ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টাকা ছাপতে এক বছরে দ্বিগুণ অর্থ খরচ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

নোট মুদ্রণের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণ বাবদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খরচ হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নোট মুদ্রণের ব্যয় বেড়েছে ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি ৯৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অডিটরস রিপোর্ট ও অডিটেড ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টসে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী নোট তুলে নিয়ে নতুন নোট ছাপানো হয়। ব্যাংকনোট মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণ বিশেষায়িত ও আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। দেশে নোট মুদ্রণের কাজ করে দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড (এসপিসিবিএল)।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, টাকা ছাপানোর জন্য ব্যবহৃত কাগজ ও কালি বিশেষায়িত হওয়ায় এসব উপকরণের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও সীমিত।

ফলে দাম নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ তুলনামূলক কম।তিনি বলেন, ‘এটি বিশেষায়িত কাজ। কালি ও কাগজ বিশেষভাবে তৈরি করায় খরচ বেশি হয়। সব দেশ টাকা ছাপানোর কাগজ তৈরি করে না। তাই সরবরাহকারীদের সঙ্গে খুব বেশি দর-কষাকষি করার সুযোগও থাকে না।

আরিফ হোসেন খান বলেন, এবার নোট মুদ্রণের ব্যয় বাড়ার পেছনে বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব রয়েছে। বৈশ্বিকভাবে কাগজের দাম বেড়েছে, পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় (সাপ্লাই চেইন) সমস্যা হয়েছে। এর সঙ্গে বিনিময় হারও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি থাকা নোটের পরিবর্তে নতুন নকশার নোট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের নকশা পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে।

তবে নতুন নকশার নোট চালুর কারণে মুদ্রণ ব্যয় বেড়েছে—এমনটি মনে করেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তা। তার মতে, নকশা পরিবর্তনের ব্যয় খুবই কম। নতুন নকশার কারণে মূলত নোট মুদ্রণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ কাগজ ও কালির দাম বেড়ে যাওয়া।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণের খরচ বাড়লেও নতুন নোট ছাপানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি বলেও জানান আরিফ হোসেন খান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে ব্যয় হয়েছিল ৩৩৭ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে এ খাতে ব্যয় হয় ৩৭৪ কোটি ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে নোট মুদ্রণের ব্যয় ছিল ৩৮৪ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই নোট মুদ্রণে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নোট মুদ্রণের খরচে বিনিময় হারেরও প্রভাব রয়েছে। তবে গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে আন্তঃব্যাংক গড় বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলারে ১২২ টাকা ৭৭ পয়সা। ২০২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ৮ পয়সা বা প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

ফলে নোট মুদ্রণের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার ক্ষেত্রে বিনিময় হারের পরিবর্তনের চেয়ে কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকটই বড় কারণ বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

টাকা ছাপতে এক বছরে দ্বিগুণ অর্থ খরচ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট টাইম : ১৫ ঘন্টা আগে
নোট মুদ্রণের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণ বাবদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খরচ হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নোট মুদ্রণের ব্যয় বেড়েছে ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি ৯৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অডিটরস রিপোর্ট ও অডিটেড ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টসে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী নোট তুলে নিয়ে নতুন নোট ছাপানো হয়। ব্যাংকনোট মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণ বিশেষায়িত ও আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। দেশে নোট মুদ্রণের কাজ করে দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড (এসপিসিবিএল)।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, টাকা ছাপানোর জন্য ব্যবহৃত কাগজ ও কালি বিশেষায়িত হওয়ায় এসব উপকরণের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও সীমিত।

ফলে দাম নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ তুলনামূলক কম।তিনি বলেন, ‘এটি বিশেষায়িত কাজ। কালি ও কাগজ বিশেষভাবে তৈরি করায় খরচ বেশি হয়। সব দেশ টাকা ছাপানোর কাগজ তৈরি করে না। তাই সরবরাহকারীদের সঙ্গে খুব বেশি দর-কষাকষি করার সুযোগও থাকে না।

আরিফ হোসেন খান বলেন, এবার নোট মুদ্রণের ব্যয় বাড়ার পেছনে বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব রয়েছে। বৈশ্বিকভাবে কাগজের দাম বেড়েছে, পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় (সাপ্লাই চেইন) সমস্যা হয়েছে। এর সঙ্গে বিনিময় হারও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি থাকা নোটের পরিবর্তে নতুন নকশার নোট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের নকশা পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে।

তবে নতুন নকশার নোট চালুর কারণে মুদ্রণ ব্যয় বেড়েছে—এমনটি মনে করেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তা। তার মতে, নকশা পরিবর্তনের ব্যয় খুবই কম। নতুন নকশার কারণে মূলত নোট মুদ্রণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ কাগজ ও কালির দাম বেড়ে যাওয়া।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণের খরচ বাড়লেও নতুন নোট ছাপানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি বলেও জানান আরিফ হোসেন খান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে ব্যয় হয়েছিল ৩৩৭ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে এ খাতে ব্যয় হয় ৩৭৪ কোটি ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে নোট মুদ্রণের ব্যয় ছিল ৩৮৪ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই নোট মুদ্রণে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নোট মুদ্রণের খরচে বিনিময় হারেরও প্রভাব রয়েছে। তবে গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে আন্তঃব্যাংক গড় বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলারে ১২২ টাকা ৭৭ পয়সা। ২০২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ৮ পয়সা বা প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

ফলে নোট মুদ্রণের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার ক্ষেত্রে বিনিময় হারের পরিবর্তনের চেয়ে কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকটই বড় কারণ বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।