সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের হরিশখালী গ্রামের গৃহিণী ফরিদা বেগম। সংসারের কাজ সামলে এখন তিনি একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। সুন্দরবনের কেওড়া ফল সংগ্রহ করে তা দিয়ে সুস্বাদু আচার তৈরি করেন। পরে সেই আচার বিক্রি করেন সুন্দরবনে বেড়াতে আসা পর্যটক, স্থানীয় ক্রেতা এবং অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছে।
একসময় কেওড়া ফল ছিল উপকূলের মানুষের ঘরোয়া খাবার। টক ডাল, খাটা, চাটনি বা আচার তৈরিতে ব্যবহার হতো বাড়ির রান্নাঘরে। কিন্তু ফরিদা বেগমের মতো নারীদের হাতে সেই কেওড়া এখন হয়ে উঠছে আয়ের উৎস। মৌসুমে কেওড়া সংগ্রহ, পরিষ্কার, সিদ্ধ, মসলা মিশিয়ে আচার তৈরি, বোতলজাত করা, বাজারে নেওয়া, সব কাজেই যুক্ত হচ্ছেন উপকূলীয় এলাকার অনেক নারী।
কেওড়ার আচার নিয়ে কথা হয় ফরিদা বেগমের সঙ্গে, জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘কেওড়া ফল দিয়ে তৈরি আচার সুন্দরবনে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তারা স্থানীয় স্বাদের কিছু নিতে চান। তাদের কাছে কেওড়ার আচার নতুন ও আকর্ষণীয়। আমার একটি ফেসবুক পেজও আছে। অনেকে অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার করেন। তবে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষ কেওড়া ফল সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। তাই বড় বাজার এখনো তৈরি হয়নি।’
ফরিদা বেগম একা নন। পাশের বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের শেফালি বেগমও এলাকার বনজীবী পরিবারের নারীদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন। সেখানে অনেকে একত্রে কেওড়ার আচার তৈরি করে সমবায় সমিতির মাধ্যমে বাজারজাত করছেন। তাদের মতই সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বহু নারী এখন কেওড়া ফল ঘিরে ছোট ছোট উদ্যোগ নিচ্ছেন। কেউ আচার বানাচ্ছেন, কেউ চাটনি, কেউ জেলি, কেউ শুকনা মসলাদার কেওড়ার রেসিপি তৈরি করছেন। এসব পণ্য স্থানীয় হাটবাজার, পর্যটনকেন্দ্র, মেলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে। এতে পরিবারে বাড়তি আয় আসছে, নারীদের কাজের স্বীকৃতি বাড়ছে এবং সুন্দরবননির্ভর জীবিকায় নতুন পথ তৈরি হচ্ছে।
কেওড়া কোথায় পাওয়া যায়?
কেওড়া সুন্দরবনের অন্যতম পরিচিত ম্যানগ্রোভ গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম সনেরাটিয়া অ্যাপেটালা। সুন্দরবনের নদী-খাল, চর, জোয়ার-ভাটার এলাকা এবং লবণাক্ত কর্দমাক্ত মাটিতে কেওড়া গাছ ভালো জন্মে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে এ গাছ বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও মিয়ানমারের উপকূলীয় বনাঞ্চলেও কেওড়া জন্মায়।
নদীর নতুন জেগে ওঠা চরভূমি, খালের পাড় এবং লবণাক্ত অনাবাদি জমিতে কেওড়া প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। আবার উপকূলীয় চর বনায়নেও কেওড়া এখন জনপ্রিয় প্রজাতি। কারণ এটি দ্রুত বাড়ে, লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকে এবং অল্প বয়সেই ফল দিতে শুরু করে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সুন্দরবনসংলগ্ন অনেক এলাকায় অন্যান্য ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সঙ্গে কেওড়া চারা লাগানো হচ্ছে।
কেওড়া গাছের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর শ্বাসমূল। জোয়ার-ভাটার পানিতে ডুবে থাকা কর্দমাক্ত মাটিতে গাছের মূল পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। শ্বাসমূলের মাধ্যমে গাছ বাতাস থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ করে। এ কারণে মিষ্টি পানির এলাকার তুলনায় লবণাক্ত ও আধা-লবণাক্ত উপকূলীয় পরিবেশে কেওড়া ভালোভাবে বেড়ে ওঠে।
উপকূল রক্ষায় কেওড়ার ভূমিকা
কেওড়া শুধু ফলদ গাছ নয়, উপকূলের প্রাকৃতিক ঢালও বটে। নদীর পাড়ে, চরভূমিতে বা উপকূলীয় এলাকায় কেওড়া গাছ মাটি ধরে রাখতে সহায়তা করে। এতে ভাঙন কমে, চরভূমি স্থিতিশীল হয় এবং বনায়নের পরিবেশ তৈরি হয়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন মানুষের বসতি ও কৃষিজমির জন্য প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ছে। অনেক জমিতে ধান বা প্রচলিত ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় কেওড়া গাছকে লবণাক্ততায় অভিযোজিত একটি সম্ভাবনাময় প্রজাতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি অনাবাদি বা কম ব্যবহৃত লবণাক্ত জমিকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কেওড়া ফল সংগ্রহ কীভাবে হয়
কেওড়া ফল সাধারণত বর্ষা মৌসুমে বেশি পাওয়া যায়। ফাগুনের শেষ দিকে গাছে ফুল আসে। চৈত্র-বৈশাখে ফল ধরতে শুরু করে। আষাঢ়-শ্রাবণ থেকে ভাদ্র-আশ্বিন পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় কেওড়া ফল সংগ্রহ করা হয়। গাছে ফল পাকলে স্থানীয় মানুষ তা সংগ্রহ করেন। কেউ সরাসরি গাছ থেকে পাড়েন, কেউ আবার গাছের নিচে পড়ে থাকা পরিণত ফল কুড়িয়ে নেন।
সুন্দরবনের ভেতর থেকে বনজীবীরা ফল সংগ্রহ করে আনেন। সে ক্ষেত্রে বনবিভাগকে রাজস্ব প্রদান করতে হয়। কেওড়া ফল বন্যপ্রাণীর খাদ্যও। সুন্দরবনের হরিণ, বানরসহ অনেক প্রাণী কেওড়া ফল ও পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় অনেক সময় নদীর চর, খালের পাড়, সামাজিক বনায়ন এলাকা বা বসতির আশপাশের কেওড়া গাছ থেকেও ফল সংগ্রহ করা হয়। এগুলো স্থানীয় পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি আয়ের উৎস। মৌসুমে কেওড়া ফল বাজারে কেজি দরে বিক্রি হয়। অনেক এলাকায় প্রতি কেজি ১০ থেকে ২০ টাকায় ফল বিক্রি হয়। তবে প্রক্রিয়াজাত করলে একই ফলের মূল্য কয়েক গুণ বাড়ে। প্রতি কেজি কেওড়ার আচার বিক্রি হয় ৮শ থেকে ১হাজার টাকায়।
খাদ্য হিসেবে কেওড়া
কেওড়া ফলের সবচেয়ে বড় পরিচয় এর টক স্বাদ। ফলটি দেখতে অনেকটা ডুমুর বা আমলকীর মতো। সবুজ রঙের ফলের বাইরের মাংসল অংশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভেতরে থাকে বীজ। কাঁচা অবস্থায় লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া যায়। তবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বহু পরিবার কেওড়া ফল দিয়ে মসুর ডাল রান্না করেন। স্থানীয়ভাবে এটিকে অনেকে টক ডাল বা খাটা বলেন। ছোট চিংড়ি মাছের সঙ্গে কেওড়া ফল দিয়ে রান্না করা পদ উপকূলীয় অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয়।
কেওড়া ফল দিয়ে তৈরি আচারও খুব জনপ্রিয়। টক, ঝাল ও মিষ্টি-তিন স্বাদের আচারই তৈরি হয়। লবঙ্গ, দারুচিনি, এলাচ, শুকনা মরিচ, জিরা, সরিষার তেল, চিনি, লবণ ব্যবহার করে স্থানীয় নারীরা নানা স্বাদের আচার তৈরি করেন। ঠিকমতো তৈরি ও সংরক্ষণ করলে কেওড়ার আচার দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
পুষ্টিগুণ ও ঔষধি ধারণা
স্থানীয় মানুষের কাছে কেওড়া ফল শুধু খাবার নয়, উপকারী ফল হিসেবেও পরিচিত। বদহজম, ক্ষুধামন্দা, বমিভাব, আমাশয় বা পেটের সমস্যায় কেওড়া ফল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। অনেক বনজীবী একে মহৌষধি বলেও মনে করেন। বিভিন্ন গবেষণায় কেওড়া ফলে শর্করা, আমিষ, সামান্য ফ্যাট, ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও কিছু উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিডের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এসব উপাদান মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হজমশক্তি ও পুষ্টিতে সহায়ক হতে পারে। তবে চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের আগে বৈজ্ঞানিকভাবে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
বাজারে কেওড়ার চাহিদা
উপকূলীয় এলাকায় কেওড়া ফলের স্থানীয় চাহিদা বহু পুরোনো। মৌসুমে হাটবাজারে কাঁচা ফল বিক্রি হয়। গ্রামের মানুষ রান্না ও আচার তৈরির জন্য কিনে থাকেন। তবে এখন কেওড়া ফলের চাহিদা ধীরে ধীরে পর্যটন ও অনলাইন বাজারেও তৈরি হচ্ছে।
সুন্দরবনে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনেকেই স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহী। তারা মধু, গোলপাতার পণ্য, সুন্দরবনের স্মারক সামগ্রীর পাশাপাশি কেওড়ার আচারও কিনছেন। সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন যত বাড়ছে, স্থানীয় খাদ্যপণ্যের বাজারও তত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অনলাইনে কেওড়ার আচার বিক্রির উদ্যোগও বাড়ছে। ফেসবুক পেজ, স্থানীয় উদ্যোক্তা গ্রুপ ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কিছু উদ্যোক্তা পণ্য বিক্রি করছেন। তবে বড় সমস্যা হলো, দেশের অনেক অঞ্চলের মানুষ এখনো কেওড়া ফল চেনেন না। ফলে পণ্যের বাজার মূলত উপকূলীয় মানুষ, সুন্দরবনভ্রমণকারী পর্যটক এবং স্থানীয় স্বাদের প্রতি আগ্রহী সীমিত ক্রেতাগোষ্ঠীর মধ্যে আটকে আছে।

বড় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সুযোগ
কেওড়া ফল এখনো মূলত স্থানীয় ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের পর্যায়ে আছে। কিন্তু বড় উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগ করলে তা লাভজনক হতে পারে। কারণ কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং পণ্যের স্বাদ আলাদা। বাজারে নতুনত্ব আছে।
বড় উদ্যোক্তারা কয়েকভাবে কেওড়া খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। প্রথমত, কেওড়া আচার, চাটনি, সস, জেলি, ড্রাই স্ন্যাকস বা রেডি-টু-কুক টক মিক্স তৈরি করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসম্মত প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে সুপারশপ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও পর্যটনকেন্দ্রে বিক্রি করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় নারী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জাতীয় বাজারে নেওয়া যেতে পারে। চতুর্থত, রপ্তানিযোগ্য স্থানীয় খাদ্যপণ্য হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজার লক্ষ্য করা যেতে পারে।
অর্থনীতিতে সম্ভাবনার হিসাব
স্থানীয় নারী উদ্যোক্তারা যদি প্রশিক্ষণ ও বাজার সহায়তা পান, তাহলে মৌসুমভিত্তিক আয়ের পাশাপাশি বছরজুড়ে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। সংরক্ষণযোগ্য পণ্য হওয়ায় এটি শুধু মৌসুমে নয়, সারাবছর বাজারে রাখা সম্ভব। অনলাইন বিক্রি, মেলা, পর্যটনকেন্দ্র, সুপারশপ ও আঞ্চলিক পণ্যের দোকানের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কেওড়া পণ্য একটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে পরিণত হতে পারে।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
সম্ভাবনা থাকলেও কেওড়া পণ্যের সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ আছে। দেশের বড় অংশের মানুষ কেওড়া ফল চেনেন না। তাই প্রচার দরকার। মানসম্মত প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ পদ্ধতি এখনো দুর্বল। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুঁজি কম। বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা সীমিত। বন থেকে ফল সংগ্রহের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। আরও একটি সমস্যা হলো মৌসুমি প্রাপ্যতা। ফল নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যায়। তাই সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভালো না হলে বড় বাজারে নিয়মিত সরবরাহ দেওয়া কঠিন। এ কারণে কোল্ড স্টোরেজ, শুকানো, পাল্প সংরক্ষণ, বোতলজাত আচার ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ প্রযুক্তি দরকার।
জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে কেওড়ার গুরুত্ব
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, মিঠা পানির সংকট এবং কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবিকায় পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কেওড়া একসঙ্গে তিনটি কাজে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কেওড়াকে শুধু বনের একটি গাছ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জলবায়ু সহনশীল উপকূলীয় অর্থনীতির অংশ হতে পারে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























