ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

হাওরের জলাবদ্ধতায় বিপর্যয় আসন্ন

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ কন্যা সুন্দর আলোয় এখন বিয়ের কনে দেখা হয় না হাওরে। বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে অনেক আগেই। বিজলী বাতির ছোঁয়ায় দিবা রাত্রির ফারাক এখন বোঝা কঠিন হবার কথা ছিলো। তবে হাওরে এই কথা এখনো অবান্তর! এখানে কখনোই বিদ্যুৎ যায় না বলে অনেকেই মজা করেন। কারণ বিদ্যুৎ মশাই মাঝে মাঝে উঁকি দিতে আসেন হাওরবাসীকে জানান দিতে যে, এখানেও বিদ্যুৎ আছে। তবে কনের বাপের বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, এটা হতে পারে না! মান সম্মানের ব্যাপার।

কিছু প্রশ্ন করি আপনাকে:

১. বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও পিছিয়ে পরা জনপদের নাম কি?

২. কোথায় ডাক্তার সাহেব নিজের পোস্টিং দেখতে চান না?

৩. শিক্ষায় পশ্চাৎপদ অঞ্চলের নাম বলুন?

৪. যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক কোন অঞ্চলে?

৫. অপুষ্টির শিকার হয়ে খর্বাকৃতির সন্তান জন্ম নিচ্ছে কোথায়?

সকল প্রশ্নের একমাত্র ও সরল উত্তর হাওর। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই সাতটি জেলার প্রায় ৩৪টি উপজেলায় বিস্তৃত ৪১১টি ছোট বড় হাওর নিয়ে আমাদের ভাটি এলাকা। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের প্রায় ৮০০০ বর্গমাইল, অর্থাৎ প্রায় ৭ ভাগের এক ভাগ। ষোল কোটির এক অষ্টমাংশ অর্থাৎ দুই কোটি মানুষের আবাস এই হাওর এলাকায়।

হাওর একটি বিচিত্র এলাকা। দেশের অন্য যে কোনো এলাকা থেকে এটা সম্পূর্ণরূপে আলাদা। এখানকার ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, যানবাহন সব কিছুই ব্যতিক্রম। প্রায় চার মাস এই বিপুল অঞ্চল পানিতে নিমগ্ন থাকে।

হাওর এলাকা জীববৈচিত্রে ভরপুর। এখানে বেশ কিছু ব্যতিক্রমধর্মী উদ্ভিদ দেখা যায়, যেমন: হিজল, তমাল, করচ, ভুই ডুমুর, জল ডুমুর, বরুণ, হোগলা, নল খাগড়া, বনতুলসী, বলুয়া ইত্যাদি। এছাড়া হাওরে প্রচুর শাপলা, শালুক, ঢ্যাপ ইত্যাদি জলজ গুল্ম আছে প্রচুর পরিমাণে।

হাওর দেশীয় প্রজাতির নানা জাতের মৎস্য প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এখানে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ ও ২৪ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া শিং, মাগুর, পুঁটি, বোয়াল, বাইম, টাকি, প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। দেশের মোট মৎস্য সম্পদের প্রায় ২৫ ভাগ মৎস্যের যোগান দেয় হাওর। এছাড়া দেশের মোট গবাদি পশুর ২২ শতাংশ আসে এখান থেকে।

আমাদের হাওর এখন পাল্টে গিয়েছে অনেকটাই। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি এখন শিল্প কারখানার মজুর তথা শ্রম নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। হাওরের তরুণেরা এখন চোখ রাখছেন প্রবাসে কিংবা নগরে। রেমিটেন্সের কাঁচা অর্থে ফুলে ফেপে উঠছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ। কিন্তু হাওর যে হারিয়ে ফেলছে তার স্বকীয়তা, তার কি দেখার কেউ নেই?

মূলত কৃষি ও মৎস্য আহরণ এই হাওরের দুটি প্রধান পেশা। গেল বছরের আগাম পানি চলে আশায় গোটা হাওর অঞ্চলে ধান উৎপাদন ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। কৃষকের কান্নার নোনা জলে স্ফিত হয়েছে হাওরের জলরাশি। সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় মৎস্য সম্পদের ব্যাপক মড়ক ছিলো অপ্রত্যাশিত এবং অবর্ণনীয়। এ বছর যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন সমস্যা। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও ভাটির পানি নেমে যায়নি বিভিন্ন জায়গা থেকে ফলে কৃষক তার বীজতলা তৈরি করতে পারেনি। তাই এবারো হয়তো কৃষক বঞ্চিত হবেন…

প্রকৃতির সাথে হাওরের নিবিড় বোঝাপড়ার মধ্যে একটা বড়সড় ঝামেলা বেঁধে গেছে সম্প্রতি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এর জন্য দায়ী বলে আমার মনে হয়। পানি পথ শুকিয়ে গেলে হাওরের বুক চিরে তৈরি হয়েছে সড়ক। এই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে করেছে উন্নত। অনেক পরিবেশবিদ মনে করছেন পলি জমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই আভুরা সড়ক। প্রকৃতি কোনো প্রকার ইন্টারভেনশন পছন্দ করে না, হাওরে এই বক্তব্য প্রমাণিত হলো আবারো। এর ফলশ্রুতিতে এখন হাওর ও নদীতে পানির উচ্চতা সম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে ফলে হাওরে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা।

সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে ভৈরব বাজারের কাছে কালনি নদীর মোহনায় ড্রেজিং করা হচ্ছে এই ধারনা থেকে, হয়তো এতে হাওরে আটকে থাকা পানি নেমে যাবে। তবে কোন ধারনার ভিত্তিতে এই উদ্যোগের সূত্রপাত, তা জানা যায় নি। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখন সময়ের দাবি। কোনো প্রকারের হাতুড়ে চিকিৎসা হবে হাওরকে মৃত্যুর কোলে সোপর্দ করার শামিল।

Sluice gate/Regulator নির্মাণ করা হয় মূলত পানির চলার পথকে একটি কাঠামোতে পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ৮০ শতাংশ বর্তমানে অকার্যকর বলে উল্লেখ করেছেন ডক্টর আইনুল নিশাত। দেশের স্বনামধন্য এই পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন এই তথ্য। তদারককারী সংস্থার দিকে এই অব্যবস্থাপনার দায় তিনি চাপিয়েছেন।

তবে আমি হাওরের গণমানুষের সাথে কথা বলে জেনেছি, তারাও ভাবছেন পলি জমেছে হাওরের বুকে। নদী ও হাওরের সঙ্গমস্থলে পলি জমে মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত নদীতে ড্রেজিং করা হলেও হাওরে এমন উদ্যোগ কখনোই দেখা যায়নি। নদ নদী শুকিয়ে গেছে কোথায়। প্রসস্থ নদী হয়েছে সরু। সেই সাথে হাওর অঞ্চলে অসংখ খাল বিল এখন বিপুপ্ত প্রায়। তাই হাওরের পানি নদী ও খালে সংকুলান না হওয়ায় আগেই চলে আসছে ফলে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন প্রত্যাশিত উৎপাদন থেকে। আর পানি নেমে যাবার রাস্তা সঙ্কুচিত হওয়ায় এখন নামতেও পারছে না নির্ধারিত সময়ে ফলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।

হাওর অঞ্চলে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তা এবার হয়নি। তার উপর উত্তরবঙ্গে বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে বাজারে। মোটা চাল গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি এখন বাংলাদেশে। খাদ্যে উদ্বৃত্ত বাংলাদেশ বাধ্য হয়েছে অনেক বছর পর চাল আমদানি করতে। এখনো হাওর অঞ্চলে সরকার খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু রেখেছে সীমিত পরিসরে হলেও। এর চাপ পড়ছে গোটা অর্থনীতি ও খাদ্য মজুদে।

আমরা হাওরবাসী কখনো ত্রাণ নেবো হাত পেতে স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু তাই হয়েছে এবার। আমাদের হাওরের জীবন ও ঋদ্ধ সংস্কৃতি এখন বিপন্ন। হাওরের সহজ সরল গণমানুষের স্রোত এখন তপ্ত নগরীর রাজপথে। কৃষাণির কোমল হাত রক্তাক্ত হচ্ছে শিল্পের সূচে…

হাওর অঞ্চল একটি বিশেষায়িত অঞ্চল। আমাদের জন্য ভাবতে হবে বিকল্প পদ্ধতিতে। মাটি ও পানির মানুষ আমরা, আমাদের মতোই থাকতে চাই। আমাদের নিয়ে অনতিবিলম্বে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হউক। হাওরের অমিত সম্ভাবনা এভাবে ধ্বংস করে দেবেন না।

সূত্রঃ ঢাকাটাইমস

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

হাওরের জলাবদ্ধতায় বিপর্যয় আসন্ন

আপডেট টাইম : ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ কন্যা সুন্দর আলোয় এখন বিয়ের কনে দেখা হয় না হাওরে। বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে অনেক আগেই। বিজলী বাতির ছোঁয়ায় দিবা রাত্রির ফারাক এখন বোঝা কঠিন হবার কথা ছিলো। তবে হাওরে এই কথা এখনো অবান্তর! এখানে কখনোই বিদ্যুৎ যায় না বলে অনেকেই মজা করেন। কারণ বিদ্যুৎ মশাই মাঝে মাঝে উঁকি দিতে আসেন হাওরবাসীকে জানান দিতে যে, এখানেও বিদ্যুৎ আছে। তবে কনের বাপের বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, এটা হতে পারে না! মান সম্মানের ব্যাপার।

কিছু প্রশ্ন করি আপনাকে:

১. বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও পিছিয়ে পরা জনপদের নাম কি?

২. কোথায় ডাক্তার সাহেব নিজের পোস্টিং দেখতে চান না?

৩. শিক্ষায় পশ্চাৎপদ অঞ্চলের নাম বলুন?

৪. যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক কোন অঞ্চলে?

৫. অপুষ্টির শিকার হয়ে খর্বাকৃতির সন্তান জন্ম নিচ্ছে কোথায়?

সকল প্রশ্নের একমাত্র ও সরল উত্তর হাওর। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই সাতটি জেলার প্রায় ৩৪টি উপজেলায় বিস্তৃত ৪১১টি ছোট বড় হাওর নিয়ে আমাদের ভাটি এলাকা। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের প্রায় ৮০০০ বর্গমাইল, অর্থাৎ প্রায় ৭ ভাগের এক ভাগ। ষোল কোটির এক অষ্টমাংশ অর্থাৎ দুই কোটি মানুষের আবাস এই হাওর এলাকায়।

হাওর একটি বিচিত্র এলাকা। দেশের অন্য যে কোনো এলাকা থেকে এটা সম্পূর্ণরূপে আলাদা। এখানকার ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, যানবাহন সব কিছুই ব্যতিক্রম। প্রায় চার মাস এই বিপুল অঞ্চল পানিতে নিমগ্ন থাকে।

হাওর এলাকা জীববৈচিত্রে ভরপুর। এখানে বেশ কিছু ব্যতিক্রমধর্মী উদ্ভিদ দেখা যায়, যেমন: হিজল, তমাল, করচ, ভুই ডুমুর, জল ডুমুর, বরুণ, হোগলা, নল খাগড়া, বনতুলসী, বলুয়া ইত্যাদি। এছাড়া হাওরে প্রচুর শাপলা, শালুক, ঢ্যাপ ইত্যাদি জলজ গুল্ম আছে প্রচুর পরিমাণে।

হাওর দেশীয় প্রজাতির নানা জাতের মৎস্য প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এখানে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ ও ২৪ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া শিং, মাগুর, পুঁটি, বোয়াল, বাইম, টাকি, প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। দেশের মোট মৎস্য সম্পদের প্রায় ২৫ ভাগ মৎস্যের যোগান দেয় হাওর। এছাড়া দেশের মোট গবাদি পশুর ২২ শতাংশ আসে এখান থেকে।

আমাদের হাওর এখন পাল্টে গিয়েছে অনেকটাই। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি এখন শিল্প কারখানার মজুর তথা শ্রম নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। হাওরের তরুণেরা এখন চোখ রাখছেন প্রবাসে কিংবা নগরে। রেমিটেন্সের কাঁচা অর্থে ফুলে ফেপে উঠছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ। কিন্তু হাওর যে হারিয়ে ফেলছে তার স্বকীয়তা, তার কি দেখার কেউ নেই?

মূলত কৃষি ও মৎস্য আহরণ এই হাওরের দুটি প্রধান পেশা। গেল বছরের আগাম পানি চলে আশায় গোটা হাওর অঞ্চলে ধান উৎপাদন ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। কৃষকের কান্নার নোনা জলে স্ফিত হয়েছে হাওরের জলরাশি। সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় মৎস্য সম্পদের ব্যাপক মড়ক ছিলো অপ্রত্যাশিত এবং অবর্ণনীয়। এ বছর যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন সমস্যা। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও ভাটির পানি নেমে যায়নি বিভিন্ন জায়গা থেকে ফলে কৃষক তার বীজতলা তৈরি করতে পারেনি। তাই এবারো হয়তো কৃষক বঞ্চিত হবেন…

প্রকৃতির সাথে হাওরের নিবিড় বোঝাপড়ার মধ্যে একটা বড়সড় ঝামেলা বেঁধে গেছে সম্প্রতি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এর জন্য দায়ী বলে আমার মনে হয়। পানি পথ শুকিয়ে গেলে হাওরের বুক চিরে তৈরি হয়েছে সড়ক। এই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে করেছে উন্নত। অনেক পরিবেশবিদ মনে করছেন পলি জমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই আভুরা সড়ক। প্রকৃতি কোনো প্রকার ইন্টারভেনশন পছন্দ করে না, হাওরে এই বক্তব্য প্রমাণিত হলো আবারো। এর ফলশ্রুতিতে এখন হাওর ও নদীতে পানির উচ্চতা সম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে ফলে হাওরে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা।

সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে ভৈরব বাজারের কাছে কালনি নদীর মোহনায় ড্রেজিং করা হচ্ছে এই ধারনা থেকে, হয়তো এতে হাওরে আটকে থাকা পানি নেমে যাবে। তবে কোন ধারনার ভিত্তিতে এই উদ্যোগের সূত্রপাত, তা জানা যায় নি। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখন সময়ের দাবি। কোনো প্রকারের হাতুড়ে চিকিৎসা হবে হাওরকে মৃত্যুর কোলে সোপর্দ করার শামিল।

Sluice gate/Regulator নির্মাণ করা হয় মূলত পানির চলার পথকে একটি কাঠামোতে পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ৮০ শতাংশ বর্তমানে অকার্যকর বলে উল্লেখ করেছেন ডক্টর আইনুল নিশাত। দেশের স্বনামধন্য এই পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন এই তথ্য। তদারককারী সংস্থার দিকে এই অব্যবস্থাপনার দায় তিনি চাপিয়েছেন।

তবে আমি হাওরের গণমানুষের সাথে কথা বলে জেনেছি, তারাও ভাবছেন পলি জমেছে হাওরের বুকে। নদী ও হাওরের সঙ্গমস্থলে পলি জমে মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত নদীতে ড্রেজিং করা হলেও হাওরে এমন উদ্যোগ কখনোই দেখা যায়নি। নদ নদী শুকিয়ে গেছে কোথায়। প্রসস্থ নদী হয়েছে সরু। সেই সাথে হাওর অঞ্চলে অসংখ খাল বিল এখন বিপুপ্ত প্রায়। তাই হাওরের পানি নদী ও খালে সংকুলান না হওয়ায় আগেই চলে আসছে ফলে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন প্রত্যাশিত উৎপাদন থেকে। আর পানি নেমে যাবার রাস্তা সঙ্কুচিত হওয়ায় এখন নামতেও পারছে না নির্ধারিত সময়ে ফলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।

হাওর অঞ্চলে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তা এবার হয়নি। তার উপর উত্তরবঙ্গে বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে বাজারে। মোটা চাল গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি এখন বাংলাদেশে। খাদ্যে উদ্বৃত্ত বাংলাদেশ বাধ্য হয়েছে অনেক বছর পর চাল আমদানি করতে। এখনো হাওর অঞ্চলে সরকার খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু রেখেছে সীমিত পরিসরে হলেও। এর চাপ পড়ছে গোটা অর্থনীতি ও খাদ্য মজুদে।

আমরা হাওরবাসী কখনো ত্রাণ নেবো হাত পেতে স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু তাই হয়েছে এবার। আমাদের হাওরের জীবন ও ঋদ্ধ সংস্কৃতি এখন বিপন্ন। হাওরের সহজ সরল গণমানুষের স্রোত এখন তপ্ত নগরীর রাজপথে। কৃষাণির কোমল হাত রক্তাক্ত হচ্ছে শিল্পের সূচে…

হাওর অঞ্চল একটি বিশেষায়িত অঞ্চল। আমাদের জন্য ভাবতে হবে বিকল্প পদ্ধতিতে। মাটি ও পানির মানুষ আমরা, আমাদের মতোই থাকতে চাই। আমাদের নিয়ে অনতিবিলম্বে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হউক। হাওরের অমিত সম্ভাবনা এভাবে ধ্বংস করে দেবেন না।

সূত্রঃ ঢাকাটাইমস