ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেষ হলো জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন তায়েফের বুকে যে মসজিদ মুসলিমদের জন্য এক টুকরো সান্ত্বনা পে স্কেলে বদলাচ্ছে ইনক্রিমেন্ট নীতি, কোন গ্রেডে কত শিগগিরই ১০ হাজার পুলিশ নিয়োগ অন্তরঙ্গ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে জোবায়েদকে হত্যা, তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র বাংলাদেশি সমর্থকদের স্কালোনির ধন্যবাদ দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান ‘মত পার্থক্য থাকতে পারে, ঐক্য যেন নষ্ট না হয়’ শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষিতে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে আইফার্মারের সাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর

পানি নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ, ঘরহারা মানুষের সামনে টিকে থাকার নতুন লড়াই

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজ বাড়িতে ফিরলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। তাদের সামনে অপেক্ষা করছে নতুন বাস্তবতা।

কোথাও ধসে গেছে বসতঘর, কোথাও কাদায় ভরে গেছে ঘরের ভেতর। নষ্ট হয়েছে ফসল, মাছের ঘের, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে এখনো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে হাজারো মানুষ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত দেশের ৫৯টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রাণ গেছে ৫৭ জনের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ মানুষ, পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১। বর্তমানে পানি নামলেও লাখো মানুষের সামনে এখন ঘরবাড়ি, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার কঠিন লড়াই।

এদিকে চট্টগ্রামে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রামে ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

বৃষ্টি কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। জেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায়।

প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ধান, সবজি ও পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি ঢুকে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। কয়েকটি এলাকায় সড়ক যোগাযোগও এখনো বিঘ্নিত রয়েছে।

৩০০ কোটি টাকার ক্ষতির ভারে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে গেলেও দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব বলছে, ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ পর্যন্ত বন্যা ও ভারী বর্ষণজনিত বিভিন্ন ঘটনায় শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১৫ হাজার ২২৩টি বসতঘর, ৩৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৬০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু এসব অবকাঠামোর প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ১৮০ কোটি টাকা।

প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, বন্যায় ৩৫টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ১ লাখ ৩৯৫টি মুরগি ও ১ হাজার হাঁস মারা গেছে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়ির ঘের এবং প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মৎস্য খাতে প্রায় ৯২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষি খাতের ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তার জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল ও ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বন্যা ও বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে দুজন, বাঁশখালীতে তিনজন, সাতকানিয়ায় তিনজন এবং সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীতে একজন করে রয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদুল আলম জানান, এবারের বন্যায় জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি।

তিনি জানান, সরকারি মজুতে বর্তমানে ৫১৬ টন চাল ও ২২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা রয়েছে। এরই মধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে ৬৮৪ টন চাল এবং ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজন মেটাতে আরও ৬২২ টন চাল ও ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এরই মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চাল ও শুকনো খাবারও বিতরণ করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও মৌলভীবাজার জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘ঘরে ফিরলেও থাকার মতো অবস্থা নেই’

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কাথারিয়া ইউনিয়নের ৭৫ বছর বয়সী নওশা মিয়া বলেন, পানি কমছে ঠিক, কিন্তু ঘরে ফিরলেই তো আর থাকা যায় না। আগে ঘর শুকাতে হবে, কাদা সরাতে হবে। চাল ও দেয়াল মেরামত করতে হবে। তারপর দেখা যাবে কীভাবে আবার সংসার শুরু করা যায়।

বাঁশখালীর ডোংরা এলাকার শাহীন আক্তার বলেন, ‘আঁরা ক্যান গইজ্জুম (কী করবো)। ক্যানে ঘর বাইন্দুম। টিঁয়া-পয়সা হডে পাইয়ুম।’

একই উপজেলার প্রেমাশিয়া এলাকার নুরুল আমিন বলেন, ছোট ছেলেমেয়েরা সাত দিন ধরে কষ্ট করছে। পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থাও হয়নি।

কাথারিয়া ইউনিয়নের সাদুর রশীদ বলেন, পরের জমি বর্গা চাষ করে কোনোমতে সংসার চলত। বানের পানিতে মাটির ঘরটাও ধসে গেল। এখন নতুন করে ঘর তুলব কীভাবে, সেই চিন্তাই মাথা থেকে নামছে না।

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের অধিকাংশ কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরে গেছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ নষ্ট হওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা পরিষ্কার করছেন।

‘কনে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি’

পানির ওপর দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরেছিলেন আশা খাতুন। আঙুল তুলে দেখালেন, যেখানে একসময় ছিল তার মাটির ঘর এখন সেখানে শুধু ঘোলা পানি। ঘর নেই, নেই ধানের গোলা, চাল-ডাল কিংবা হাঁস-মুরগি। পুকুরের মাছও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ষাটোর্ধ্ব এই নারী। তার কণ্ঠে শুধু অনিশ্চয়তার আর্তি, ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, কনে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা আশা খাতুন এখন আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর পাকা ঘরে। কয়েক দিনের বন্যায় তার সারা জীবনের সঞ্চয়ে গড়া একমাত্র মাটির ঘরটিও ধসে গেছে। আশা খাতুনের মতো হাজারো পরিবার এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তার জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল ও ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বাঁশখালীর প্রেমাশিয়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, এমন ভয়াবহ বন্যা আগে দেখেনি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সাত দিন ধরে কষ্ট করছে। পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থাও হয়নি।

কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ১,৬৬৩ ঘরবাড়ি

কক্সবাজারে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও জেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৬৩টি বসতঘর। এছাড়া ১ হাজার ৬২৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, ২০১ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ২২০ কিলোমিটার ইটের সড়ক, ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১৫টি সড়ক ও কালভার্ট এবং ৪৩ হাজার ২১০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চকরিয়ার গোবিন্দপুর এলাকার নাছিমা বেগম পাঁচ দিন পর বাড়ি ফিরে দেখেন, ঘরের মেঝে ধসে গেছে এবং পুরো ঘর কাদায় ভরে রয়েছে। এখন কাদা পরিষ্কার করে বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন তিনি।

বন্যা ও পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা মঙ্গলবার পরিদর্শন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। পরিদর্শন শেষে সদর উপজেলার বিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়া এলাকায় শতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন তিনি। এসময় কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বান্দরবান-রাঙ্গামাটিতেও ভয়াবহ ক্ষতি

বান্দরবানে পানি নেমে যাওয়ার পর সড়ক ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।

বন্যায় জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার। পাশাপাশি পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

জেলা প্রশাসন জানায়, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় এ পর্যন্ত ৪০০ টন চাল, ৪০ লাখ টাকা, ৮ হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী এবং ৮৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পৌরসভার উদ্যোগে প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে।

রাঙ্গামাটিতে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো ৩ হাজার ৭৩৯ জন অবস্থান করছেন। পানিবন্দি রয়েছে ১ হাজার ৬৪৬টি পরিবার। অতিবৃষ্টিতে জেলার সাত উপজেলায় ১৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কের একটি অংশ ধসে পড়ায় যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে মঙ্গলবার মহালছড়ি ও সদর উপজেলার বন্যাদুর্গত ৫০০ পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

এসময় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সহায়তায় জেলা পরিষদ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাবে।

ত্রাণের চাহিদা এখনো বেশি

ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল এবং ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম। জরুরি সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষি ও জীবিকা পুনর্গঠনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার আহ্বান।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী

পানি নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ, ঘরহারা মানুষের সামনে টিকে থাকার নতুন লড়াই

আপডেট টাইম : ৪ ঘন্টা আগে

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজ বাড়িতে ফিরলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। তাদের সামনে অপেক্ষা করছে নতুন বাস্তবতা।

কোথাও ধসে গেছে বসতঘর, কোথাও কাদায় ভরে গেছে ঘরের ভেতর। নষ্ট হয়েছে ফসল, মাছের ঘের, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে এখনো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে হাজারো মানুষ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত দেশের ৫৯টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রাণ গেছে ৫৭ জনের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ মানুষ, পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১। বর্তমানে পানি নামলেও লাখো মানুষের সামনে এখন ঘরবাড়ি, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার কঠিন লড়াই।

এদিকে চট্টগ্রামে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রামে ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

বৃষ্টি কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। জেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায়।

প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ধান, সবজি ও পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি ঢুকে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। কয়েকটি এলাকায় সড়ক যোগাযোগও এখনো বিঘ্নিত রয়েছে।

৩০০ কোটি টাকার ক্ষতির ভারে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে গেলেও দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব বলছে, ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ পর্যন্ত বন্যা ও ভারী বর্ষণজনিত বিভিন্ন ঘটনায় শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১৫ হাজার ২২৩টি বসতঘর, ৩৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৬০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু এসব অবকাঠামোর প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ১৮০ কোটি টাকা।

প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, বন্যায় ৩৫টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ১ লাখ ৩৯৫টি মুরগি ও ১ হাজার হাঁস মারা গেছে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়ির ঘের এবং প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মৎস্য খাতে প্রায় ৯২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষি খাতের ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তার জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল ও ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বন্যা ও বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে দুজন, বাঁশখালীতে তিনজন, সাতকানিয়ায় তিনজন এবং সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীতে একজন করে রয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদুল আলম জানান, এবারের বন্যায় জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি।

তিনি জানান, সরকারি মজুতে বর্তমানে ৫১৬ টন চাল ও ২২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা রয়েছে। এরই মধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে ৬৮৪ টন চাল এবং ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজন মেটাতে আরও ৬২২ টন চাল ও ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এরই মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চাল ও শুকনো খাবারও বিতরণ করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও মৌলভীবাজার জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘ঘরে ফিরলেও থাকার মতো অবস্থা নেই’

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কাথারিয়া ইউনিয়নের ৭৫ বছর বয়সী নওশা মিয়া বলেন, পানি কমছে ঠিক, কিন্তু ঘরে ফিরলেই তো আর থাকা যায় না। আগে ঘর শুকাতে হবে, কাদা সরাতে হবে। চাল ও দেয়াল মেরামত করতে হবে। তারপর দেখা যাবে কীভাবে আবার সংসার শুরু করা যায়।

বাঁশখালীর ডোংরা এলাকার শাহীন আক্তার বলেন, ‘আঁরা ক্যান গইজ্জুম (কী করবো)। ক্যানে ঘর বাইন্দুম। টিঁয়া-পয়সা হডে পাইয়ুম।’

একই উপজেলার প্রেমাশিয়া এলাকার নুরুল আমিন বলেন, ছোট ছেলেমেয়েরা সাত দিন ধরে কষ্ট করছে। পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থাও হয়নি।

কাথারিয়া ইউনিয়নের সাদুর রশীদ বলেন, পরের জমি বর্গা চাষ করে কোনোমতে সংসার চলত। বানের পানিতে মাটির ঘরটাও ধসে গেল। এখন নতুন করে ঘর তুলব কীভাবে, সেই চিন্তাই মাথা থেকে নামছে না।

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের অধিকাংশ কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরে গেছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ নষ্ট হওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা পরিষ্কার করছেন।

‘কনে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি’

পানির ওপর দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরেছিলেন আশা খাতুন। আঙুল তুলে দেখালেন, যেখানে একসময় ছিল তার মাটির ঘর এখন সেখানে শুধু ঘোলা পানি। ঘর নেই, নেই ধানের গোলা, চাল-ডাল কিংবা হাঁস-মুরগি। পুকুরের মাছও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ষাটোর্ধ্ব এই নারী। তার কণ্ঠে শুধু অনিশ্চয়তার আর্তি, ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, কনে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা আশা খাতুন এখন আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর পাকা ঘরে। কয়েক দিনের বন্যায় তার সারা জীবনের সঞ্চয়ে গড়া একমাত্র মাটির ঘরটিও ধসে গেছে। আশা খাতুনের মতো হাজারো পরিবার এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তার জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল ও ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বাঁশখালীর প্রেমাশিয়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, এমন ভয়াবহ বন্যা আগে দেখেনি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সাত দিন ধরে কষ্ট করছে। পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থাও হয়নি।

কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ১,৬৬৩ ঘরবাড়ি

কক্সবাজারে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও জেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৬৩টি বসতঘর। এছাড়া ১ হাজার ৬২৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, ২০১ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ২২০ কিলোমিটার ইটের সড়ক, ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১৫টি সড়ক ও কালভার্ট এবং ৪৩ হাজার ২১০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চকরিয়ার গোবিন্দপুর এলাকার নাছিমা বেগম পাঁচ দিন পর বাড়ি ফিরে দেখেন, ঘরের মেঝে ধসে গেছে এবং পুরো ঘর কাদায় ভরে রয়েছে। এখন কাদা পরিষ্কার করে বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন তিনি।

বন্যা ও পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা মঙ্গলবার পরিদর্শন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। পরিদর্শন শেষে সদর উপজেলার বিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়া এলাকায় শতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন তিনি। এসময় কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বান্দরবান-রাঙ্গামাটিতেও ভয়াবহ ক্ষতি

বান্দরবানে পানি নেমে যাওয়ার পর সড়ক ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।

বন্যায় জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার। পাশাপাশি পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

জেলা প্রশাসন জানায়, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় এ পর্যন্ত ৪০০ টন চাল, ৪০ লাখ টাকা, ৮ হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী এবং ৮৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পৌরসভার উদ্যোগে প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে।

রাঙ্গামাটিতে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো ৩ হাজার ৭৩৯ জন অবস্থান করছেন। পানিবন্দি রয়েছে ১ হাজার ৬৪৬টি পরিবার। অতিবৃষ্টিতে জেলার সাত উপজেলায় ১৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কের একটি অংশ ধসে পড়ায় যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে মঙ্গলবার মহালছড়ি ও সদর উপজেলার বন্যাদুর্গত ৫০০ পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

এসময় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সহায়তায় জেলা পরিষদ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাবে।

ত্রাণের চাহিদা এখনো বেশি

ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ৬৪ জেলার প্রশাসকদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল ও ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য আলাদাভাবে ৩ হাজার ২৫০ টন চাল এবং ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম। জরুরি সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষি ও জীবিকা পুনর্গঠনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার আহ্বান।