ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

বাংলার প্রথম প্রোগ্রামার

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ এই সে দিনও কেউ জানত না বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার কে ? কার হাত ধরে ৫৩ বছর আগে আমরা কম্পিউটারের যুগে পা ফেলেছিলাম- সেটি বিস্তৃতপ্রায় অতীত। অতি সম্প্রতি বিষয়টি আমাদের মিডিয়ার নজরে পড়েছে। সেটিও একটি সম্মাননা পাওয়ার পর। এই বিষয়টি দৈনিক সমকাল পত্রিকায় এভাবে বলা হয়েছে- ‘দেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হানিফ উদ্দিন মিয়াকে মরণোত্তর সম্মাননা জানিয়েছে আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি। বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো-২০১৫ শীর্ষক মেলার সমাপনী আয়োজনে হানিফ উদ্দিন মিয়ার স্ত্রী ও সন্তানের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেয়া হয়। …বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো-২০১৫ শীর্ষক মেলার সমাপনী আয়োজনে হানিফ উদ্দিন মিয়ার সন্তান এবং স্ত্রীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত’।

অনেকটা পাদপ্রদীপের আলোয় না থাকা প্রয়াত এই প্রোগ্রামার এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন। পত্রিকাটি আরো লিখেছে- জানা গেছে, মূলত তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বারের প্রচেষ্টাতেই তাকে পুরস্কৃত করেছে আইসিটি বিভাগ ও বিসিএস। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী দেশের এই প্রথম প্রোগ্রামার সম্পর্কে কেন অজ্ঞাত ছিল দেশবাসীর এমন প্রশ্নের উত্তরে মোস্তাফা জব্বার জানান, তিনি আসলে অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। তবে দেশের প্রতি তার টান ছিল অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটারটি আসে ১৯৬৪ সালে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে)। সেটি ছিল আইবিএম মেইন ফ্রেম ১৬২০ কম্পিউটার। বৃহদাকৃতির ওই কম্পিউটারটি স্থাপন করতে দুটি বড় রুম ব্যবহার করতে হয়েছিল। ঢাউস আকারের সেই কম্পিউটারটিকে ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে স্থাপন করা হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ডিজিটাল মেইন ফ্রেম কম্পিউটার।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটার আইবিএম ১৬২০ তার হাত ধরেই। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে (টিএসসি সংলগ্ন) সেটি স্থাপিত হয়। পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা এবং দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, প্রোগ্রাম উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং নানামুখী গবেষণা কাজে এটি ব্যবহার করেন। তবে ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটারটি কেন স্থাপিত হয়েছিল, তা জানা প্রয়োজন। মোস্তাফা জব্বার জানান, পাকিস্তান সরকার তখন কম্পিউটারটি পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরের পরমাণু শক্তি কমিশনে স্থাপনের পরিকল্পনা করে। তবে হানিফ উদ্দিন মিয়া ছাড়া অন্য কেউ এ কম্পিউটার তদারকি এবং পরিচালনার যোগ্য ছিলেন না। এজন্য সরকার হানিফ উদ্দিন মিয়াকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার আহ্বান জানালো। ওই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন হানিফ উদ্দিন। ফলে কম্পিউটারটি ঢাকার আণবিক কমিশনে স্থাপনে অনেকটা বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।

এখনকার সময়ে বিদেশ মানেই স্বর্গ। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য পাকিস্তানই ছিল স্বর্গ। কিন্তু হানিফ উদ্দিন সেই স্বর্গের হাতছানি প্রত্যাখ্যান করেন। এ দেশে ক’জন এমন মানুষ ছিল বা এখনো আছে ? ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে তার জন্মস্থান নাটোরের সিংড়ার হুলহুলিয়া গ্রামে ডিজিটাল হাব স্থাপনের কাজ শুরু হয়। গ্রামটি এখন শতভাগ শিক্ষিত মানুষের গ্রাম। আরো একটি সুখবর হচ্ছে তার সঙ্গে কাজ করেছিলেন এমন আরো একজনের সন্ধান আমরা পেয়েছি, যার নাম মুহম্মদ মুসা।

সমকাল হানিফ উদ্দিন মিয়ার শিক্ষা ও পেশা নিয়ে আরো লিখেছে, ‘কম্পিউটারের সঙ্গে সখ্য হলো কীভাবে হানিফ উদ্দিন মিয়ার- এটি জানতে হলে ফিরে যেতে হবে তার তারুণ্যে। বাংলাদেশের গৌরব, নাটোরের এই কৃতীসন্তান পরমাণু বিজ্ঞানী হানিফ উদ্দিন মিয়া ১৯২৯ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের সিংড়ার হুলহুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলশিক্ষক বাবা রজব আলী তালুকদারের দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ তিনি। সংসারে অভাব না থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য জায়গির থাকতে হয় তাকে। ১৯৪৬ সালে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৮ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএসসিতেও প্রথম বিভাগ লাভ করেন।

এরপর ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এমএসসি পরীক্ষায় ফলিত গণিতে প্রথম শ্রেণিতে স্বর্ণপদকসহ প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৯৬০ সালে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন থিওরি এন্ড অটোমেশন, চেকোস্লোভাক একাডেমি অব সায়েন্স, প্রাগ থেকে অ্যানালগ কম্পিউটার টেকনিক এবং ডিজিটাল কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে সিস্টেম অ্যানালিসিস, নিউমেরাল ম্যাথমেটিকস, অ্যাডভান্স কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, অপারেশন রিসার্চে এমআইটি (যুক্তরাষ্ট্র) কম্পিউটার সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে আইবিএম রিসার্চ সেন্টার লন্ডন থেকে অপারেটিং সিস্টেম ও সিস্টেম প্রোগ্রামিংয়ে ট্রেনিং করেন। তারপর তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় প্রোগ্রামার অ্যানালিস্ট হিসেবে অ্যানালাইসিস, ডিজাইন, সফটওয়্যার ইমপ্লিমেন্টেশন অব কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রাম সংক্রান্ত বিষয়ে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তিনি অঙ্কশাস্ত্র ও কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। পারিবারিক জীবনে স্ত্রী ফরিদা বেগম ও এক ছেলে এবং দুই মেয়ে সন্তানের জনক দেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার মো. হানিফ উদ্দিন মিয়া। ছেলে শরীফ হাসান দীর্ঘ ২৩ বছর সিমেন্স বাংলাদেশে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি হাউসিং কোম্পানিতে কাজ করছেন। অন্যদিকে তার মেয়ে ডোরা শিরিন পেশায় একজন ডাক্তার। আর অপর মেয়ে নিতা শাহীন গৃহিণী। নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার হুলহুলিয়া গ্রামের এই কৃতীসন্তান বাংলাদেশ এটোমিক এনার্জি কমিশনের কম্পিউটার সার্ভিস ডিভিশনের ডিরেক্টর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয় কম্পিউটার সায়েন্স ও নিউমেরাল ম্যাথমেটিকস থাকা সত্তে¡ও শিল্প-সাহিত্যসহ আরো নানাবিধ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের প্রতি তার ছিল অপরিসীম আগ্রহ। তিনি বাংলা ও ইংলিশ ছাড়াও উর্দু, আরবি, হিন্দি, জার্মান ও রাশিয়ান ভাষা জানতেন।

এদিকে ২০০১ সালে দেশে ব্যবহৃত প্রথম কম্পিউটারটিকে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। এর এক বছর আগে ২০০০ সালে নিজ গ্রাম হুলহুলিয়া হাইস্কুলে দুটি আইবিএম ডেস্কটপ কম্পিউটার উপহার দেন তিনি। এরপর থেকেই এই গ্রাম থেকে ডাক্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে কম্পিউটার প্রকৌশলীর সংখ্যা। ছোট্ট এই গ্রাম থেকে বেড়ে উঠেছেন শতাধিক প্রকৌশলী। ২০০৭ সালের ১১ মার্চ না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে মৃত্যুর আগে তিনি বিভিন্ন সময়ে গণিতশাস্ত্র ও কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশ গণিত সমিতিরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বাংলাদেশ কম্পিউটার বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সঙ্গে মো. হানিফ উদ্দিন মিয়ার নাম গভীরভাবে সম্পৃক্ত।’

হানিফ উদ্দন মিয়াকে নিয়ে আমার নিজের খুব ছোট স্মৃতিচারণ রয়েছে। ১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রথম আমাকে কম্পিউটারবিষয়ক একটি অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেয়। বাংলাদেশে কম্পিউটার নিয়ে এর আগে আর কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। তবে আমি এর আগেও এমন একটি অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করে আসছিলাম। কিন্তু ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকার আমাকে পছন্দ না করায় এবং ১৯৯৬-পরবর্তী সরকারের সহানুভ‚তি পাওয়ায় বিটিভির একজন প্রখ্যাত প্রযোজককে আমার এই অনুষ্ঠানটি করতে দেয়া হয়। সেই প্রযোজক লুৎফর রহমান তালুকদার এখন আর বিটিভিতে নেই। তবে তার সহকারী বরকত ও আলিমুজ্জামান আমার কম্পিউটারবিষয়ক অনুষ্ঠান করে আসছেন। হানিফ উদ্দিন মিয়ার কথাও বরকত ভোলেননি।

কম্পিউটার অনুষ্ঠানটি বরাবরই শিক্ষামূলক। তবে প্রথম কয়েকটি অনুষ্ঠান আমি একটু ভিন্ন মাত্রার করার কথা ভেবেছিলাম। সেজন্যই আমি ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে আসা প্রথম কম্পিউটার নিয়ে আমার প্রথম টিভি অনুষ্ঠানটি সাজাই। তখনই জানা গেল, কম্পিউটারটি সাভারের পরমাণু শক্তি কমিশনে আছে। আমরা সেখানে যাব ভাবলাম। লুৎফর ভাই বিটিভির আউটডোর ক্যামেরা ইউনিট বরাদ্দ নেন। আমি চাইলাম, সেই কম্পিউটার যিনি প্রথম ব্যবহার করেন তার একটি সাক্ষাৎকার নেব। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির প্রথম সভাপতি এস এম কামালের কাছে খোঁজ পেলাম মো. হানিফ উদ্দিন মিয়ার। পরে জানলাম বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির দ্বিতীয় সভাপতি সাজ্জাদ হোসেনের ভায়রা তিনি। সাজ্জাদ ভাই প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন এবং হানিফ উদ্দিন সেই বিয়ের অনুঘটক ছিলেন।

সেই সাক্ষাৎকারটি ছিল বাংলাদেশের কম্পিউটারের ইতিহাসে এক বড় ধরনের মাইলফলক। কারণ হানিফ উদ্দিন সে দিন বলেছিলেন এ দেশে কম্পিউটার আসার কথা। আমি অবাক হয়েছিলাম এটি জেনে যে, তিনি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের লাহোরে যেতে রাজি না হওয়ায় আমরা কম্পিউটারটি পাই। আমি স্মরণ করতে পারি, ভিডিও ক্যামেরার সামনে সেটি তার প্রথম কথা বলা। অনেকটাই লাজুক টাইপের এই মানুষটির ব্যবহার এতটাই অমায়িক ছিল যে, আমি অভিভ‚ত হয়ে যাই।

এরপর বহুদিন তার খবর রাখিনি। কামাল ভাই কম্পিউটার সমিতির আশপাশে থাকলেও সাজ্জাদ ভাই অনেকটা দূরে সরে যাওয়ায় আমি আর তার খবর নিতে পারিনি। আমি জানতাম, তিনি উত্তরায় থাকেন। আর কোনো সংযোগ আমার ছিল না। কিন্তু ২০১৪ সালে বাংলাদেশে কম্পিউটার আসার ৫০ বছর পূর্তিতে আমি হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি, কেমন করে এই সুবর্ণজয়ন্তীটি আমরা উদযাপন করতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, আমি তখন কোনো প্লাটফর্ম খুঁজে পাইনি, সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি উদযাপন করার জন্য। পরমাণু শক্তি কমিশন সেটি উদযাপন করেনি।

২০১৫ সালের শুরুতে আমি সাভারের পিএটিসিতে সরকারি কর্মকর্তাদের একটি ব্যাচের ক্লাস নিতে গেলে সেখানে আমি হানিফ উদ্দিনের কথা বলি। বস্তুত আমি ১৯৯৭ সালের পর যখনই সুযোগ পেয়েছি তখনই হানিফ উদ্দিন মিয়ার কথা বলেছি। ক্লাস শেষে বেরিয়ে আসার পর এক তরুণ এসে জানাল তার বাড়ি হুলহুলিয়া গ্রামে, যে গ্রামে হানিফ উদ্দিন জন্ম নিয়েছেন এবং যেখানে তার কবরও আছে। আমি তার কাছে হানিফ উদ্দিনের বংশধরদের কারো ঠিকানা চাইলাম। তিনি তার ছেলে শরীফ হাসান সুজার ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা দিলেন। সে দিন মনে হলো হাতে আকাশের চাঁদ পেলাম।

এমনিতেই ২০১৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি থাকাকালে বাংলাদেশে কম্পিউটার আসার ৫০ বছর উদযাপনের জন্য চেষ্টা করি। তার আগে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির ২৫ বছর উদযাপনের জন্যও চেষ্টা করি। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অবস্থা আমার সহায়ক হয়নি। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, আর কিছু না হোক দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মানুষদের কাছে অন্তত হানিফ উদ্দিন মিয়ার নামটা পৌঁছানো দরকার। এক কথায় যদি বলি তবে এর সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সবার দুয়ারে দুয়ারে আমি ঘুরেছি। আমি বেসিস-বিসিএস-পরমাণু শক্তি কমিশন, আইসিটি ডিভিশন সবাইকেই সুবর্ণজয়ন্তীর কথা বলেছি। জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্তও নেয়। কিন্তু কোনোটাই কার্যকর হয়নি। একেবারে শেষ চেষ্টাটি কাজে লেগেছে।

২০১৫ সালে আইসিটি ডিভিশন ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি যখন বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপোর আয়োজন করে তখন কোনো এক কারণে আমি সেমিনার কমিটির চেয়ারম্যান হই। সেই সুবাদে এই ডিভিশনের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলকের সঙ্গে কথা হয়। পলককে হানিফ উদ্দিনের কথা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এতে সম্মতি দেন। এই ডিভিশনের কর্মকর্তারা আমার ঘাড়ে একটি বাড়তি দায়িত্ব দিলেন- তার পরিবারকে খুঁজে বের করার। আমি সেই কাজটিও করলাম। জানা গেল, তার স্ত্রী মারাত্মকভাবে অসুস্থ। সম্মাননা দেয়ার আগের রাতে আমি তার সঙ্গে কথা বললাম। তিনি আসতে রাজি হননি। কিন্তু একরকম জোর করেই আমি তাকে রাজি করালাম এবং সে দিন ১৭ জুন ২০১৫ সম্মাননা দেয়া অনুষ্ঠানে কেবল তিনি আসেননি তার তৃতীয় প্রজন্ম ছেলের ছেলে নাতি ইরফানকেও নিয়ে এলেন। আমি মনে করি, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক ঘটনা। ইরফান সে দিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমি জানতাম না আমার দাদা এত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। সত্যিকার অর্থে আমরাও জানতাম না তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। ১ নভেম্বর এবারো আমরা পার করলাম দেশের কোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব বা প্রতিষ্ঠান দিনটিকে স্মরণও করেনি। এভাবেই হানিফ উদ্দিন মিয়ারা আড়ালে চলে যান। আসুন পরম শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করি।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলামিস্ট।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

বাংলার প্রথম প্রোগ্রামার

আপডেট টাইম : ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ এই সে দিনও কেউ জানত না বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার কে ? কার হাত ধরে ৫৩ বছর আগে আমরা কম্পিউটারের যুগে পা ফেলেছিলাম- সেটি বিস্তৃতপ্রায় অতীত। অতি সম্প্রতি বিষয়টি আমাদের মিডিয়ার নজরে পড়েছে। সেটিও একটি সম্মাননা পাওয়ার পর। এই বিষয়টি দৈনিক সমকাল পত্রিকায় এভাবে বলা হয়েছে- ‘দেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হানিফ উদ্দিন মিয়াকে মরণোত্তর সম্মাননা জানিয়েছে আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি। বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো-২০১৫ শীর্ষক মেলার সমাপনী আয়োজনে হানিফ উদ্দিন মিয়ার স্ত্রী ও সন্তানের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেয়া হয়। …বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো-২০১৫ শীর্ষক মেলার সমাপনী আয়োজনে হানিফ উদ্দিন মিয়ার সন্তান এবং স্ত্রীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত’।

অনেকটা পাদপ্রদীপের আলোয় না থাকা প্রয়াত এই প্রোগ্রামার এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন। পত্রিকাটি আরো লিখেছে- জানা গেছে, মূলত তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বারের প্রচেষ্টাতেই তাকে পুরস্কৃত করেছে আইসিটি বিভাগ ও বিসিএস। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী দেশের এই প্রথম প্রোগ্রামার সম্পর্কে কেন অজ্ঞাত ছিল দেশবাসীর এমন প্রশ্নের উত্তরে মোস্তাফা জব্বার জানান, তিনি আসলে অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। তবে দেশের প্রতি তার টান ছিল অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটারটি আসে ১৯৬৪ সালে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে)। সেটি ছিল আইবিএম মেইন ফ্রেম ১৬২০ কম্পিউটার। বৃহদাকৃতির ওই কম্পিউটারটি স্থাপন করতে দুটি বড় রুম ব্যবহার করতে হয়েছিল। ঢাউস আকারের সেই কম্পিউটারটিকে ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে স্থাপন করা হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ডিজিটাল মেইন ফ্রেম কম্পিউটার।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটার আইবিএম ১৬২০ তার হাত ধরেই। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে (টিএসসি সংলগ্ন) সেটি স্থাপিত হয়। পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা এবং দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, প্রোগ্রাম উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং নানামুখী গবেষণা কাজে এটি ব্যবহার করেন। তবে ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটারটি কেন স্থাপিত হয়েছিল, তা জানা প্রয়োজন। মোস্তাফা জব্বার জানান, পাকিস্তান সরকার তখন কম্পিউটারটি পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরের পরমাণু শক্তি কমিশনে স্থাপনের পরিকল্পনা করে। তবে হানিফ উদ্দিন মিয়া ছাড়া অন্য কেউ এ কম্পিউটার তদারকি এবং পরিচালনার যোগ্য ছিলেন না। এজন্য সরকার হানিফ উদ্দিন মিয়াকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার আহ্বান জানালো। ওই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন হানিফ উদ্দিন। ফলে কম্পিউটারটি ঢাকার আণবিক কমিশনে স্থাপনে অনেকটা বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।

এখনকার সময়ে বিদেশ মানেই স্বর্গ। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য পাকিস্তানই ছিল স্বর্গ। কিন্তু হানিফ উদ্দিন সেই স্বর্গের হাতছানি প্রত্যাখ্যান করেন। এ দেশে ক’জন এমন মানুষ ছিল বা এখনো আছে ? ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে তার জন্মস্থান নাটোরের সিংড়ার হুলহুলিয়া গ্রামে ডিজিটাল হাব স্থাপনের কাজ শুরু হয়। গ্রামটি এখন শতভাগ শিক্ষিত মানুষের গ্রাম। আরো একটি সুখবর হচ্ছে তার সঙ্গে কাজ করেছিলেন এমন আরো একজনের সন্ধান আমরা পেয়েছি, যার নাম মুহম্মদ মুসা।

সমকাল হানিফ উদ্দিন মিয়ার শিক্ষা ও পেশা নিয়ে আরো লিখেছে, ‘কম্পিউটারের সঙ্গে সখ্য হলো কীভাবে হানিফ উদ্দিন মিয়ার- এটি জানতে হলে ফিরে যেতে হবে তার তারুণ্যে। বাংলাদেশের গৌরব, নাটোরের এই কৃতীসন্তান পরমাণু বিজ্ঞানী হানিফ উদ্দিন মিয়া ১৯২৯ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের সিংড়ার হুলহুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলশিক্ষক বাবা রজব আলী তালুকদারের দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ তিনি। সংসারে অভাব না থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য জায়গির থাকতে হয় তাকে। ১৯৪৬ সালে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৮ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএসসিতেও প্রথম বিভাগ লাভ করেন।

এরপর ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এমএসসি পরীক্ষায় ফলিত গণিতে প্রথম শ্রেণিতে স্বর্ণপদকসহ প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৯৬০ সালে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন থিওরি এন্ড অটোমেশন, চেকোস্লোভাক একাডেমি অব সায়েন্স, প্রাগ থেকে অ্যানালগ কম্পিউটার টেকনিক এবং ডিজিটাল কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে সিস্টেম অ্যানালিসিস, নিউমেরাল ম্যাথমেটিকস, অ্যাডভান্স কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, অপারেশন রিসার্চে এমআইটি (যুক্তরাষ্ট্র) কম্পিউটার সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে আইবিএম রিসার্চ সেন্টার লন্ডন থেকে অপারেটিং সিস্টেম ও সিস্টেম প্রোগ্রামিংয়ে ট্রেনিং করেন। তারপর তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় প্রোগ্রামার অ্যানালিস্ট হিসেবে অ্যানালাইসিস, ডিজাইন, সফটওয়্যার ইমপ্লিমেন্টেশন অব কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রাম সংক্রান্ত বিষয়ে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তিনি অঙ্কশাস্ত্র ও কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। পারিবারিক জীবনে স্ত্রী ফরিদা বেগম ও এক ছেলে এবং দুই মেয়ে সন্তানের জনক দেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার মো. হানিফ উদ্দিন মিয়া। ছেলে শরীফ হাসান দীর্ঘ ২৩ বছর সিমেন্স বাংলাদেশে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি হাউসিং কোম্পানিতে কাজ করছেন। অন্যদিকে তার মেয়ে ডোরা শিরিন পেশায় একজন ডাক্তার। আর অপর মেয়ে নিতা শাহীন গৃহিণী। নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার হুলহুলিয়া গ্রামের এই কৃতীসন্তান বাংলাদেশ এটোমিক এনার্জি কমিশনের কম্পিউটার সার্ভিস ডিভিশনের ডিরেক্টর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয় কম্পিউটার সায়েন্স ও নিউমেরাল ম্যাথমেটিকস থাকা সত্তে¡ও শিল্প-সাহিত্যসহ আরো নানাবিধ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের প্রতি তার ছিল অপরিসীম আগ্রহ। তিনি বাংলা ও ইংলিশ ছাড়াও উর্দু, আরবি, হিন্দি, জার্মান ও রাশিয়ান ভাষা জানতেন।

এদিকে ২০০১ সালে দেশে ব্যবহৃত প্রথম কম্পিউটারটিকে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। এর এক বছর আগে ২০০০ সালে নিজ গ্রাম হুলহুলিয়া হাইস্কুলে দুটি আইবিএম ডেস্কটপ কম্পিউটার উপহার দেন তিনি। এরপর থেকেই এই গ্রাম থেকে ডাক্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে কম্পিউটার প্রকৌশলীর সংখ্যা। ছোট্ট এই গ্রাম থেকে বেড়ে উঠেছেন শতাধিক প্রকৌশলী। ২০০৭ সালের ১১ মার্চ না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে মৃত্যুর আগে তিনি বিভিন্ন সময়ে গণিতশাস্ত্র ও কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশ গণিত সমিতিরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বাংলাদেশ কম্পিউটার বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সঙ্গে মো. হানিফ উদ্দিন মিয়ার নাম গভীরভাবে সম্পৃক্ত।’

হানিফ উদ্দন মিয়াকে নিয়ে আমার নিজের খুব ছোট স্মৃতিচারণ রয়েছে। ১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রথম আমাকে কম্পিউটারবিষয়ক একটি অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেয়। বাংলাদেশে কম্পিউটার নিয়ে এর আগে আর কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। তবে আমি এর আগেও এমন একটি অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করে আসছিলাম। কিন্তু ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকার আমাকে পছন্দ না করায় এবং ১৯৯৬-পরবর্তী সরকারের সহানুভ‚তি পাওয়ায় বিটিভির একজন প্রখ্যাত প্রযোজককে আমার এই অনুষ্ঠানটি করতে দেয়া হয়। সেই প্রযোজক লুৎফর রহমান তালুকদার এখন আর বিটিভিতে নেই। তবে তার সহকারী বরকত ও আলিমুজ্জামান আমার কম্পিউটারবিষয়ক অনুষ্ঠান করে আসছেন। হানিফ উদ্দিন মিয়ার কথাও বরকত ভোলেননি।

কম্পিউটার অনুষ্ঠানটি বরাবরই শিক্ষামূলক। তবে প্রথম কয়েকটি অনুষ্ঠান আমি একটু ভিন্ন মাত্রার করার কথা ভেবেছিলাম। সেজন্যই আমি ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে আসা প্রথম কম্পিউটার নিয়ে আমার প্রথম টিভি অনুষ্ঠানটি সাজাই। তখনই জানা গেল, কম্পিউটারটি সাভারের পরমাণু শক্তি কমিশনে আছে। আমরা সেখানে যাব ভাবলাম। লুৎফর ভাই বিটিভির আউটডোর ক্যামেরা ইউনিট বরাদ্দ নেন। আমি চাইলাম, সেই কম্পিউটার যিনি প্রথম ব্যবহার করেন তার একটি সাক্ষাৎকার নেব। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির প্রথম সভাপতি এস এম কামালের কাছে খোঁজ পেলাম মো. হানিফ উদ্দিন মিয়ার। পরে জানলাম বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির দ্বিতীয় সভাপতি সাজ্জাদ হোসেনের ভায়রা তিনি। সাজ্জাদ ভাই প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন এবং হানিফ উদ্দিন সেই বিয়ের অনুঘটক ছিলেন।

সেই সাক্ষাৎকারটি ছিল বাংলাদেশের কম্পিউটারের ইতিহাসে এক বড় ধরনের মাইলফলক। কারণ হানিফ উদ্দিন সে দিন বলেছিলেন এ দেশে কম্পিউটার আসার কথা। আমি অবাক হয়েছিলাম এটি জেনে যে, তিনি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের লাহোরে যেতে রাজি না হওয়ায় আমরা কম্পিউটারটি পাই। আমি স্মরণ করতে পারি, ভিডিও ক্যামেরার সামনে সেটি তার প্রথম কথা বলা। অনেকটাই লাজুক টাইপের এই মানুষটির ব্যবহার এতটাই অমায়িক ছিল যে, আমি অভিভ‚ত হয়ে যাই।

এরপর বহুদিন তার খবর রাখিনি। কামাল ভাই কম্পিউটার সমিতির আশপাশে থাকলেও সাজ্জাদ ভাই অনেকটা দূরে সরে যাওয়ায় আমি আর তার খবর নিতে পারিনি। আমি জানতাম, তিনি উত্তরায় থাকেন। আর কোনো সংযোগ আমার ছিল না। কিন্তু ২০১৪ সালে বাংলাদেশে কম্পিউটার আসার ৫০ বছর পূর্তিতে আমি হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি, কেমন করে এই সুবর্ণজয়ন্তীটি আমরা উদযাপন করতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, আমি তখন কোনো প্লাটফর্ম খুঁজে পাইনি, সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি উদযাপন করার জন্য। পরমাণু শক্তি কমিশন সেটি উদযাপন করেনি।

২০১৫ সালের শুরুতে আমি সাভারের পিএটিসিতে সরকারি কর্মকর্তাদের একটি ব্যাচের ক্লাস নিতে গেলে সেখানে আমি হানিফ উদ্দিনের কথা বলি। বস্তুত আমি ১৯৯৭ সালের পর যখনই সুযোগ পেয়েছি তখনই হানিফ উদ্দিন মিয়ার কথা বলেছি। ক্লাস শেষে বেরিয়ে আসার পর এক তরুণ এসে জানাল তার বাড়ি হুলহুলিয়া গ্রামে, যে গ্রামে হানিফ উদ্দিন জন্ম নিয়েছেন এবং যেখানে তার কবরও আছে। আমি তার কাছে হানিফ উদ্দিনের বংশধরদের কারো ঠিকানা চাইলাম। তিনি তার ছেলে শরীফ হাসান সুজার ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা দিলেন। সে দিন মনে হলো হাতে আকাশের চাঁদ পেলাম।

এমনিতেই ২০১৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি থাকাকালে বাংলাদেশে কম্পিউটার আসার ৫০ বছর উদযাপনের জন্য চেষ্টা করি। তার আগে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির ২৫ বছর উদযাপনের জন্যও চেষ্টা করি। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অবস্থা আমার সহায়ক হয়নি। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, আর কিছু না হোক দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মানুষদের কাছে অন্তত হানিফ উদ্দিন মিয়ার নামটা পৌঁছানো দরকার। এক কথায় যদি বলি তবে এর সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সবার দুয়ারে দুয়ারে আমি ঘুরেছি। আমি বেসিস-বিসিএস-পরমাণু শক্তি কমিশন, আইসিটি ডিভিশন সবাইকেই সুবর্ণজয়ন্তীর কথা বলেছি। জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্তও নেয়। কিন্তু কোনোটাই কার্যকর হয়নি। একেবারে শেষ চেষ্টাটি কাজে লেগেছে।

২০১৫ সালে আইসিটি ডিভিশন ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি যখন বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপোর আয়োজন করে তখন কোনো এক কারণে আমি সেমিনার কমিটির চেয়ারম্যান হই। সেই সুবাদে এই ডিভিশনের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলকের সঙ্গে কথা হয়। পলককে হানিফ উদ্দিনের কথা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এতে সম্মতি দেন। এই ডিভিশনের কর্মকর্তারা আমার ঘাড়ে একটি বাড়তি দায়িত্ব দিলেন- তার পরিবারকে খুঁজে বের করার। আমি সেই কাজটিও করলাম। জানা গেল, তার স্ত্রী মারাত্মকভাবে অসুস্থ। সম্মাননা দেয়ার আগের রাতে আমি তার সঙ্গে কথা বললাম। তিনি আসতে রাজি হননি। কিন্তু একরকম জোর করেই আমি তাকে রাজি করালাম এবং সে দিন ১৭ জুন ২০১৫ সম্মাননা দেয়া অনুষ্ঠানে কেবল তিনি আসেননি তার তৃতীয় প্রজন্ম ছেলের ছেলে নাতি ইরফানকেও নিয়ে এলেন। আমি মনে করি, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক ঘটনা। ইরফান সে দিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমি জানতাম না আমার দাদা এত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। সত্যিকার অর্থে আমরাও জানতাম না তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। ১ নভেম্বর এবারো আমরা পার করলাম দেশের কোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব বা প্রতিষ্ঠান দিনটিকে স্মরণও করেনি। এভাবেই হানিফ উদ্দিন মিয়ারা আড়ালে চলে যান। আসুন পরম শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করি।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলামিস্ট।