব নেয়ার সুযোগ ছিল কোকোর। কিন্তু দেশের টানে মায়ের কাছে বাংলাদেশে ফিরে আসা আরাফাত রহমান কোকো গুরুতর অসুস্থতার সময়ে ব্যাংককের হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হলেন। মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তার পাসপোর্ট নবায়ন বা নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করতে রাজি হয়নি থাইল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাস। উল্টো বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয় । বাধ্য হয়ে গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ব্যাংকক ছেড়ে যান তিনি।

এরপর একেবারে নীরবে-নিভৃতে নির্বাসিত জীবন কাটান কুয়ালালামপুরে। স্ত্রী আর দুই কন্যাকে নিয়ে কুয়ালালামপুরের জীবনে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না বলে শুনেছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা মালয়েশিয়ায় যথাযথ চিকিৎসা তিনি পেয়েছিলেন কি না তা নিয়েও কারও কারও মনে সংশয় রয়েছে। এসবের মাঝেই ২৪ জানুয়ারি ২০১৫-এ অকালে চলে গেলেন আরাফাত রহমান কোকো।

পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী বনানীর সেনা কবরস্থানে দাফনেরও সুযোগ দেয়া হলো না কোকোকে। এত জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচারের কারণে কি না জানি না, তবে কোকোর জানাযায় লাখো লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে তার প্রতি দেশের মানুষের ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়েছে।

লেখক: ব‍্যারিস্টার ও সাবেক প্রিন্সিপাল লেকচারার ইন পুলিশ এডুকেশন, অ‍্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটি, ইউকে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

কোকোকে মা বললেন— নাম না থাকলে বসা যাবে না

আপডেট টাইম : ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৫

২৩ ডিসেম্বর ২০০২। তুষারে ঢাকা বেইজিং। তীব্র শীত আর কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ নিয়ে ঐতিহাসিক পিকিং ডাক রেস্টুরেন্টে হাজির হলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কিছুক্ষণ আগে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন তিনি। ডায়োতাই স্টেট গেস্ট হাউজে উঠেছেন।

বেইজিংয়ের সন্ধ্যার যানজট পেরিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের একটু আগেই নৈশভোজের দাওয়াতে পৌঁছে যান। আয়োজক চীনা কংগ্রেসের (পার্লামেন্টের) লেডি ভাইস চেয়ারম্যান তখনও এসে পৌঁছাননি। ডিনার রুমে ঢুকে হেড টেবিলে বসলেন বেগম খালেদা জিয়া। তার পেছনেই আসলেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। রুমে ঢুকেই সোজা বসতে গেলেন হেড টেবিলে ঠিক মায়ের সামনে। অমনি মা বলে উঠলেন, ‘দেখ দেখ তোর নাম আছে কি না? নাম না থাকলে কিন্তু এখানে বসা যাবে না।’ বলেই মুচকি হাসলেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

আর সাথে সাথেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলে প্রতিটি চেয়ারের সামনে লেখা নামগুলো পড়তে লাগলেন কোকো, খুঁজতে লাগলেন নিজের নাম। শুন্য হলে আমি বিস্ময়ভরে দেখছিলাম মা-ছেলের রসিকতা। মুগ্ধতা কাটলো ম্যাডাম যখন বললেন, দেখছো, আমরা আগে চলে আসছি। এখানে কোনও লোক নেই। বাংলাদেশে হলে এতক্ষণে কতো লোক হয়ে যেতো।

ঢাকায় খবর পাঠানোর তাড়া নিয়ে আমি হল থেকে বেরিয়ে এলাম। পথে পথে ভাবছিলাম মা-ছেলের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে, সেন্স অব হিউমার নিয়ে।

আরাফাত রহমান কোকোর সাথে প্রথম পরিচয় তাদের ঢাকা সেনানিবাসের বাড়িতে। সেদিন ইনকিলাবের রিপোর্টার হিসেবে আমি গিয়েছিলাম তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে। ঠিক সাক্ষাৎকার নয়, আসলে একটি ঘটনায় বেগম জিয়ার প্রতিক্রিয়া জানতে। স্মৃতি যদি প্রবঞ্চনা না করে এটা ১৯৯৭ সালের কথা। বিরোধী দলের ডাকে টানা হরতাল চলছিল। সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রতিবাদে।

ওই হরতালে সন্ধ্যায় বাইরে থেকে বাড়ি ফিরছিলেন বড় ছেলে তারেক রহমান। সেনানিবাসের মূল রাস্তা থেকে শহীদ মইনুল রোডে ঢুকে সামান্য এগোলেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি। মেইন রোড থেকে বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে তারেক রহমান দেখলেন শহীদ মইনুল রোডের প্রবেশমুখে বসানো হচ্ছে বাঁশকল। এটা যান ও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য দেয়া এক ধরনের ব্যারিকেড। বলা নেই, কওয়া নেই, বাড়ির সামনে বসানো হচ্ছে বাঁশকল। দেখে হতবাক তারেক রহমান! বাঁশকল লাগানোর কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাছে এর কারণ জানতে চান তিনি। সংশ্লিষ্টরা কোনও সদুত্তর না দিয়ে জড়িয়ে পড়েন বিতর্কে। খবর শুনে বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসেন খালেদা জিয়া। তার বাড়ির প্রবেশ পথে তার অনুমতি বা ইচ্ছা ছাড়া বাঁশকল বসাতে বারণ করেন তিনি । শেষ পর্যন্ত পিছু হটে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা।

একে তো হরতাল, তার উপরে আবার ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের ঘটনা বলে পুরো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই খবরের সন্ধানে ‘সংবাদপত্র’ লেখা স্কুটারে চড়ে ছুটে গেলাম। বনানী সৈনিক ক্লাবের গেট থেকে একটু দূরে নেমে গেলাম। সৈনিক ক্লাবের গেট পেরিয়ে হেঁটে চললাম ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে। হেঁটেই পৌঁছতে হলো ১০ নম্বর শহীদ মইনুল রোডের বাড়ির গেটে। নিরাপত্তা কর্মীরা আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললাম তারেক রহমানের কাছে এসেছি। তারা বললেন, তিনি না আসলে তারা আমাকে ভেতরে যেতে দেবেন না। রিসেপশন থেকে ভেতরে ফোন করে খবর দেয়া হলো। একটু পরেই আসলেন তারেক রহমান। তার সাথে ভেতরে গেলাম।

জিজ্ঞেস করলাম, কী ঘটনা ঘটেছে? বললেন, আম্মা কথা বলবেন। এ কথা বলে সামনের ছোট্ট বসার ঘরে নিয়ে আমাকে বসালেন। আর বললেন, আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। ততক্ষণে চা খেয়ে নিন। এই বলে ভেতরে গেলেন তিনি।

একটু পর ফিরলেন ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছোট ভাইকে বললেন, আমাকে একটু সময় দিতে। ততক্ষণে চা-নাস্তা এলো। অল্প-স্বল্প দু-চারটা কথা হলো কোকোর সঙ্গে। তার সঙ্গে সেদিনই প্রথম পরিচয়।

এখনও পরিষ্কার মনে পড়ে, ওই রাতে তারেক রহমানের চোখে-মুখে আমি উদ্বেগের ছাপ দেখেছি। কিন্তু আরাফাত রহমান কোকোর কথা-বার্তায় তারমধ্যে সামান্য উদ্বেগও দেখিনি। মনে হলো রাষ্ট্রচিন্তা-রাজনীতি ভাবনা থেকে তার অবস্থান অনেক দূরে। একেবারে সাদামাটা একজন উচ্ছল তরুণ। বাড়ির গেটে কী ঘটেছে তা নিয়ে এতটুকু চিন্তিত নন তিনি।

বছর কয়েক পরে আরেকবার তার সঙ্গে বসেছিলাম হাইকুর এক পাঁচতারা হোটেলের লবিতে, যা চীনের হাইনান প্রদেশের রাজধানী শহরে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের একদল আড্ডা জমিয়েছিল সেখানে। লবির পাশে হোটেলের ফ্যাক্স রুম। ওখান থেকে ফ্যাক্সে ঢাকায় যুগান্তর অফিসে খবর পাঠিয়ে লবিতে আসতেই কেউ একজন ডেকে বসালেন তাদের আড্ডায়। পরিচয় করিয়ে দিলেন আরাফাত রহমান কোকোর সাথে। অত্যন্ত সজ্জন, বন্ধুবৎসল কোকোকে আবার কাছ থেকে দেখলাম। সামান্য বাক্যালাপেই তার আন্তরিকতার ছোয়া পেলাম।

বছর তিনেক পরে আরেকবার ক্ষণিকের জন্য দেখা হলো আরাফাত রহমানের সাথে। সাভারের অদূরে আশুলিয়ায় তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘খালেদা জিয়া ওল্ড হোম’ এর উদ্বোধনীতে। আবারও কোকোর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তারেক রহমান। সামান্য হেসে কুশলাদি জানতে চাইলেন।

তারপর অনেকবার দেখা হয়েছে কোকোর সঙ্গে। তবে কোনও রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নয়। কখনও দেখেছি তার বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে। কখনও সিথি ভাবীকে নিয়ে মুভেনপিক বা ক্লাব জিলাটোতে। দেখা হলে সালাম দিলেই আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলতেন, ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিতেন।

তখন বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছিল। তাই প্রধানমন্ত্রী পুত্রকে রাতের বেলায় কোনও ধরনের নিরাপত্তা ছাড়া গুলশান-বনানীতে দেখে নিরাপত্তা কর্মীরা উদ্বিগ্ন হয়ে যেতেন। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে আরাফাত রহমান কোকোর কোনও ভাবনাই ছিল না। তার জন্য বাড়তি নিরাপত্তা কিংবা নিরাপত্তা দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়ার কথা বললে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। বলতেন, ওগুলো লাগবে না। আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে চলে যাবো।

সম্ভবত কোকোর সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল আজাদ মসজিদে ঈদের জামাতে। তারপর নিজ বাড়িতে বন্দিদশা, গ্রেফতার, নির্যাতন, কারাবরণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেলেন ব্যাংককে চিকিৎসা নিতে। রাষ্ট্রক্ষমতা-রাজনীতির সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক না থাকলেও রিমান্ডের নামে নির্মম নির্যাতনের শিকার হলেন তিনি। ক্রিকেটপাগল সদা প্রাণোচ্ছল তরুণ কোকোকে ঠেলে দেয়া হলো গুরুতর অসুস্থতার দিকে। অ্যাম্বুলেন্সে করে অক্সিজেন মাস্ক পরা কোকোকে আদালতে নিতে দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। ক্রীড়ামোদী সুস্থসবল কোকোকে গ্রেফতার পরবর্তী নির্যাতনে হুইল চেয়ারে বসিয়ে আদালতে হাজির করতেও দেখেছে। আদালতের সিঁড়িতে এক হাত বুকে রেখে আরেক হাতে নিরাপত্তী রক্ষীদের ওপর ভর দিয়ে হেঁটে চলা প্রচন্ড যন্ত্রণায় কোঁকড়ানো কোকোর মুখ টেলিভিশন-সংবাদপত্রে দেখেছেন সকলে। দুঃখ পেলেও নির্যাতনকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা ছাড়া তীব্র প্রতিবাদের সুযোগ ছিল না সেই সময়।

বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে দেয়া হলো সাজা। বাতিল করা হলো প্যারোল। ততদিনে ফুরিয়ে যায় কোকোর পাসপোর্টের মেয়াদ। আশির দশকের শেষভাগে মেলবোর্নের মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকাউন্টিংয়ে গ্র্যাজুয়েশনের সুবাদে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকার নাগরিকত্ব নেয়ার সুযোগ ছিল কোকোর। কিন্তু দেশের টানে মায়ের কাছে বাংলাদেশে ফিরে আসা আরাফাত রহমান কোকো গুরুতর অসুস্থতার সময়ে ব্যাংককের হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হলেন। মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তার পাসপোর্ট নবায়ন বা নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করতে রাজি হয়নি থাইল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাস। উল্টো বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয় । বাধ্য হয়ে গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ব্যাংকক ছেড়ে যান তিনি।

এরপর একেবারে নীরবে-নিভৃতে নির্বাসিত জীবন কাটান কুয়ালালামপুরে। স্ত্রী আর দুই কন্যাকে নিয়ে কুয়ালালামপুরের জীবনে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না বলে শুনেছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা মালয়েশিয়ায় যথাযথ চিকিৎসা তিনি পেয়েছিলেন কি না তা নিয়েও কারও কারও মনে সংশয় রয়েছে। এসবের মাঝেই ২৪ জানুয়ারি ২০১৫-এ অকালে চলে গেলেন আরাফাত রহমান কোকো।

পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী বনানীর সেনা কবরস্থানে দাফনেরও সুযোগ দেয়া হলো না কোকোকে। এত জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচারের কারণে কি না জানি না, তবে কোকোর জানাযায় লাখো লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে তার প্রতি দেশের মানুষের ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়েছে।

লেখক: ব‍্যারিস্টার ও সাবেক প্রিন্সিপাল লেকচারার ইন পুলিশ এডুকেশন, অ‍্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটি, ইউকে।