ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

রোহিঙ্গা শিশু তর্কের ফাঁদে অপুষ্ট

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ বেশ কয়েক দিন ধরে পত্রপত্রিকার শিরোনামগুলো দখল করে আছে মিয়ানমার থেকে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ। এর মধ্যে বাঙালী কণ্ঠর রোহিঙ্গা শিশুদের অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত দুর্ভোগকে প্রাধান্য দিয়ে বেশ কিছু দরকারি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২১ অক্টোবর-এর মূল খবর ছিল, ‘অতি জরুরিভাবে শিশুদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন’। ২৩ অক্টোবর বাঙালী কণ্ঠর লিখেছে, ‘তীব্র অপুষ্টিতে রোহিঙ্গা শিশুরা’।

একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পুষ্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সুবাদে গত মাসের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সে অভিজ্ঞতা বলছে, পত্রপত্রিকা পড়ে আমরা যা জানতে পারছি, পরিস্থিতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভয়াবহ ও শোচনীয়। প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা আসছে। আমরা জানছি, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের প্রায় ৩০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মানে, আশ্রয়প্রার্থী দলের প্রতি ১০ জনে ৩ জন করে আসছে শিশু।

এরা আমাদের দেশে এসে পৌঁছাচ্ছে রওনা দেওয়ার সপ্তাহখানেক বা তার চেয়েও বেশি দিন ধরে যাত্রাপথে হেঁটে। এই পুরো সময়টাতে কখনো তাদের খাওয়া জুটেছে, কখনো জোটেনি। নিরেট বাস্তব হলো অনাহারে-অর্ধাহারেই তাদের পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে দীর্ঘ এতটা পথ। আর পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবের সঙ্গে হেঁটে আসার দুর্যোগকবলিত পথে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই যে ত্বরিতগতিতে প্রত্যেকের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারছে, তা তো নয়। টেকনাফ পেরিয়ে উখিয়ার ক্যাম্প পর্যন্ত আসতে আসতেই পেরিয়ে যাচ্ছে আরও বেশ কয়েকটা দিন।

দীর্ঘ এই ১০-১২ দিনের ধকলে এই কম বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে যাচ্ছে মারাত্মকভাবে। রোহিঙ্গাদের আবাস যে আরাকান রাজ্য, আর্থিক ও মানবাধিকারের বিচারে সেটি মিয়ানমারের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত এলাকা। অনুমান করা কঠিন নয় যে নিজ দেশে থাকা অবস্থায়ও এসব শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অবস্থা কতটা নিচের স্তরে ছিল। বিতাড়িত ও অনাহারী এই দুর্বল স্বাস্থ্যের শিশুদের জন্য মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের সংকটবহুল পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট হয়ে উঠেছে ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’র মতো।

ক্যাম্পে এসেও শিশুগুলোর মোটেই কোনো স্বস্তি নেই। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারাটা দিন ত্রাণের জন্য অপেক্ষা আর দিন শেষে খাদ্যসহ নানা কিছুর ভারী বোঝা বা পানির ওজনদার জারিকেন নিয়ে অপুষ্ট শরীরে পাহাড়ি খাঁড়াই পাড়ি দেওয়ার ধকল। ত্রাণ সংগ্রহে ব্যস্ত মা ছোট্ট শিশুকে ঠিকমতো দিতে পারছেন না বুকের দুধ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো তাই আক্ষরিক অর্থে শিশুদের জন্য নরক। অপুষ্ট ও রোগাক্রান্ত শিশুদের সেখানে ছড়াছড়ি। তাদের অতি জরুরি প্রয়োজন যথাযথ খাবার, পথ্য ও চিকিৎসার।

উখিয়ার আট-দশটা ক্যাম্পের মধ্যে চারটি আমার নিজের কর্মক্ষেত্র। গত মাসখানেকের বেশি দিনের প্রত্যক্ষ কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মোট শিশুর প্রায় প্রতি চারজনের একজন ভুগছে বিশেষ ধরনের অপুষ্টিতে, পুষ্টিবিজ্ঞানের অভিধানে যাকে বলা হয় ‘স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টি’। খুব কম সময়ের মধ্যে—খাবারের তীব্র অভাবে বা অসুখবিসুখে—শিশু দ্রুত অতিরিক্ত ওজন হারিয়ে ফেললে এই অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়। এতে তার মৃত্যুঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টির মাত্রা ১৫ শতাংশের বেশি হলে ইউএনএইচসিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয়, দুর্গত এলাকায় সংকটাপন্ন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্যাম্পগুলোতে দেখতে পেয়েছি, স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু ২৪ শতাংশের বেশি। এটি ইউএনএইচসিআর নির্দেশিত সংকটাপন্ন মাত্রার প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি।

রোহিঙ্গা শিশুদের অপুষ্টিজনিত মৃত্যু ঠেকাতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ দেশি ও বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলো আপ্রাণ কাজ করে চলেছে। তবে সমস্যা হয়ে উঠেছে সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতিটি শয্যায় উপচে পড়া ভিড়। একজনের শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে দু-তিনজন করে শিশু। এ অবস্থায় এত শিশুর চিকিৎসা হাসপাতালে রেখে করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তাই কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত’ পুষ্টিপথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাম্পগুলোতে এই বিশেষ ধরনের অপুষ্টির চিকিৎসাসেবা শুরু করেছে। শিশুরা এতে অল্প সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠছে ঠিকই, কিন্তু নিজের ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার পর খাবারের অভাবে আবারও অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।

‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত’ এই পুষ্টিপথ্যটি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় কোনো কোনো পুষ্টিবিদ এটি ব্যবহারের বিপক্ষে। তাঁদের মতে, হালুয়া বা খিচুড়ি ইত্যাদি রান্না করা খাবারের মাধ্যমে অপুষ্ট শিশুদের সেবা দেওয়া দরকার। সমস্যা অবশ্য সেখানেও কম নয়। প্রতিদিন নিয়মিত দু-তিন হাজার শিশুর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপত্তায় খাবার রান্না ও পরিবেশন করা বিরাট এক চ্যালেঞ্জ। এ প্রশ্ন না ওঠার অবকাশ নেই যে নিরাপদ পানি ও উপযুক্ত স্যানিটেশনের অভাবে রান্না করা খাবার প্রতিদিন আদৌ কতটা যথাযথভাবে বিতরণ করা সম্ভব? ক্যাম্পের খোলা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না করা খাবার খেয়ে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার দায়ভার কে নেবে? ফলে প্রশ্নটি জরুরি, তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা এই শিশুদের বাঁচাতে কোন পথটি সঠিক—প্যাকেটজাত বিদেশি পথ্য, নাকি চাল-ডালে রান্না করা খাবার ? কিন্তু জরুরি এই প্রশ্নের অব্যর্থ জবাব কারও কাছে নেই। এ অবস্থায় কি তাহলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন ?

হতভাগ্য রোহিঙ্গা শিশুদের অসহায়ত্বের মুখে হাত গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ আদতে কারোরই নেই। ওরা আমার দেশে এসেই পড়েছে। মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে টলটলায়মান এই শিশুদের মানবিক চাহিদার প্রতি আমাদের সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। যথাযথ চিকিৎসা, খাদ্য, পথ্য তাদের দিতে হবে।

‘স্বীকৃত আন্তর্জাতিক প্যাকেটজাত পথ্য’ নাকি ‘রান্না করা খিচুড়ি’, মৃত্যুর মুখোমুখি ধুঁকতে থাকা রোহিঙ্গা শিশুদের সামনে রেখে সে তাত্ত্বিক বিতর্কের সময় এখন নয়। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে হোক বা উন্নয়নকর্মী হিসেবে, এ প্রশ্নের সমাধান আমাদের নিশ্চয়ই করতে হবে। কিন্তু এখন প্রয়োজন এই শিশুদের বাঁচিয়ে তোলা। তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা। এবং সবাই একসঙ্গে মিলে।

প্রথম আলো

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

রোহিঙ্গা শিশু তর্কের ফাঁদে অপুষ্ট

আপডেট টাইম : ১০:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ নভেম্বর ২০১৭

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ বেশ কয়েক দিন ধরে পত্রপত্রিকার শিরোনামগুলো দখল করে আছে মিয়ানমার থেকে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ। এর মধ্যে বাঙালী কণ্ঠর রোহিঙ্গা শিশুদের অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত দুর্ভোগকে প্রাধান্য দিয়ে বেশ কিছু দরকারি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২১ অক্টোবর-এর মূল খবর ছিল, ‘অতি জরুরিভাবে শিশুদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন’। ২৩ অক্টোবর বাঙালী কণ্ঠর লিখেছে, ‘তীব্র অপুষ্টিতে রোহিঙ্গা শিশুরা’।

একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পুষ্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সুবাদে গত মাসের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সে অভিজ্ঞতা বলছে, পত্রপত্রিকা পড়ে আমরা যা জানতে পারছি, পরিস্থিতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভয়াবহ ও শোচনীয়। প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা আসছে। আমরা জানছি, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের প্রায় ৩০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মানে, আশ্রয়প্রার্থী দলের প্রতি ১০ জনে ৩ জন করে আসছে শিশু।

এরা আমাদের দেশে এসে পৌঁছাচ্ছে রওনা দেওয়ার সপ্তাহখানেক বা তার চেয়েও বেশি দিন ধরে যাত্রাপথে হেঁটে। এই পুরো সময়টাতে কখনো তাদের খাওয়া জুটেছে, কখনো জোটেনি। নিরেট বাস্তব হলো অনাহারে-অর্ধাহারেই তাদের পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে দীর্ঘ এতটা পথ। আর পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবের সঙ্গে হেঁটে আসার দুর্যোগকবলিত পথে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই যে ত্বরিতগতিতে প্রত্যেকের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারছে, তা তো নয়। টেকনাফ পেরিয়ে উখিয়ার ক্যাম্প পর্যন্ত আসতে আসতেই পেরিয়ে যাচ্ছে আরও বেশ কয়েকটা দিন।

দীর্ঘ এই ১০-১২ দিনের ধকলে এই কম বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে যাচ্ছে মারাত্মকভাবে। রোহিঙ্গাদের আবাস যে আরাকান রাজ্য, আর্থিক ও মানবাধিকারের বিচারে সেটি মিয়ানমারের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত এলাকা। অনুমান করা কঠিন নয় যে নিজ দেশে থাকা অবস্থায়ও এসব শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অবস্থা কতটা নিচের স্তরে ছিল। বিতাড়িত ও অনাহারী এই দুর্বল স্বাস্থ্যের শিশুদের জন্য মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের সংকটবহুল পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট হয়ে উঠেছে ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’র মতো।

ক্যাম্পে এসেও শিশুগুলোর মোটেই কোনো স্বস্তি নেই। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারাটা দিন ত্রাণের জন্য অপেক্ষা আর দিন শেষে খাদ্যসহ নানা কিছুর ভারী বোঝা বা পানির ওজনদার জারিকেন নিয়ে অপুষ্ট শরীরে পাহাড়ি খাঁড়াই পাড়ি দেওয়ার ধকল। ত্রাণ সংগ্রহে ব্যস্ত মা ছোট্ট শিশুকে ঠিকমতো দিতে পারছেন না বুকের দুধ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো তাই আক্ষরিক অর্থে শিশুদের জন্য নরক। অপুষ্ট ও রোগাক্রান্ত শিশুদের সেখানে ছড়াছড়ি। তাদের অতি জরুরি প্রয়োজন যথাযথ খাবার, পথ্য ও চিকিৎসার।

উখিয়ার আট-দশটা ক্যাম্পের মধ্যে চারটি আমার নিজের কর্মক্ষেত্র। গত মাসখানেকের বেশি দিনের প্রত্যক্ষ কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মোট শিশুর প্রায় প্রতি চারজনের একজন ভুগছে বিশেষ ধরনের অপুষ্টিতে, পুষ্টিবিজ্ঞানের অভিধানে যাকে বলা হয় ‘স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টি’। খুব কম সময়ের মধ্যে—খাবারের তীব্র অভাবে বা অসুখবিসুখে—শিশু দ্রুত অতিরিক্ত ওজন হারিয়ে ফেললে এই অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়। এতে তার মৃত্যুঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টির মাত্রা ১৫ শতাংশের বেশি হলে ইউএনএইচসিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয়, দুর্গত এলাকায় সংকটাপন্ন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্যাম্পগুলোতে দেখতে পেয়েছি, স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু ২৪ শতাংশের বেশি। এটি ইউএনএইচসিআর নির্দেশিত সংকটাপন্ন মাত্রার প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি।

রোহিঙ্গা শিশুদের অপুষ্টিজনিত মৃত্যু ঠেকাতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ দেশি ও বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলো আপ্রাণ কাজ করে চলেছে। তবে সমস্যা হয়ে উঠেছে সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতিটি শয্যায় উপচে পড়া ভিড়। একজনের শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে দু-তিনজন করে শিশু। এ অবস্থায় এত শিশুর চিকিৎসা হাসপাতালে রেখে করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তাই কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত’ পুষ্টিপথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাম্পগুলোতে এই বিশেষ ধরনের অপুষ্টির চিকিৎসাসেবা শুরু করেছে। শিশুরা এতে অল্প সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠছে ঠিকই, কিন্তু নিজের ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার পর খাবারের অভাবে আবারও অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।

‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত’ এই পুষ্টিপথ্যটি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় কোনো কোনো পুষ্টিবিদ এটি ব্যবহারের বিপক্ষে। তাঁদের মতে, হালুয়া বা খিচুড়ি ইত্যাদি রান্না করা খাবারের মাধ্যমে অপুষ্ট শিশুদের সেবা দেওয়া দরকার। সমস্যা অবশ্য সেখানেও কম নয়। প্রতিদিন নিয়মিত দু-তিন হাজার শিশুর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপত্তায় খাবার রান্না ও পরিবেশন করা বিরাট এক চ্যালেঞ্জ। এ প্রশ্ন না ওঠার অবকাশ নেই যে নিরাপদ পানি ও উপযুক্ত স্যানিটেশনের অভাবে রান্না করা খাবার প্রতিদিন আদৌ কতটা যথাযথভাবে বিতরণ করা সম্ভব? ক্যাম্পের খোলা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না করা খাবার খেয়ে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার দায়ভার কে নেবে? ফলে প্রশ্নটি জরুরি, তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা এই শিশুদের বাঁচাতে কোন পথটি সঠিক—প্যাকেটজাত বিদেশি পথ্য, নাকি চাল-ডালে রান্না করা খাবার ? কিন্তু জরুরি এই প্রশ্নের অব্যর্থ জবাব কারও কাছে নেই। এ অবস্থায় কি তাহলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন ?

হতভাগ্য রোহিঙ্গা শিশুদের অসহায়ত্বের মুখে হাত গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ আদতে কারোরই নেই। ওরা আমার দেশে এসেই পড়েছে। মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে টলটলায়মান এই শিশুদের মানবিক চাহিদার প্রতি আমাদের সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। যথাযথ চিকিৎসা, খাদ্য, পথ্য তাদের দিতে হবে।

‘স্বীকৃত আন্তর্জাতিক প্যাকেটজাত পথ্য’ নাকি ‘রান্না করা খিচুড়ি’, মৃত্যুর মুখোমুখি ধুঁকতে থাকা রোহিঙ্গা শিশুদের সামনে রেখে সে তাত্ত্বিক বিতর্কের সময় এখন নয়। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে হোক বা উন্নয়নকর্মী হিসেবে, এ প্রশ্নের সমাধান আমাদের নিশ্চয়ই করতে হবে। কিন্তু এখন প্রয়োজন এই শিশুদের বাঁচিয়ে তোলা। তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা। এবং সবাই একসঙ্গে মিলে।

প্রথম আলো