ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

বর্বর মিয়ানমার ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে বলছি, রোহিঙ্গা সংকট কি আপনাকে স্পর্শ করছে? মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চলছে। তারচেয়েও বড় বিষয়, সাত-আট লাখ রোহিঙ্গা, বর্মী সেনা-সন্ত্রাসীদের গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের মতো সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়, মানবিক রাষ্ট্র। তাই অসহায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে বাংলাদেশ। মানবিকতা দেখালেও এখানেই রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট। এই সংকট নিরসনে যেখানে আমাদের জাতীয় ঐক্য দরকার, সেখানে আমরা কী করছি?

মিয়ানমারের বর্বর সরকার রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী বলছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের এই বিপদের দিনে অশান্তির জননী অং সান সু চির সাথে হাত মিলিয়ে রোহিঙ্গা নির্মূলে নিজ সরকারের সমঅবস্থান ঘোষণা করেছে। ১৯৭১ এ আমাদের কাছে পরাজিত পাকিস্তান মিয়ানমারের কাছে নিজেদের তৈরি যুদ্ধ বিমান সরবরাহ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে গণহত্যার কথা অস্বীকার করছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাবে ইতোমধ্যে নারাজি দিয়ে রেখেছে চীন। অথচ লাখ লাখ রোহিঙ্গা গত কয়েক দিনে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। নতুন করে আমাদের জমিতে বস্তি বানাচ্ছে। টেকনাফের রাস্তায় রাস্তায় রোহিঙ্গা নর-নারী-শিশুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিয়ানমারের মর্টার শেল এসে পড়েছে আমাদের সীমান্তে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার রোহিঙ্গাদের বোমায় ঝলসে দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তেও অনুপ্রবেশ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। সীমান্তরক্ষা করতে গিয়ে বীরবাহিনী বিজিবির এক ভাই গুলিতে নিহত পর্যন্ত হয়েছিলেন এর আগে। এমন জাতীয় সংকটে আমরা করছি কী?

১৯৭১ সালের ভারত আর ২০১৭ সালের ভারত কেন এক নয়, ভেবে দেখেছেন? এর উত্তর পেতে হলে আমাদের আরও পেছনে যেতে হবে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের হতদরিদ্র কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন হবে বলে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জমিদার শ্রেণি এত বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি মানবেন কীভাবে? আর অর্থনৈতিক কারনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা তো ছিলই। ফলাফল ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এর ক্ষতিপূরণ বাবদ ইংরেজ সরকার পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে দেয়ার ঘোষণা দিলেও ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ সরাসরি এর বিরোধিতা করে। মুসলমানদের জন্য, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্য আবার বিশ্ববিদ্যালয় লাগবে? এই ছিল তাদের মনোভাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মাদ্রাসা’ বলে হাসি-তামাশাও করেছে এই ভারতীয়রা।

১৯৪৭ সালে তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশটি বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। অনেকখানি এগিয়েও গিয়েছিলেন। কথা ছিল দার্জিলিং, কলকাতা, আসামের কাছাড় ও করিমগঞ্জ এবং বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে সে বিশাল বঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে এই বঙ্গরাষ্ট্র, যাকে সে সময়ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ বলে ডাকতেন, পাকিস্তান-ভারতের সাথে যাবে, না কি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ, দিল্লির জহরলাল নেহেরু আর পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক গোপন বৈঠকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে মিলে বাঙালির সেই রাষ্ট্র হতে দেয়নি। দার্জিলিং, কাছাড়, করিমগঞ্জ আর কলকাতাকে জিন্নাহ ছেড়ে দিয়েছিলেন কারণ, এগুলো আমাদের সাথে যুক্ত হলে পশ্চিম পাকিস্তান আকার এবং গুরুত্বের দিক থেকে মার খেয়ে যাবে। আর ভারতীয়রা কলকাতাকে ছাড়তে চায়নি, কারণ কলকাতা চলে গেলে তাদের আর থাকল কী।

অথচ কলকাতা গড়ে উঠেছিল পূর্ববঙ্গের দরিদ্র কৃষকের খাজনার টাকায়। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা আছে। যে ভারত ইতিহাসে কখনো আমাদের সাথ দেয়নি, সে ভারত ১৯৭১ সালে অস্ত্র দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। ২৪ বছরে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী আমাদের ওপর সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালিয়ে তাদের গোলাম বানিয়ে রাখতে চেয়েছে। শেষপর্যন্ত ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, বিশেষ করে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ঢাকায় ঘুমিয়ে থাকা নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলা চালায়। ইতিহাসের ভয়ালতম সে গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের দোসর জামায়াত, আলবদর, আল-শামস, রাজাকাররা মিলে ধর্ষণ করে আমাদের দুই লাখেরও বেশি মা-বোনকে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গীয়রা আমাদের সাথে আসেনি আমরা মুসলমানরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে আর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা মুসলমান হওয়ার পরও আমাদের ওপর গণহত্যা চালায়, কারণ আমরা বাঙালি মুসলমান বলে। পাকিস্তানিরা বাঙালি বলে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কাউকে বাদ দেয়নি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হুট করেই ৭ মার্চের ভাষণ দেননি, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বাঙালির একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েমে জাতির পিতার আকুতি কত পুরনো সেটি অসমাপ্ত আত্মজীবনী আর কারাগারের রোজনামচা পড়লেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে। ভারতের সামরিক-মানবিক সাহায্যও কোনো আবেগতাড়িত বা আকস্মিক বিষয় নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে ১৯৬২ সালে আগরতলা দিয়ে দিল্লী গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নেহেরু বলেছিলেন ‘এখন তোমাদের কোনো সহযোগিতা আমি করতে পারব না , আগে তোমরা নিজেরা প্রস্তুত হও’। বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে নিজেদের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৩০ লাখ মানুষ এদেশে প্রাণ দিয়েছে, পুরো বিশ্বে জনমত তৈরি হয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরাশক্তি জাতিসংঘে আমাদের হয়ে অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো গণহত্যার বিরুদ্ধে নিউজ, ফিচার ও ছবি ছাপাতে বাধ্য হয়েছে।

এক হাজার, দুই হাজার নয়, ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানিরা। শেষদিকে আমাদের বিজয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত, তখন ভারতের সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী এসে যোগ দিয়েছে। আমাদের সেনাসদস্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এক হাজারেরও বেশি ভারতীয় সেনা এদেশে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দিয়েছিল।

ভারতের সে সহযোগিতার জন্য ইতিহাসের বিচারে আমরা ঋণী।  কিন্তু ঋণী হওয়া আর দাস হওয়া এক জিনিস নয়। ১৯৭১ এ আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ, ভারত পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় তার একমাত্র বড় ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র। ভারতের এক পাশে চীন, নেপাল ও ভুটান এবং আরেক পাশে পাকিস্তান। ভুটান ও বাংলাদেশ ছাড়া, আর সবাই ভারতকে ‘ডিস্টার্ব’ করে। কাশ্মির সামলাতে ভারত হিমশিম খাচ্ছে, কয়দিন আগেই চীনের চাপে ভারত প্রায় মিইয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ এ আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর সুবিধা ভারত আজীবন পেয়ে যাবে। বাংলাদেশের বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ ভারতের উলফাসহ নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে নির্মূলে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে চলেছে। কলকাতার বাস ঢাকা হয়ে নিমিষে আগরতলা চলে যায়। বাংলাদশ ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স খাত। হাজার হাজার ভারতীয় বাংলাদেশে চাকরি করে, ব্যবসা করে ভারতে রেমিট্যান্স পাঠায়। অথচ আজ বাংলাদেশের বিপদের সময়, ভারতের সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী জরুরিভিত্তিতে মিয়ানমার সফর করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান ঘোষণা করেছেন।

চীনের সাথে যুদ্ধে না পেরে কূটনীতিতে খেলা দেখাতে চায় ভারত। তাই মিয়ানমারকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে চায়। চীনের প্রভাব কমাতে গিয়ে বাংলাদেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতেও এখন আর কার্পণ্যবোধ করে না ভারত। মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা গণহত্যা করছে তা নয়, বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে সামরিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। নানামুখী সংকট সৃষ্টি হতে পারে। রোহিঙ্গারা নির্যাতিত, দরিদ্র এবং অশিক্ষিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার, ইসরায়েলসহ যেকোনো রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থে এই রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালাতে পারে। একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ উল্লিখিত সব রাষ্ট্রের জন্য নানাদিক থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত। মিয়ানমার ইতোমধ্যে বলে দিয়েছে, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী, এদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে না। রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণ করতে বর্মী পুলিশের ওপর সাজানো হামলার ঘটনা প্রচার করা হয়েছে। কফি আনানের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমিটি যখন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের দাবি জানিয়েছিল, সেদিনই এই কথিত হামলার অজুহাতে নিরীহ রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা শুরু করে  বর্বর বর্মী সেনাবাহিনী। তারপর থেকে বাংলাদেশের দিকে রোহিঙ্গা স্রোত অব্যাহত আছে।

ভারতের স্বার্থে ভারত কাজ করবে, চীন, পাকিস্তান সবাই যে যার স্বার্থ দেখবে, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা করছি কী? ঢাকা-কেন্দ্রিক এক শ্রেণির শিক্ষিত মানুষ মোদি আর সুচির ভাষায় কথা বলছে। রোহিঙ্গাদেরকে সন্ত্রাসী বলছেন এরা। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হলে এদেরকে বাংলাদেশ সরকার প্রবেশ করতে দিচ্ছে কেন? রোহিঙ্গাদের জন্য অস্থায়ী হলেও আলাদা জায়গা বরাদ্দের ঘোষণা দিচ্ছে কেন? চট্টগ্রামের হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দিচ্ছে কেন? রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণ করার জন্য দুই/তিন বছর আগের ছবি-সংবাদ ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা টেকনাফে ছিনতাই করে, চুরি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন চুরি, ছিনতাই তো সকলেই করে। তাই বলে এই জাতীয় বিপদের সময় সুচি-মোদির সাথে গলা মিলিয়ে আমরাও রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী বলব? দক্ষিণ আফ্রিকার আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু সু চিকে গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানাতে পারেন, আর ঢাকায় বসে কিছু শিক্ষিত লোক রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণে উঠে পড়ে লেগেছে। এই লোকগুলো কারা? কাদের স্বার্থে, কিসের আশায় এরা এমন করছে?

মিয়ানমারে গণহত্যা হয়েছে কি হয়নি, রোহিঙ্গাদের গণহত্যায় আপনার মন খুশি হোক বা বেজার হোক, তার চেয়েও বড় কথা, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়ে মিয়ানমার এক কঠিন বিপদ ও সংকটের জন্ম দিয়েছে। সামনে ২০১৯ সালের নির্বাচন। বাংলাদেশ গত ৮ বছরে রাষ্ট্র হিসেবে অর্থনৈতিক ও সামরিক ভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। ভারতের বিরোধিতা উপেক্ষা করে চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন ক্রয় করে থ্রি-ডাইমেনশনাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে অনেকখানি এগিয়ে গেছে। মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। ইনক্লোসিভ ইকোনমিক গ্রোথ রেটে ভারত থেকে ২৪ ধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। গত ১০ বছর এভারেজে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশ। বিশেষ করে গত দুইবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাতেরও উপর। বাংলাদেশ উন্নত হয়ে গেলে, ভারতের স্বাধীনতাকামী দরিদ্র রাজ্যগুলো স্বাধীনতার জন্য আরও যৌক্তিকতা খুঁজে পাবে। তাই ভারতও চাইবেনা বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। দরকারের সময় তিস্তাসহ নানা নদীর পানি আটকে রেখে, বন্যার সময় পানি ছেড়ে দিয়ে ভারত তাই শুধু প্রতিবেশীর পরিচয় দেয়।

বাংলাদেশ কোনো ফকির রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ পৃথিবীতে একাও নয়। বাংলাদেশ দুর্বল হলে চীনের প্রেসিডেন্ট এত আগ্রহ আর প্রস্তাব নিয়ে সফর করতে আসতেন না। তুরস্কের ফার্স্টলেডি বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন বলে এক শ্রেণির মানুষ যতভাবে পারা যায় তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করছেন। এই মনোযোগ আর সময় যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়ে দেয়া যেত, মোদি যদি সুচির পাশে না দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়াতেন, তাহলে তো তুরস্কের ফার্স্টলেডির কাজে আমাদের হাততালি দেয়া লাগত না। মোদীকে কিছু না বলে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি নিয়ে যারা মশকরা করছেন, তাঁরা বোধহয় জানেন না, তুরস্ক বাংলাদেশের অন্যতম অস্ত্র যোগানদাতা। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, মালদ্বীপ যখন মিয়ানমারের সরকার বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, বাংলাদেশের উচিত হবে সতর্কতার সাথে সেখানে ইতিবাচক সাড়া দেয়া। জাতিসংঘ, ওআইসিতে চাপ দিয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আদায় করতে হবে।

সমস্ত উপায় অবলম্বন করে মিয়ানমারকে বাধ্য করতেই হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতেই হবে মিয়ানমারকে। এমন একটি সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তায় ভরা সময়ে বাংলাদেশের এখন দরকার জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ঐক্যের জন্য দরকার জাতীয় নেতা। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা হত্যাকাণ্ডের পরে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার মহাসড়কে তুলে এনে বর্তমান বাংলাদেশের অবিসংবাদিত জননেতায় পরিণত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। শুধু জাতীয় নেতা হিসেবে নন, পুরো বিশ্বের মধ্যেই শেখ হাসিনা এখন একজন শীর্ষ নেতা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মিয়ানমারসহ অন্যান্য ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যই পারে বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখতে। দরকার হলে নিশ্চয় যুদ্ধ করবে বাংলাদেশ। কিন্তু এই মুহূর্তে কারো উস্কানিতে পা দেয়া যাবে না। আমরা উন্নয়নের পথে আছি। বাংলাদেশের মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোকে সামনে এনে, কূটনৈতিক এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে এমন প্রতিটি দেশের সাথে যোগাযোগ করে, প্রভাব খাটিয়ে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখতে হবে। আর এই কাজে জাতীয় নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব, ধৈর্য ও সাহসই হবে আমাদের মূল শক্তি।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

বর্বর মিয়ানমার ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য

আপডেট টাইম : ১১:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে বলছি, রোহিঙ্গা সংকট কি আপনাকে স্পর্শ করছে? মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চলছে। তারচেয়েও বড় বিষয়, সাত-আট লাখ রোহিঙ্গা, বর্মী সেনা-সন্ত্রাসীদের গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের মতো সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়, মানবিক রাষ্ট্র। তাই অসহায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে বাংলাদেশ। মানবিকতা দেখালেও এখানেই রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট। এই সংকট নিরসনে যেখানে আমাদের জাতীয় ঐক্য দরকার, সেখানে আমরা কী করছি?

মিয়ানমারের বর্বর সরকার রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী বলছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের এই বিপদের দিনে অশান্তির জননী অং সান সু চির সাথে হাত মিলিয়ে রোহিঙ্গা নির্মূলে নিজ সরকারের সমঅবস্থান ঘোষণা করেছে। ১৯৭১ এ আমাদের কাছে পরাজিত পাকিস্তান মিয়ানমারের কাছে নিজেদের তৈরি যুদ্ধ বিমান সরবরাহ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে গণহত্যার কথা অস্বীকার করছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাবে ইতোমধ্যে নারাজি দিয়ে রেখেছে চীন। অথচ লাখ লাখ রোহিঙ্গা গত কয়েক দিনে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। নতুন করে আমাদের জমিতে বস্তি বানাচ্ছে। টেকনাফের রাস্তায় রাস্তায় রোহিঙ্গা নর-নারী-শিশুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিয়ানমারের মর্টার শেল এসে পড়েছে আমাদের সীমান্তে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার রোহিঙ্গাদের বোমায় ঝলসে দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তেও অনুপ্রবেশ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। সীমান্তরক্ষা করতে গিয়ে বীরবাহিনী বিজিবির এক ভাই গুলিতে নিহত পর্যন্ত হয়েছিলেন এর আগে। এমন জাতীয় সংকটে আমরা করছি কী?

১৯৭১ সালের ভারত আর ২০১৭ সালের ভারত কেন এক নয়, ভেবে দেখেছেন? এর উত্তর পেতে হলে আমাদের আরও পেছনে যেতে হবে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের হতদরিদ্র কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন হবে বলে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জমিদার শ্রেণি এত বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি মানবেন কীভাবে? আর অর্থনৈতিক কারনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা তো ছিলই। ফলাফল ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এর ক্ষতিপূরণ বাবদ ইংরেজ সরকার পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে দেয়ার ঘোষণা দিলেও ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ সরাসরি এর বিরোধিতা করে। মুসলমানদের জন্য, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্য আবার বিশ্ববিদ্যালয় লাগবে? এই ছিল তাদের মনোভাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মাদ্রাসা’ বলে হাসি-তামাশাও করেছে এই ভারতীয়রা।

১৯৪৭ সালে তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশটি বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। অনেকখানি এগিয়েও গিয়েছিলেন। কথা ছিল দার্জিলিং, কলকাতা, আসামের কাছাড় ও করিমগঞ্জ এবং বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে সে বিশাল বঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে এই বঙ্গরাষ্ট্র, যাকে সে সময়ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ বলে ডাকতেন, পাকিস্তান-ভারতের সাথে যাবে, না কি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ, দিল্লির জহরলাল নেহেরু আর পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক গোপন বৈঠকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে মিলে বাঙালির সেই রাষ্ট্র হতে দেয়নি। দার্জিলিং, কাছাড়, করিমগঞ্জ আর কলকাতাকে জিন্নাহ ছেড়ে দিয়েছিলেন কারণ, এগুলো আমাদের সাথে যুক্ত হলে পশ্চিম পাকিস্তান আকার এবং গুরুত্বের দিক থেকে মার খেয়ে যাবে। আর ভারতীয়রা কলকাতাকে ছাড়তে চায়নি, কারণ কলকাতা চলে গেলে তাদের আর থাকল কী।

অথচ কলকাতা গড়ে উঠেছিল পূর্ববঙ্গের দরিদ্র কৃষকের খাজনার টাকায়। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা আছে। যে ভারত ইতিহাসে কখনো আমাদের সাথ দেয়নি, সে ভারত ১৯৭১ সালে অস্ত্র দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। ২৪ বছরে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী আমাদের ওপর সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালিয়ে তাদের গোলাম বানিয়ে রাখতে চেয়েছে। শেষপর্যন্ত ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, বিশেষ করে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ঢাকায় ঘুমিয়ে থাকা নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলা চালায়। ইতিহাসের ভয়ালতম সে গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের দোসর জামায়াত, আলবদর, আল-শামস, রাজাকাররা মিলে ধর্ষণ করে আমাদের দুই লাখেরও বেশি মা-বোনকে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গীয়রা আমাদের সাথে আসেনি আমরা মুসলমানরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে আর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা মুসলমান হওয়ার পরও আমাদের ওপর গণহত্যা চালায়, কারণ আমরা বাঙালি মুসলমান বলে। পাকিস্তানিরা বাঙালি বলে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কাউকে বাদ দেয়নি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হুট করেই ৭ মার্চের ভাষণ দেননি, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বাঙালির একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েমে জাতির পিতার আকুতি কত পুরনো সেটি অসমাপ্ত আত্মজীবনী আর কারাগারের রোজনামচা পড়লেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে। ভারতের সামরিক-মানবিক সাহায্যও কোনো আবেগতাড়িত বা আকস্মিক বিষয় নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে ১৯৬২ সালে আগরতলা দিয়ে দিল্লী গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নেহেরু বলেছিলেন ‘এখন তোমাদের কোনো সহযোগিতা আমি করতে পারব না , আগে তোমরা নিজেরা প্রস্তুত হও’। বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে নিজেদের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৩০ লাখ মানুষ এদেশে প্রাণ দিয়েছে, পুরো বিশ্বে জনমত তৈরি হয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরাশক্তি জাতিসংঘে আমাদের হয়ে অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো গণহত্যার বিরুদ্ধে নিউজ, ফিচার ও ছবি ছাপাতে বাধ্য হয়েছে।

এক হাজার, দুই হাজার নয়, ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানিরা। শেষদিকে আমাদের বিজয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত, তখন ভারতের সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী এসে যোগ দিয়েছে। আমাদের সেনাসদস্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এক হাজারেরও বেশি ভারতীয় সেনা এদেশে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দিয়েছিল।

ভারতের সে সহযোগিতার জন্য ইতিহাসের বিচারে আমরা ঋণী।  কিন্তু ঋণী হওয়া আর দাস হওয়া এক জিনিস নয়। ১৯৭১ এ আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ, ভারত পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় তার একমাত্র বড় ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র। ভারতের এক পাশে চীন, নেপাল ও ভুটান এবং আরেক পাশে পাকিস্তান। ভুটান ও বাংলাদেশ ছাড়া, আর সবাই ভারতকে ‘ডিস্টার্ব’ করে। কাশ্মির সামলাতে ভারত হিমশিম খাচ্ছে, কয়দিন আগেই চীনের চাপে ভারত প্রায় মিইয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ এ আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর সুবিধা ভারত আজীবন পেয়ে যাবে। বাংলাদেশের বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ ভারতের উলফাসহ নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে নির্মূলে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে চলেছে। কলকাতার বাস ঢাকা হয়ে নিমিষে আগরতলা চলে যায়। বাংলাদশ ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স খাত। হাজার হাজার ভারতীয় বাংলাদেশে চাকরি করে, ব্যবসা করে ভারতে রেমিট্যান্স পাঠায়। অথচ আজ বাংলাদেশের বিপদের সময়, ভারতের সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী জরুরিভিত্তিতে মিয়ানমার সফর করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান ঘোষণা করেছেন।

চীনের সাথে যুদ্ধে না পেরে কূটনীতিতে খেলা দেখাতে চায় ভারত। তাই মিয়ানমারকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে চায়। চীনের প্রভাব কমাতে গিয়ে বাংলাদেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতেও এখন আর কার্পণ্যবোধ করে না ভারত। মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা গণহত্যা করছে তা নয়, বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে সামরিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। নানামুখী সংকট সৃষ্টি হতে পারে। রোহিঙ্গারা নির্যাতিত, দরিদ্র এবং অশিক্ষিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার, ইসরায়েলসহ যেকোনো রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থে এই রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালাতে পারে। একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ উল্লিখিত সব রাষ্ট্রের জন্য নানাদিক থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত। মিয়ানমার ইতোমধ্যে বলে দিয়েছে, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী, এদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে না। রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণ করতে বর্মী পুলিশের ওপর সাজানো হামলার ঘটনা প্রচার করা হয়েছে। কফি আনানের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমিটি যখন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের দাবি জানিয়েছিল, সেদিনই এই কথিত হামলার অজুহাতে নিরীহ রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা শুরু করে  বর্বর বর্মী সেনাবাহিনী। তারপর থেকে বাংলাদেশের দিকে রোহিঙ্গা স্রোত অব্যাহত আছে।

ভারতের স্বার্থে ভারত কাজ করবে, চীন, পাকিস্তান সবাই যে যার স্বার্থ দেখবে, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা করছি কী? ঢাকা-কেন্দ্রিক এক শ্রেণির শিক্ষিত মানুষ মোদি আর সুচির ভাষায় কথা বলছে। রোহিঙ্গাদেরকে সন্ত্রাসী বলছেন এরা। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হলে এদেরকে বাংলাদেশ সরকার প্রবেশ করতে দিচ্ছে কেন? রোহিঙ্গাদের জন্য অস্থায়ী হলেও আলাদা জায়গা বরাদ্দের ঘোষণা দিচ্ছে কেন? চট্টগ্রামের হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দিচ্ছে কেন? রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণ করার জন্য দুই/তিন বছর আগের ছবি-সংবাদ ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা টেকনাফে ছিনতাই করে, চুরি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন চুরি, ছিনতাই তো সকলেই করে। তাই বলে এই জাতীয় বিপদের সময় সুচি-মোদির সাথে গলা মিলিয়ে আমরাও রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী বলব? দক্ষিণ আফ্রিকার আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু সু চিকে গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানাতে পারেন, আর ঢাকায় বসে কিছু শিক্ষিত লোক রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণে উঠে পড়ে লেগেছে। এই লোকগুলো কারা? কাদের স্বার্থে, কিসের আশায় এরা এমন করছে?

মিয়ানমারে গণহত্যা হয়েছে কি হয়নি, রোহিঙ্গাদের গণহত্যায় আপনার মন খুশি হোক বা বেজার হোক, তার চেয়েও বড় কথা, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়ে মিয়ানমার এক কঠিন বিপদ ও সংকটের জন্ম দিয়েছে। সামনে ২০১৯ সালের নির্বাচন। বাংলাদেশ গত ৮ বছরে রাষ্ট্র হিসেবে অর্থনৈতিক ও সামরিক ভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। ভারতের বিরোধিতা উপেক্ষা করে চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন ক্রয় করে থ্রি-ডাইমেনশনাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে অনেকখানি এগিয়ে গেছে। মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। ইনক্লোসিভ ইকোনমিক গ্রোথ রেটে ভারত থেকে ২৪ ধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। গত ১০ বছর এভারেজে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশ। বিশেষ করে গত দুইবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাতেরও উপর। বাংলাদেশ উন্নত হয়ে গেলে, ভারতের স্বাধীনতাকামী দরিদ্র রাজ্যগুলো স্বাধীনতার জন্য আরও যৌক্তিকতা খুঁজে পাবে। তাই ভারতও চাইবেনা বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। দরকারের সময় তিস্তাসহ নানা নদীর পানি আটকে রেখে, বন্যার সময় পানি ছেড়ে দিয়ে ভারত তাই শুধু প্রতিবেশীর পরিচয় দেয়।

বাংলাদেশ কোনো ফকির রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ পৃথিবীতে একাও নয়। বাংলাদেশ দুর্বল হলে চীনের প্রেসিডেন্ট এত আগ্রহ আর প্রস্তাব নিয়ে সফর করতে আসতেন না। তুরস্কের ফার্স্টলেডি বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন বলে এক শ্রেণির মানুষ যতভাবে পারা যায় তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করছেন। এই মনোযোগ আর সময় যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়ে দেয়া যেত, মোদি যদি সুচির পাশে না দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়াতেন, তাহলে তো তুরস্কের ফার্স্টলেডির কাজে আমাদের হাততালি দেয়া লাগত না। মোদীকে কিছু না বলে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি নিয়ে যারা মশকরা করছেন, তাঁরা বোধহয় জানেন না, তুরস্ক বাংলাদেশের অন্যতম অস্ত্র যোগানদাতা। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, মালদ্বীপ যখন মিয়ানমারের সরকার বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, বাংলাদেশের উচিত হবে সতর্কতার সাথে সেখানে ইতিবাচক সাড়া দেয়া। জাতিসংঘ, ওআইসিতে চাপ দিয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আদায় করতে হবে।

সমস্ত উপায় অবলম্বন করে মিয়ানমারকে বাধ্য করতেই হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতেই হবে মিয়ানমারকে। এমন একটি সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তায় ভরা সময়ে বাংলাদেশের এখন দরকার জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ঐক্যের জন্য দরকার জাতীয় নেতা। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা হত্যাকাণ্ডের পরে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার মহাসড়কে তুলে এনে বর্তমান বাংলাদেশের অবিসংবাদিত জননেতায় পরিণত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। শুধু জাতীয় নেতা হিসেবে নন, পুরো বিশ্বের মধ্যেই শেখ হাসিনা এখন একজন শীর্ষ নেতা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মিয়ানমারসহ অন্যান্য ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যই পারে বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখতে। দরকার হলে নিশ্চয় যুদ্ধ করবে বাংলাদেশ। কিন্তু এই মুহূর্তে কারো উস্কানিতে পা দেয়া যাবে না। আমরা উন্নয়নের পথে আছি। বাংলাদেশের মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোকে সামনে এনে, কূটনৈতিক এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে এমন প্রতিটি দেশের সাথে যোগাযোগ করে, প্রভাব খাটিয়ে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখতে হবে। আর এই কাজে জাতীয় নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব, ধৈর্য ও সাহসই হবে আমাদের মূল শক্তি।