ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

শেখ হাসিনা কেন লন্ডনে আশ্রয় পেলেন না

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা লন্ডনে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ব্রিটেনে আশ্রয় দেয়নি দেশটির সরকার। সেসময়কার খবর অনুযায়ী, ভারতে যাওয়ার সময় নরেন্দ্র মোদীর সরকারও জানত, শেখ হাসিনা লন্ডন বা অন্য কোন দেশে আশ্রয় নিবেন। কিন্তু ব্রিটেনসহ বেশ কয়েকটি দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়নি, বরং বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতে ‌‘যতদিন খুশি, ততদিন থাকা’র অনুমতি দেয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সেসময় প্রশ্ন উঠেছিল ঠিক কী কারণে শেখ হাসিনাকে ব্রিটেন বা অন্য দেশগুলো শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিলো না? পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধান পারভেজ মোশাররফ, নওয়াজ শরীফ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওয়ান ইলেভেনের সময় ব্রিটেনে আশ্রয় পেলেও কী কারণে শেখ হাসিনা দেশটিতে আশ্রয় পেলেন না?

আকবর হোসেন

লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ব্রিটেনে অফিসিয়ালি আশ্রয় চেয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই। ৫ আগস্টের সেসময় সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু সংবাদমাধ্যমে এমন খবর দেখলেও পরবর্তীতে লন্ডন হাইকমিশনে যোগ দিয়ে এমন কোন ডকুমেন্টস আমি পাইনি। এটা অফিসিয়াল চ্যানেলের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে তিনি চাইতে পারেন। এছাড়া ৫ আগস্ট তার পতন হওয়ার ফলে তিনি তখন সরকারের কেউ ছিলেন না, সেজন্য এ ধরনের বিষয়গুলো হাইকমিশনের অফিসিয়াল চ্যানেলে হওয়ার কথা নয়।

‘বিশ্বের বহু রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস যুক্তরাজ্যের রয়েছে। তবে শেখ হাসিনার মতো স্বৈরশাসকদের সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় দেওয়া হয়ে থাকে। এ ধরনের কাউকে ব্রিটেনে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কিনা, এ মুহূর্তে আমি বলতে পারছি না’, বলেন হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আকবর হোসেন।

৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা কোন দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, দিল্লী এবং ঢাকায় এমন জল্পনা-কল্পনা যখন তুঙ্গে তখন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে নিউজ করেছিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় বা সাময়িক শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চাইবার জন্য কাউকে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয় না দেশটির ইমিগ্রেশন আইন। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে হলে প্রথমে তিনি যে দেশে নিরাপদে পৌঁছেছেন সেখানেই আশ্রয়ের আবেদন করতে হবে।

সেই অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে প্রথমে ভারতেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে হতো। ব্রিটেনসহ একাধিক দেশের অ্যাসাইলাম নাকচের পর ভারত শেখ হাসিনার সাথে বন্ধুত্বের বিষয় চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত অতিথি বিবেচনায় তাকে যতদিন ইচ্ছা ভারতে থাকার অনুমতি দেয়। তবে এ ঘটনায় সংসদে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল বিজেপি সরকার। ভারতীয় এমপি আসাদ উদ্দিন ওয়াইসি’সহ বেশ কয়েকজন এমপি প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে কেন আশ্রয় নিয়েছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিচ্ছেন। একটি দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ক হওয়া উচিত; কোনও বিশেষ পরিবারের সঙ্গে নয়।

সেসময় শেখ হাসিনার মার্কিন ভিসাও বাতিল করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটিনসহ বেশকিছু মিডিয়ায় তখন এ খবর প্রকাশ হয়েছিল। তিনি ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে সেসব প্রতিবেদনে বলা হয়।

বিবিসি বাংলায় চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত দিল্লী থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনেও সেদিনের ব্রিটেন সরকারের আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‌৫ আগস্ট বিকেল থেকেই দিল্লি প্রবল জল্পনায় সরগরম ছিল, শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে কোন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন! ব্রিটেন তো তালিকায় ছিলই, সঙ্গে নরওয়ে বা সুইডেনের মতো কোনও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ বা এমনকি বেলারুশের কথাও শোনা যাচ্ছিল।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘শেখ হাসিনা তখনও বাংলাদেশের ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টধারী, সঙ্গী বোন শেখ রেহানাও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক– ফলে ৫ আগস্ট রাতেই দিল্লি থেকে তারা অনায়াসে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবেন, ভারত সরকার প্রথমে এমনটাই ভেবেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সেই পরিকল্পনায় বাদ সাধে। দিল্লিতে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে নতুন প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টার্মারের সরকার ভারতকে জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনাকে এখনই তারা সে দেশে আসতে দিতে পারছে না।’

ব্রিটেন সরকার শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা নাকচের বিষয়টি দিল্লীকে কেন জানালো? বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে দিল্লীতে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের সাথে যোগাযোগ করে চ্যানেল আই অনলাইন। প্রশ্ন করা হয়: শেখ হাসিনার হয়ে লন্ডনে যাওয়ার কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি কি তাহলে ভারত সরকারই করেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে জানা যায়, ‘‘শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা কী কারণে বাতিল হয়েছে, সেটি ভারত কিংবা ব্রিটেন সরকার কেউই প্রকাশ করেনি। এটি বলতে তারা বাধ্যও নয়। কারণ, এটি বিশেষ এক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ের আবেদন কোন্ পক্ষ থেকে করা হয়েছে সেটিও কেউই পরিষ্কার করেনি।

তবে যে পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, এবং ভারতের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক। একইভাবে ব্রিটেনের প্রত্যাখ্যানের বিষয়টিও রাজনৈতিক। সেসময় শেখ হাসিনা বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারতের অতিথি ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তার নিজের পক্ষে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে আবেদন করা সম্ভবপর ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই যোগাযোগটা ভারতের পক্ষ থেকেই হওয়ার কথা। এছাড়া সেই সময় শেখ হাসিনা কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ছিলেন। কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীরা যেকোন সময় অন্য দেশে যেতে পারেন। ব্রিটেনের উদ্দেশে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিশেষ বিমান যেহেতু ভারত থেকে ছাড়া হবে, সেজন্য ক্লিয়ারেন্স চাওয়ারও বিষয় ছিল। এজন্য শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি ব্রিটেন সরকার ভারতকে জানানোটাই স্বাভাবিক। তবে কী কারণে লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যান হয়েছে, সেটি উল্লেখ করতে কোন দেশের সরকারই বাধ্য নয়, উল্লেখ করেওনি।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সায়মা আহমেদ বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই পলিটিক্যাল অ্যাসাইলামের কেসগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট যখন দেশ থেকে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেন, তখন তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল, শত শত মানুষ খুনের অভিযোগ ছিল। আল-জাজিরা, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস’সহ স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সুবাদে সেসময় পৃথিবীর সব দেশই বাংলাদেশে তার গণহত্যা এবং ডিক্টেটরশিপের বিষয় জানত। সুতরাং যেসব দেশ হিউমান রাইটস এবং ডেমোক্রেসি প্রমোট করে তাদের পক্ষে শেখ হাসিনাকে অ্যাসাইলাম দেওয়া সম্ভব ছিল না। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলে তারা আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনায় পড়ত। ব্রিটেন শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যান করার এটা একটা কারণ হতে পারে।

ড. সায়মা আহমেদ জানান, ভারত নিজ দেশের নাগরিকদের সাথেও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে। নিজ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারেও তারা বাধা দেয়। গত ১৬ বছরে তারা শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনকে নিঃশর্তভাবে প্রমোট করে এসেছে। সেজন্য তারা ডেমোক্রেসির বদলে স্বৈরাচারকে সেখানে আশ্রয় দিয়েছে। তবে ব্রিটেন বা অন্য কোন দেশ ডেমোক্রেসির বাইরে গিয়ে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় না দেওয়াটাই স্বাভাবিক।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

শেখ হাসিনা কেন লন্ডনে আশ্রয় পেলেন না

আপডেট টাইম : ০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৫

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা লন্ডনে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ব্রিটেনে আশ্রয় দেয়নি দেশটির সরকার। সেসময়কার খবর অনুযায়ী, ভারতে যাওয়ার সময় নরেন্দ্র মোদীর সরকারও জানত, শেখ হাসিনা লন্ডন বা অন্য কোন দেশে আশ্রয় নিবেন। কিন্তু ব্রিটেনসহ বেশ কয়েকটি দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়নি, বরং বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতে ‌‘যতদিন খুশি, ততদিন থাকা’র অনুমতি দেয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সেসময় প্রশ্ন উঠেছিল ঠিক কী কারণে শেখ হাসিনাকে ব্রিটেন বা অন্য দেশগুলো শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিলো না? পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধান পারভেজ মোশাররফ, নওয়াজ শরীফ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওয়ান ইলেভেনের সময় ব্রিটেনে আশ্রয় পেলেও কী কারণে শেখ হাসিনা দেশটিতে আশ্রয় পেলেন না?

আকবর হোসেন

লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ব্রিটেনে অফিসিয়ালি আশ্রয় চেয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই। ৫ আগস্টের সেসময় সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু সংবাদমাধ্যমে এমন খবর দেখলেও পরবর্তীতে লন্ডন হাইকমিশনে যোগ দিয়ে এমন কোন ডকুমেন্টস আমি পাইনি। এটা অফিসিয়াল চ্যানেলের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে তিনি চাইতে পারেন। এছাড়া ৫ আগস্ট তার পতন হওয়ার ফলে তিনি তখন সরকারের কেউ ছিলেন না, সেজন্য এ ধরনের বিষয়গুলো হাইকমিশনের অফিসিয়াল চ্যানেলে হওয়ার কথা নয়।

‘বিশ্বের বহু রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস যুক্তরাজ্যের রয়েছে। তবে শেখ হাসিনার মতো স্বৈরশাসকদের সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় দেওয়া হয়ে থাকে। এ ধরনের কাউকে ব্রিটেনে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কিনা, এ মুহূর্তে আমি বলতে পারছি না’, বলেন হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আকবর হোসেন।

৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা কোন দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, দিল্লী এবং ঢাকায় এমন জল্পনা-কল্পনা যখন তুঙ্গে তখন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে নিউজ করেছিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় বা সাময়িক শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চাইবার জন্য কাউকে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয় না দেশটির ইমিগ্রেশন আইন। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে হলে প্রথমে তিনি যে দেশে নিরাপদে পৌঁছেছেন সেখানেই আশ্রয়ের আবেদন করতে হবে।

সেই অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে প্রথমে ভারতেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে হতো। ব্রিটেনসহ একাধিক দেশের অ্যাসাইলাম নাকচের পর ভারত শেখ হাসিনার সাথে বন্ধুত্বের বিষয় চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত অতিথি বিবেচনায় তাকে যতদিন ইচ্ছা ভারতে থাকার অনুমতি দেয়। তবে এ ঘটনায় সংসদে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল বিজেপি সরকার। ভারতীয় এমপি আসাদ উদ্দিন ওয়াইসি’সহ বেশ কয়েকজন এমপি প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে কেন আশ্রয় নিয়েছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিচ্ছেন। একটি দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ক হওয়া উচিত; কোনও বিশেষ পরিবারের সঙ্গে নয়।

সেসময় শেখ হাসিনার মার্কিন ভিসাও বাতিল করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটিনসহ বেশকিছু মিডিয়ায় তখন এ খবর প্রকাশ হয়েছিল। তিনি ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে সেসব প্রতিবেদনে বলা হয়।

বিবিসি বাংলায় চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত দিল্লী থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনেও সেদিনের ব্রিটেন সরকারের আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‌৫ আগস্ট বিকেল থেকেই দিল্লি প্রবল জল্পনায় সরগরম ছিল, শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে কোন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন! ব্রিটেন তো তালিকায় ছিলই, সঙ্গে নরওয়ে বা সুইডেনের মতো কোনও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ বা এমনকি বেলারুশের কথাও শোনা যাচ্ছিল।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘শেখ হাসিনা তখনও বাংলাদেশের ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টধারী, সঙ্গী বোন শেখ রেহানাও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক– ফলে ৫ আগস্ট রাতেই দিল্লি থেকে তারা অনায়াসে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবেন, ভারত সরকার প্রথমে এমনটাই ভেবেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সেই পরিকল্পনায় বাদ সাধে। দিল্লিতে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে নতুন প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টার্মারের সরকার ভারতকে জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনাকে এখনই তারা সে দেশে আসতে দিতে পারছে না।’

ব্রিটেন সরকার শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা নাকচের বিষয়টি দিল্লীকে কেন জানালো? বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে দিল্লীতে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের সাথে যোগাযোগ করে চ্যানেল আই অনলাইন। প্রশ্ন করা হয়: শেখ হাসিনার হয়ে লন্ডনে যাওয়ার কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি কি তাহলে ভারত সরকারই করেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে জানা যায়, ‘‘শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা কী কারণে বাতিল হয়েছে, সেটি ভারত কিংবা ব্রিটেন সরকার কেউই প্রকাশ করেনি। এটি বলতে তারা বাধ্যও নয়। কারণ, এটি বিশেষ এক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ের আবেদন কোন্ পক্ষ থেকে করা হয়েছে সেটিও কেউই পরিষ্কার করেনি।

তবে যে পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, এবং ভারতের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক। একইভাবে ব্রিটেনের প্রত্যাখ্যানের বিষয়টিও রাজনৈতিক। সেসময় শেখ হাসিনা বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারতের অতিথি ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তার নিজের পক্ষে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে আবেদন করা সম্ভবপর ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই যোগাযোগটা ভারতের পক্ষ থেকেই হওয়ার কথা। এছাড়া সেই সময় শেখ হাসিনা কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ছিলেন। কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীরা যেকোন সময় অন্য দেশে যেতে পারেন। ব্রিটেনের উদ্দেশে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিশেষ বিমান যেহেতু ভারত থেকে ছাড়া হবে, সেজন্য ক্লিয়ারেন্স চাওয়ারও বিষয় ছিল। এজন্য শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি ব্রিটেন সরকার ভারতকে জানানোটাই স্বাভাবিক। তবে কী কারণে লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যান হয়েছে, সেটি উল্লেখ করতে কোন দেশের সরকারই বাধ্য নয়, উল্লেখ করেওনি।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সায়মা আহমেদ বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই পলিটিক্যাল অ্যাসাইলামের কেসগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট যখন দেশ থেকে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেন, তখন তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল, শত শত মানুষ খুনের অভিযোগ ছিল। আল-জাজিরা, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস’সহ স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সুবাদে সেসময় পৃথিবীর সব দেশই বাংলাদেশে তার গণহত্যা এবং ডিক্টেটরশিপের বিষয় জানত। সুতরাং যেসব দেশ হিউমান রাইটস এবং ডেমোক্রেসি প্রমোট করে তাদের পক্ষে শেখ হাসিনাকে অ্যাসাইলাম দেওয়া সম্ভব ছিল না। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলে তারা আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনায় পড়ত। ব্রিটেন শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যান করার এটা একটা কারণ হতে পারে।

ড. সায়মা আহমেদ জানান, ভারত নিজ দেশের নাগরিকদের সাথেও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে। নিজ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারেও তারা বাধা দেয়। গত ১৬ বছরে তারা শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনকে নিঃশর্তভাবে প্রমোট করে এসেছে। সেজন্য তারা ডেমোক্রেসির বদলে স্বৈরাচারকে সেখানে আশ্রয় দিয়েছে। তবে ব্রিটেন বা অন্য কোন দেশ ডেমোক্রেসির বাইরে গিয়ে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় না দেওয়াটাই স্বাভাবিক।