ঢাকা , শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পুলিশে যুক্ত হচ্ছে নতুন ইউনিট, শাখা থাকবে যেসব এলাকায় পুলিশের কেউ ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত হলে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিটি থেকে ইউনাইটেডে করিম কাসিম নিউইয়র্কে ৪ দিনে ৩০ কর্মসূচি, ১১ দেশের নেতার সঙ্গে বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর: মাহদী আমিন নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সফর সার্থক সাফল্যের মাইলফলক টিকাদানে গাফিলতির কারণে হামে শিশুদের প্রাণহানি হয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশ্ব পর্যটন দিবস : ১৩ ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার’ কোনো ‘প্ল্যান’ ছাড়াই যা করেন জয়া আহসান হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়, আজ স্বপ্ন দেখার দিন

হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না

বিস্তীর্ণ বিলের যতদূর চোখ যায়, শুধু কচুরিপানা। এই কচুরিপানার নিচে ঢাকা পড়েছে তিন উপজেলার কমপক্ষে ২৭ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। ফলে রবি মৌসুমের চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বহু কৃষক।

কচুরিপানা জমে থাকায় গত বছর প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি ছিল। এ বছরও বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি অনাবাদি থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কচুরিপানা অপসারণে সরকারিভাবে তেমন কোনও উদ্যোগ নেই।

কৃষি বিভাগ যা বলছে

চলনবিলের অন্যতম জেলা নাটোর। প্রতি বছর বর্ষার পর রবি মৌসুমে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে গম, ভুট্টা, রাই-সরিষা, ইরি, বোরো ধানসহ মসলা জাতীয় শস্য চাষ হয়। বিশেষ করে জেলার গুরুদাসপুরের এক হাজার, সিংড়ার ১৫ হাজার  ও নলডাঙ্গা উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৫ হাজার এবং পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার ৪ হাজারসহ প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমির ওপরে কচুরিপানার বিস্তার। পানি নেমে যাওয়ার পর এসব জমিতে রাই-সরিষা, গম ভুট্টা ও রসুনের আবাদ হয়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। কচুরিপানার বিস্তার রোধে কৃষকরা একক প্রচেষ্টায় হিমশিম খাচ্ছেন।

২০ বিলে কচুরিপানার বিস্তার

গুরুদাসপুরের খুবজীপুর, বিলশা, শ্রীপুর, পিঁপলা, বামনবাড়িয়া, মশিন্দার ১০ নম্বর ব্রিজ এলাকা, নাদোসৈয়দপুর, বিলকাঠুর, বিলব্যাসপুর, যোগেন্দ্রনগর, বিলহরীবাড়ী, হরদমা, সিংড়ার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর ও শেরকোল বেড়াবাড়ি, কাউয়াটিকরি, ইন্দ্রাসন, মাগুড়া, বিলতাজপুর, সাতপুকুরিয়া, ইটালী, ডাহিয়া, সারদানগর, শেরকোল, চৌগ্রাম, জোলারবাতা এবং তাড়াশের রুহাই, কুন্দইল, হান্ডিয়ালসহ কমপক্ষে ২০ বিলের বিস্তীর্ণ পানিতে এখন কচুরিপানা ভাসছে। সময়মতো অপসারণ না করলে গত মৌসুমের মতো এবারও বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এসব বিল ঘুরে দেখা গেছে, বিলের পানির ওপর কচুরিপানা সবুজ গালিচা বিছিয়েছে। দেখতে সুন্দর লাগলেও এটিই কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের দুশ্চিন্তার পাশাপাশি নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। উন্মুক্ত জলারাশির মৎস্যজীবীরাও মাছ শিকার করতে পারছেন না। মূলত চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণ এবং দখল-দূষণে নদী সংকুচিত হওয়ায় পানিতে ভাটির টান নেই। ফলে কচুরিপানা আটকে বৃহৎ পরিসরে বংশ বিস্তার করছে।

অপসারণে অধিক ব্যয়

এ অঞ্চলের কৃষকদের ভাষ্যমতে, জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণ করা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, কষ্টসাধ্যও। রয়েছে শ্রমিক সংকটও। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্রমিকরা মজুরি বাড়িয়ে দিন হাজিরা ৬০০ টাকা নিচ্ছেন। প্রতি বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ শ্রমিক প্রয়োজন হচ্ছে। এতে বিঘায় অপসারণ করতে কৃষকের সার্বিক ব্যয় হচ্ছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। বাড়তি এই ব্যয়ের জোগান দেওয়া কৃষকের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারদেনা করে হলেও ফসলি জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণের প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

বিলশা, যোগেন্দ্রনগর, বিলব্যাসপুর ও কুন্দইল গ্রামের কৃষক বোরহান উদ্দিন, আব্দুল খালেক, হাসেম আলী ও খবির উদ্দিনসহ কমপক্ষে ২০ কৃষক বলেন, বন্যার চরিত্র বদলে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে ভালো ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এ বছর আবার কচুরিপানার স্থায়িত্ব কৃষকের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বর্গাচাষিরা কচুরিপানা অপসারণ করে জমি চাষাবাদের উপযোগী করে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই চরা সুদে মহাজনি ঋণ নিয়ে জমি প্রস্তুতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত বছর আবাদ করা যায়নি ১০০ হেক্টরে

নাটোরের সিংড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বানের পানির সঙ্গে ভেসে এসে আর ফেরত যায়নি কচুরিপানা। ফলে বোরো মৌসুমে জোলারবাতা ও চৌগ্রাম বিলেই প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে কোনও আবাদ করা যায়নি। বন্যা পরবর্তী সময় বিলে বোরো ধান, গম ও সরিষা চাষাবাদ করতে না পেরে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা। কষি বিভাগও সরিষা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

সিংড়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর কচুরিপানা জমে থাকায় প্রায় ৮০ বিঘা জমিতে চাষবাস করতে পারেননি। তার জমির আশপাশে শতাধিক কৃষকও পরিষ্কার না করতে পেরে বোরো ধান চাষ করা সম্ভব হয়নি। এ বছরও একই অবস্থা।

বেড়াবাড়ি গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, গত বছর তিনি ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে এক বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করে ধান রোপণ করেছিলেন। আগাম বন্যায় এবং অতিবৃষ্টির কারণে পাকা ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। এবারও বিলে কচুরিপানার আগ্রাসী বিস্তার দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। শঙ্কায় রয়েছেন চাষাবাদ নিয়ে।

কচুরিপানায় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস

বিলের পানিতে কচুরিপানা দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান শুধু চাষাবাদে প্রভাব ফেলছে তা নয়। বিলের লতাগুল্ম এবং জলজ উদ্ভিদও ধ্বংস করছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এম আলী আককাছ বলেন, কচুরিপানার বিস্তারে পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে। বিলে শাপলা-পদ্ম ফুলের দেখা নেই। পানির সবটুকু দখল করে নিয়েছে। দ্রুত অপসারণ করে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার দাবি তার।

কচুরিপানার প্রভাব অন্য পেশাতেও

বিলের উন্মুক্ত জলারাশি কচুরিপানার দখলে থাকায় মৎস্যজীবীদের জীবিকায় টান পড়েছে। মঙ্গাভাব তৈরি হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রিক পেশাতেও।

ডাহিয়া গ্রামের মৎস্যজীবী জুলহাজ হোসেন বলেন, বর্ষায় চলনবিলে মাছ ধরে তার সংসার চলতো। এই বর্ষায় কচুরিপানায় বিস্তীর্ণ বিল একাকার হয়ে গেছে। ফলে সুবিধামতো মাছ ধরতে পারছেন না। তারমতো কয়েক হাজার মৎস্যজীবী মাছ ধরতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন।

তিশিখালী মাজারের ব্যবসায়ী ঝরু মিয়া বলেন, বর্ষা এলে প্রায় প্রতিদিনই দূরদূরান্তের মানুষ এই মাজারে এসে দান খয়রাত করেন। লোক সমাগম বাড়লে তার প্রতিষ্ঠানের বিক্রিও বাড়ে। কিন্তু এবার কচুরিপানা থাকায় নৌকা চলতে পারছে না। ফলে অন্য বছরের তুলনায় বেচাকেনা অর্ধেকে নেমেছে।এখন যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে কচুরিপানা অপসারণ করে বিলের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তার

সমাধান কোন পথে

কৃষিবিদ আবদুল হামিদ বলেন, কৃষকদের ব্যক্তিগত অর্থে বিশাল বিলের কচুরিপানা অপসারণ করা সম্ভব নয়। কৃষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি অর্থায়নে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপসারণ করতে হবে। তবেই বিলের প্রাণ প্রকৃতি স্বাভাবিক হবে। কৃষকরাও সময়মতো নির্বিঘ্নে রবিশস্য আবাদ করতে পারবেন। স্বস্তি ফিরবে বিল কেন্দ্রিক অন্যান্য পেশাতেও।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কী পরিমাণ ফসলি জমি কচুরিপানার নিচে আছে তা তিনি বলতে পারছেন না। তাছাড়া অপসারণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কোনও উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার মোবাইল না ধরায় এ বিষয়ে তার কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

পুলিশে যুক্ত হচ্ছে নতুন ইউনিট, শাখা থাকবে যেসব এলাকায়

হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না

আপডেট টাইম : ৪৮ মিনিট আগে

বিস্তীর্ণ বিলের যতদূর চোখ যায়, শুধু কচুরিপানা। এই কচুরিপানার নিচে ঢাকা পড়েছে তিন উপজেলার কমপক্ষে ২৭ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। ফলে রবি মৌসুমের চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বহু কৃষক।

কচুরিপানা জমে থাকায় গত বছর প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি ছিল। এ বছরও বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি অনাবাদি থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কচুরিপানা অপসারণে সরকারিভাবে তেমন কোনও উদ্যোগ নেই।

কৃষি বিভাগ যা বলছে

চলনবিলের অন্যতম জেলা নাটোর। প্রতি বছর বর্ষার পর রবি মৌসুমে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে গম, ভুট্টা, রাই-সরিষা, ইরি, বোরো ধানসহ মসলা জাতীয় শস্য চাষ হয়। বিশেষ করে জেলার গুরুদাসপুরের এক হাজার, সিংড়ার ১৫ হাজার  ও নলডাঙ্গা উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৫ হাজার এবং পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার ৪ হাজারসহ প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমির ওপরে কচুরিপানার বিস্তার। পানি নেমে যাওয়ার পর এসব জমিতে রাই-সরিষা, গম ভুট্টা ও রসুনের আবাদ হয়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। কচুরিপানার বিস্তার রোধে কৃষকরা একক প্রচেষ্টায় হিমশিম খাচ্ছেন।

২০ বিলে কচুরিপানার বিস্তার

গুরুদাসপুরের খুবজীপুর, বিলশা, শ্রীপুর, পিঁপলা, বামনবাড়িয়া, মশিন্দার ১০ নম্বর ব্রিজ এলাকা, নাদোসৈয়দপুর, বিলকাঠুর, বিলব্যাসপুর, যোগেন্দ্রনগর, বিলহরীবাড়ী, হরদমা, সিংড়ার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর ও শেরকোল বেড়াবাড়ি, কাউয়াটিকরি, ইন্দ্রাসন, মাগুড়া, বিলতাজপুর, সাতপুকুরিয়া, ইটালী, ডাহিয়া, সারদানগর, শেরকোল, চৌগ্রাম, জোলারবাতা এবং তাড়াশের রুহাই, কুন্দইল, হান্ডিয়ালসহ কমপক্ষে ২০ বিলের বিস্তীর্ণ পানিতে এখন কচুরিপানা ভাসছে। সময়মতো অপসারণ না করলে গত মৌসুমের মতো এবারও বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এসব বিল ঘুরে দেখা গেছে, বিলের পানির ওপর কচুরিপানা সবুজ গালিচা বিছিয়েছে। দেখতে সুন্দর লাগলেও এটিই কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের দুশ্চিন্তার পাশাপাশি নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। উন্মুক্ত জলারাশির মৎস্যজীবীরাও মাছ শিকার করতে পারছেন না। মূলত চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণ এবং দখল-দূষণে নদী সংকুচিত হওয়ায় পানিতে ভাটির টান নেই। ফলে কচুরিপানা আটকে বৃহৎ পরিসরে বংশ বিস্তার করছে।

অপসারণে অধিক ব্যয়

এ অঞ্চলের কৃষকদের ভাষ্যমতে, জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণ করা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, কষ্টসাধ্যও। রয়েছে শ্রমিক সংকটও। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্রমিকরা মজুরি বাড়িয়ে দিন হাজিরা ৬০০ টাকা নিচ্ছেন। প্রতি বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ শ্রমিক প্রয়োজন হচ্ছে। এতে বিঘায় অপসারণ করতে কৃষকের সার্বিক ব্যয় হচ্ছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। বাড়তি এই ব্যয়ের জোগান দেওয়া কৃষকের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারদেনা করে হলেও ফসলি জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণের প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

বিলশা, যোগেন্দ্রনগর, বিলব্যাসপুর ও কুন্দইল গ্রামের কৃষক বোরহান উদ্দিন, আব্দুল খালেক, হাসেম আলী ও খবির উদ্দিনসহ কমপক্ষে ২০ কৃষক বলেন, বন্যার চরিত্র বদলে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে ভালো ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এ বছর আবার কচুরিপানার স্থায়িত্ব কৃষকের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বর্গাচাষিরা কচুরিপানা অপসারণ করে জমি চাষাবাদের উপযোগী করে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই চরা সুদে মহাজনি ঋণ নিয়ে জমি প্রস্তুতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত বছর আবাদ করা যায়নি ১০০ হেক্টরে

নাটোরের সিংড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বানের পানির সঙ্গে ভেসে এসে আর ফেরত যায়নি কচুরিপানা। ফলে বোরো মৌসুমে জোলারবাতা ও চৌগ্রাম বিলেই প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে কোনও আবাদ করা যায়নি। বন্যা পরবর্তী সময় বিলে বোরো ধান, গম ও সরিষা চাষাবাদ করতে না পেরে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা। কষি বিভাগও সরিষা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

সিংড়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর কচুরিপানা জমে থাকায় প্রায় ৮০ বিঘা জমিতে চাষবাস করতে পারেননি। তার জমির আশপাশে শতাধিক কৃষকও পরিষ্কার না করতে পেরে বোরো ধান চাষ করা সম্ভব হয়নি। এ বছরও একই অবস্থা।

বেড়াবাড়ি গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, গত বছর তিনি ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে এক বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করে ধান রোপণ করেছিলেন। আগাম বন্যায় এবং অতিবৃষ্টির কারণে পাকা ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। এবারও বিলে কচুরিপানার আগ্রাসী বিস্তার দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। শঙ্কায় রয়েছেন চাষাবাদ নিয়ে।

কচুরিপানায় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস

বিলের পানিতে কচুরিপানা দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান শুধু চাষাবাদে প্রভাব ফেলছে তা নয়। বিলের লতাগুল্ম এবং জলজ উদ্ভিদও ধ্বংস করছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এম আলী আককাছ বলেন, কচুরিপানার বিস্তারে পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে। বিলে শাপলা-পদ্ম ফুলের দেখা নেই। পানির সবটুকু দখল করে নিয়েছে। দ্রুত অপসারণ করে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার দাবি তার।

কচুরিপানার প্রভাব অন্য পেশাতেও

বিলের উন্মুক্ত জলারাশি কচুরিপানার দখলে থাকায় মৎস্যজীবীদের জীবিকায় টান পড়েছে। মঙ্গাভাব তৈরি হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রিক পেশাতেও।

ডাহিয়া গ্রামের মৎস্যজীবী জুলহাজ হোসেন বলেন, বর্ষায় চলনবিলে মাছ ধরে তার সংসার চলতো। এই বর্ষায় কচুরিপানায় বিস্তীর্ণ বিল একাকার হয়ে গেছে। ফলে সুবিধামতো মাছ ধরতে পারছেন না। তারমতো কয়েক হাজার মৎস্যজীবী মাছ ধরতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন।

তিশিখালী মাজারের ব্যবসায়ী ঝরু মিয়া বলেন, বর্ষা এলে প্রায় প্রতিদিনই দূরদূরান্তের মানুষ এই মাজারে এসে দান খয়রাত করেন। লোক সমাগম বাড়লে তার প্রতিষ্ঠানের বিক্রিও বাড়ে। কিন্তু এবার কচুরিপানা থাকায় নৌকা চলতে পারছে না। ফলে অন্য বছরের তুলনায় বেচাকেনা অর্ধেকে নেমেছে।এখন যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে কচুরিপানা অপসারণ করে বিলের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তার

সমাধান কোন পথে

কৃষিবিদ আবদুল হামিদ বলেন, কৃষকদের ব্যক্তিগত অর্থে বিশাল বিলের কচুরিপানা অপসারণ করা সম্ভব নয়। কৃষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি অর্থায়নে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপসারণ করতে হবে। তবেই বিলের প্রাণ প্রকৃতি স্বাভাবিক হবে। কৃষকরাও সময়মতো নির্বিঘ্নে রবিশস্য আবাদ করতে পারবেন। স্বস্তি ফিরবে বিল কেন্দ্রিক অন্যান্য পেশাতেও।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কী পরিমাণ ফসলি জমি কচুরিপানার নিচে আছে তা তিনি বলতে পারছেন না। তাছাড়া অপসারণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কোনও উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার মোবাইল না ধরায় এ বিষয়ে তার কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।