ঢাকা , বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.) তাফসির শাস্ত্রের কিংবদন্তি যিনি আগস্টের ৫ তারিখ যেভাবে ‘৩৬ জুলাই’ হলো মাটি ও মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সংস্কারের মাধ্যমে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি)। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে বাহিনীর পক্ষ থেকে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে এই প্রত্যয় জানানো হয়। বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর খিলগাঁওয়ে আনসার ও ভিডিপি সদর দপ্তরে দিবসটি উপলক্ষে আলোচনাসভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়।  অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। দপ্তরের পাশাপাশি সারা দেশে বাহিনীর রেঞ্জ, জেলা, ব্যাটালিয়ন ও উপজেলা কার্যালয়েও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে মহাপরিচালক বলেন, ‘বিভিন্ন স্তরের অনৈতিক চর্চা, অপেশাদারি ও জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে। সততা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের সেবাই প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রধান কর্তব্য।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আনসার ও ভিডিপির প্রশাসনিক, প্রশিক্ষণ ও অপারেশনাল কার্যক্রমে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। সাম্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন কার্যক্রম ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনা হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। সকল নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাহিনীটি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে সুসংহত অবস্থান তৈরি করছে বলেও তিনি জানান। দিবসটি উপলক্ষে দেশের প্রতিটি কার্যালয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়। এ ছাড়া শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, আনসার ও ভিডিপি হাসপাতালে রোগীদের উন্নতমানের খাবার পরিবেশন এবং শহীদদের রুহের মাগফিরাত ও দেশ-জাতির সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও নতুন বাংলাদেশের রূপান্তরের অভিযাত্রা তুলে ধরে নির্মিত আটটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এসব প্রামাণ্যচিত্রের শিক্ষা ও মূল্যবোধ আত্মস্থ করে দায়িত্ব পালনের জন্য বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান মহাপরিচালক। অনুষ্ঠানে বাহিনীর উপমহাপরিচালক, পরিচালকসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ আর কখনো নির্ভরশীল রাষ্ট্র হবে না : পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বপ্নযাত্রায় ধীরগতি তারা বলে ডিসেম্বরে দেশে আসবে, আসেন দেখা হবে রাজপথে: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আপনার দলের লোকেরাই আপনাকে পদচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করছে: প্রধানমন্ত্রীকে কর্নেল অলি সরকার জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই জাদুঘর নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণার কেন্দ্র : ড. ইউনূস

স্বপ্নযাত্রায় ধীরগতি

দীর্ঘ দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, দুই বছর পেরিয়ে এসেও সেই স্বপ্নযাত্রার গতি অনেকটাই ধীর। গুম, ক্রসফায়ার ও মতপ্রকাশের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন কমে আসার মতো কিছু গুরুতপূর্ণ পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি, থমকে থাকা রাষ্ট্রসংস্কার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি। আইনের শাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বড় একটি অংশ এখনো অপূর্ণ। ফলে মুক্তির উচ্ছ্বাস ধরে রাখার পাশাপাশি স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা এখনও দীর্ঘ পথের অপেক্ষায়।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের সেই আন্দোলন শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না। বরং রাষ্ট্রে আইনের শাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার বিপ্লব ছিল। তবে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির ফারাক আকাশসম। জুলাই আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন এখনও আসেনি।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শায়লা আক্তার শশী মনে করেন, যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো এখনও নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। এটার জন্য আবু সাঈদ, মুগ্ধরা জীবন দেননি। যে সিস্টেম বদলানোর জন্য এত আত্মত্যাগ, আজও সেই একই সিস্টেমের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি।

তবে বিশ্লেষক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ধরনে। গুম, কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মতপ্রকাশের ক্ষেত্রও আগের তুলনায় কিছুটা উন্মুক্ত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে মব সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। কার্যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে ছিল না। সেই অবস্থা থেকে কিছুটা উত্তোরণ হলেও মানুষের মধ্যে স্বস্তি মেলেনি। এখনও প্রকাশ্য দিবালোকে, কখনও শত শত মানুষের সামনে গুলি করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের তাজা প্রাণ। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল, মে ও জুনÑ তিন মাসে সারাদেশে ৯২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসে মোট ৩২৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই এক মাসে ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। এ ছাড়া, মে মাসে মোট হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৩১০টি। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটনে ১৬টি হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আর এপ্রিল মাসে হত্যার ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ২৮৮টি। এর মধ্যে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ১৭টি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে হতাশার বিষয় হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের মামলার বিচার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র ১৫ শতাংশ মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। আদালতে চার্জশিট দাখিল করা কোনো মামলার বিচার শুরু হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত দুই আগস্ট পর্যন্ত দুই বছরে সারাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় ১ হাজার ৮৬৬টি মামলা থানায় রুজু হয়। এর মধ্যে তদন্ত নিষ্পত্তি মামলার সংখ্যা ২৬৮টি। গত দুই বছরে রুজু হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত নিষ্পত্তির হার ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ গত দুই বছরে ৮৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মাহমুদুল হাসান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল দেশের এক নিকৃষ্ট স্বৈরাচারের দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন থেকে মুক্তির জন্য। জুলাইয়ের সময় শুধু মাথায় ছিল এই অন্যায় শাসনের অবসান হোক। নির্যাতন, গুম, খুন বন্ধ হোক। আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। জুলাইয়ের পর এক বিশাল সুযোগ ছিল দেশকে পুনর্গঠন করার। কিন্তু এই সুযোগ নষ্ট করছে রাজনৈতিক দলগুলো। তিনি মনে করেন, জুলাইয়ে প্রত্যাশা পূরণ না হলেও প্রাপ্তি রয়েছে। দেশে গুম, খুন, আধিপত্যের রাজনীতি বন্ধ হয়েছে। মানুষের বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে সঠিকভাবে আওয়ামী লীগের বিচার না হলে এটা জাতির সবচেয় দুর্ভাগ্যের বিষয়। তার মতে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে ভয়ভীতির পরিবেশে। বিরোধী মতপ্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর আগের তুলনায় অবাধ হয়েছে। ব্যক্তি বা সরকার পরিবর্তনের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনও অসম্পূর্ণ।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার পর সংস্কার কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। তবে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সমঝোতার

ভিত্তিতে এমন একটি সংবিধান সংশোধনী প্রণয়ন করা হবেÑ যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারকে এগিয়ে নেবে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের আকাক্সক্ষার আলোকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সংবিধানেই প্রয়োজনীয় সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধার, কিছু আর্থিক সূচকের উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরতে শুরু করলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের ধীরগতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

ব্যবসায়ীদের একাংশ স্থিতিশীলতার কথা বললেও সাধারণ মানুষ এখনও নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী এখনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারেনি। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল টেকসই করতে হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’য় বিএনপির যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতা ও দলীয় আদর্শ দেখে নিয়োগ এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বিএনপির নির্বাচনের ইশতেহার এবং ৩১ দফার মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাম্প্রতিক সময় এই ধরনের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে দেশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, যেখানে অনেকেই মনে করতেন, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তির কোনো পথ আর অবশিষ্ট নেই। প্রচলিত রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাক্সক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও দলীয়করণমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহ.) তাফসির শাস্ত্রের কিংবদন্তি যিনি

স্বপ্নযাত্রায় ধীরগতি

আপডেট টাইম : ৫০ মিনিট আগে

দীর্ঘ দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, দুই বছর পেরিয়ে এসেও সেই স্বপ্নযাত্রার গতি অনেকটাই ধীর। গুম, ক্রসফায়ার ও মতপ্রকাশের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন কমে আসার মতো কিছু গুরুতপূর্ণ পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি, থমকে থাকা রাষ্ট্রসংস্কার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি। আইনের শাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বড় একটি অংশ এখনো অপূর্ণ। ফলে মুক্তির উচ্ছ্বাস ধরে রাখার পাশাপাশি স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা এখনও দীর্ঘ পথের অপেক্ষায়।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের সেই আন্দোলন শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না। বরং রাষ্ট্রে আইনের শাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার বিপ্লব ছিল। তবে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির ফারাক আকাশসম। জুলাই আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন এখনও আসেনি।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শায়লা আক্তার শশী মনে করেন, যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো এখনও নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। এটার জন্য আবু সাঈদ, মুগ্ধরা জীবন দেননি। যে সিস্টেম বদলানোর জন্য এত আত্মত্যাগ, আজও সেই একই সিস্টেমের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি।

তবে বিশ্লেষক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ধরনে। গুম, কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মতপ্রকাশের ক্ষেত্রও আগের তুলনায় কিছুটা উন্মুক্ত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে মব সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। কার্যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে ছিল না। সেই অবস্থা থেকে কিছুটা উত্তোরণ হলেও মানুষের মধ্যে স্বস্তি মেলেনি। এখনও প্রকাশ্য দিবালোকে, কখনও শত শত মানুষের সামনে গুলি করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের তাজা প্রাণ। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল, মে ও জুনÑ তিন মাসে সারাদেশে ৯২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসে মোট ৩২৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই এক মাসে ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। এ ছাড়া, মে মাসে মোট হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৩১০টি। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটনে ১৬টি হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আর এপ্রিল মাসে হত্যার ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ২৮৮টি। এর মধ্যে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ১৭টি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে হতাশার বিষয় হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের মামলার বিচার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র ১৫ শতাংশ মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। আদালতে চার্জশিট দাখিল করা কোনো মামলার বিচার শুরু হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত দুই আগস্ট পর্যন্ত দুই বছরে সারাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় ১ হাজার ৮৬৬টি মামলা থানায় রুজু হয়। এর মধ্যে তদন্ত নিষ্পত্তি মামলার সংখ্যা ২৬৮টি। গত দুই বছরে রুজু হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত নিষ্পত্তির হার ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ গত দুই বছরে ৮৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মাহমুদুল হাসান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল দেশের এক নিকৃষ্ট স্বৈরাচারের দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন থেকে মুক্তির জন্য। জুলাইয়ের সময় শুধু মাথায় ছিল এই অন্যায় শাসনের অবসান হোক। নির্যাতন, গুম, খুন বন্ধ হোক। আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। জুলাইয়ের পর এক বিশাল সুযোগ ছিল দেশকে পুনর্গঠন করার। কিন্তু এই সুযোগ নষ্ট করছে রাজনৈতিক দলগুলো। তিনি মনে করেন, জুলাইয়ে প্রত্যাশা পূরণ না হলেও প্রাপ্তি রয়েছে। দেশে গুম, খুন, আধিপত্যের রাজনীতি বন্ধ হয়েছে। মানুষের বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে সঠিকভাবে আওয়ামী লীগের বিচার না হলে এটা জাতির সবচেয় দুর্ভাগ্যের বিষয়। তার মতে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে ভয়ভীতির পরিবেশে। বিরোধী মতপ্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর আগের তুলনায় অবাধ হয়েছে। ব্যক্তি বা সরকার পরিবর্তনের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনও অসম্পূর্ণ।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার পর সংস্কার কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। তবে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সমঝোতার

ভিত্তিতে এমন একটি সংবিধান সংশোধনী প্রণয়ন করা হবেÑ যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারকে এগিয়ে নেবে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের আকাক্সক্ষার আলোকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সংবিধানেই প্রয়োজনীয় সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধার, কিছু আর্থিক সূচকের উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরতে শুরু করলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের ধীরগতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

ব্যবসায়ীদের একাংশ স্থিতিশীলতার কথা বললেও সাধারণ মানুষ এখনও নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী এখনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারেনি। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল টেকসই করতে হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’য় বিএনপির যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতা ও দলীয় আদর্শ দেখে নিয়োগ এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বিএনপির নির্বাচনের ইশতেহার এবং ৩১ দফার মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাম্প্রতিক সময় এই ধরনের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে দেশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, যেখানে অনেকেই মনে করতেন, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তির কোনো পথ আর অবশিষ্ট নেই। প্রচলিত রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাক্সক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও দলীয়করণমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।