ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

দেশের অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ফেলনা নন

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ বাংলাদেশে আমরা রাস্তার ধারে কিংবা গলির মধ্যে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে মুদি, স্টেশনারি বা পান-সিগারেটের দোকান বলে থাকি, তাদের নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়ে থাকে।

বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পুঁজির জোগানের যে ব্যবস্থা রয়েছে, সেসব ব্যবস্থার মধ্যে এসব মুদি, মনোহারি বা পান-সিগারেটের দোকানগুলোর স্থান নেই বললেই চলে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যেসব চমৎকার কথা আমরা বলে থাকি, তার মাঝে এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণিটি বেশ কম আলোচিত এবং তা সরকারের নীতি সুবিধাতে অনুপস্থিত এমনটি বলা অত্যুক্তি হবে না।

জাতিসংঘের পুঁজি উন্নয়ন তহবিল (UNCDF) বাংলাদেশের এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের এ সংস্থাটি বাংলাদেশের অতি ক্ষুদ্র এবং স্বল্প আলোচিত ব্যবসায়ীদের নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে প্রশংসার দাবিদার হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি তথা ফিনটেকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, ফাস্ট মুভিং পণ্য উৎপাদনকারী ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা এবং নতুন উদ্যোক্তারাও এ গবেষণা প্রতিবেদন থেকে অনেকভাবেই উপকৃত হতে পারেন।

মুদি, মনোহারি বা পান দোকান বলে খ্যাত অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তাদের সঙ্গে পণ্যের সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাতিসংঘের ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড বা জাতিসংঘ পুঁজি উন্নয়ন তহবিল কর্তৃক ২০১৮ সালে পরিচালিত জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩.১০ লাখ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছে, যাদের বছরে টার্নওভার হচ্ছে প্রায় ১৮.৪২ বিলিয়ন টাকা এবং প্রায় ২০ লাখ লোক এ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত। জাতিসংঘের ক্যাপিটাল ডেভেলপমন্টে ফান্ড তাদের এ রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, ২০১২-১৩ সাল থেকে জিডিপিতে তাদের অবদান ছিল ১৩ শতাংশ। এ ১৩ লাখ ১০ হাজার অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মধ্যে ৪৪ শতাংশের প্রত্যেকের বার্ষিক বিক্রয় টার্নওভার হচ্ছে ১.৬০ লাখ টাকার ওপরে এবং বাকি ৫৬ শতাংশের টার্নওভার ১.৬০ লাখ টাকার নিচে।

এ খাতটিতে প্রায় ২০ লাখ লোক নিয়েজিত রয়েছে। এদের মাঝে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাদের কর্মচারী প্রায় ৭৪ হাজার ৯০০ এবং বেতন ছাড়া সংযুক্ত প্রায় ৭.৪৩ লাখ পারিবারিক সদস্য। প্রায় ০.৯৫ লাখ মহিলা এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায় নিয়োজিত।

জরিপ প্রতিবেদনে যেভাবে সাধারণ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর প্রোফাইল তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, সাধারণত অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গড় বয়স প্রায় ৩৮ বছর এবং তাদের প্রায় ৯ বছরের ব্যবসার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে ১৬ থকে ৩০ বছর বয়সিদের সংখ্যা প্রায় ৩৫.২ শতাংশ। ৬৫ শতাংশ কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছে। এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মধ্যে ৭২.১ শতাংশ ব্যবসা ছাড়াও অন্য উপার্জনের পথ রয়েছে। অর্থাৎ জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহের জন্য তারা কেবল অতি ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল নয়। ৬৫.৬ শতাংশ ব্যবসায়ীর কোনো সময়ে ট্রেড লাইসেন্স ছিল; কিন্তু নবায়ন না করার কারণে তাদের অনেকের ট্রেড লাইসেন্স এখন আর নিয়মিত নয়। আরও জানা যায়, তাদের একটা বিরাট অংশ আগে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল; কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা পেশা পরিবর্তন করেছে।

অতি ক্ষুদ্র নারী ব্যবসায়ীদের বিষয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এ জরিপে। যেমন, প্রায় ০.৯৫ লাখ নারী এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে মহিলারা কোনো না কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পারিবারিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হচ্ছে। যদিও এর বিনিময়ে তারা কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করে না বা তাদের দেওয়া হয় না। আবার তাদের এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিসাব কিন্তু জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে যুক্ত হয় না।

এ জরিপটির মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং কিংবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বেশকছিু তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকিং সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি বা ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলো এ জরিপ প্রতিবেদন থেকে তাদের সেবার পরিধি বৃদ্ধির রসদ সরঞ্জাম পেতে পারেন। কিংবা ফার্স্ট মুভিং পণ্য যারা উৎপাদন বা বিতরণ করে থাকেন এবং যাদের সঙ্গে এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে তারা তাদের ব্যবসার স্বার্থেই জরিপে প্রদত্ত সুপারিশ অনুযায়ী এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিজেদের ব্যবসা পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারেন।

অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে নিজস্ব আয় বৃদ্ধির বিষয়ে সচেষ্ট থাকলেও ব্যবসার মূল অন্তরায় হচ্ছে তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতিবাচক মনোভাব কিংবা সদিচ্ছার অভাব। বেশিরভাগ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। মাত্র ৪৩ শতাংশ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে। অর্থাৎ ৫৭ শতাংশ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে রয়েছে। তাদের যদি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নেটওয়ার্কে আনা যেত, তাহলে তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাটা আরও সচল হতো এমনটা বলে যায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিষয়ে কিছু নেতিবাচক ঝুঁকি ও ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদের আর্র্থিক অন্তর্ভুক্তির নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে স্বচ্ছন্দবোধ করে না।

যারা ব্যাংক হিসাব খুলেছে, তাদের মাঝে মাত্র ২৩ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া এবং ৫৩ শতাংশ হিসাব খুলেছে শুধু সঞ্চয় করার জন্য। জরিপের আগে এক বছরের মধ্যে এদের মাঝে ৬১ শতাংশ বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ নিয়েছে। যার মধ্যে ৬৮ শতাংশ ঋণ নিয়েছে ক্ষুদ্র ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এবং যাদের ব্যাংক হিসাব রয়েছে, তাদের মাঝে মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সমর্থ হয়েছে। ঋণগ্রহণকারীরা গড়ে মাত্র ৯৫ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছে এমনটাই জরিপ প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। তাদের গড় ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার টাকা।

জরিপ প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ধারণায় নেই যে, তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারে অথবা ব্যাংক থেকে কোনো ধরনের ঋণ পাওয়া যায় সে সম্পর্কে তারা অপরিচিত। বেশিরভাগ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যাংকের কাউন্টারে গিয়ে লেনদেন করে থাকে। তাদের কেউ এটিএম বুথে লেনদেন করে না অর্থাৎ তাদের কোনো ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড নেই। এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সিংহভাগই দিন শেষে তাদের বিক্রয়ের অর্থ দিয়ে পাওনাদারকে অর্থ পরিশোধ করে অথবা ঘরে নিয়ে যায় তাদের দৈনন্দিন খরচের জন্য। খুব কম ব্যবসায়ী দিন শেষে তাদের বিক্রীত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখে।

অতি ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) সঙ্গে যুক্ত। এর মাঝে মাত্র ৪৩ শতাংশ ব্যবহারকারী মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে ব্যবসায়িক লেনদেনের কাজে ব্যবহার করে থাকে। আর মাত্র ৫.৬ শতাংশ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের সাপ্লায়ারদের পাওনা পরিশোধ করে থাকে অর্থাৎ সিংহভাগই লেনদেন করে থাকে নগদ টাকায়। ব্যবসায়ীরা জানান, সাপ্লায়াররা এমএফএস সেবার মাধ্যমে পাওনা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়।

জাতিসংঘের পুঁজি উন্নয়ন তহবিলের জরিপ থেকে জানা যায়, ৫৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সেবার সুবিধা সম্পর্কে অবহিত এবং তা পছন্দ করে ও ব্যবহার করে। তাদের অপছন্দের তিনটি মূল কারণ হচ্ছে উচ্চ সেবামূল্য, নেটওয়ার্ক না থাকাকালীন সমস্যা এবং ভুল হিসাবে টাকা পাঠানোর কারণে ফেরত না পাওয়ার বিড়ম্বনা।

জরিপ প্রতিবেদনের তথ্য থেকে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিজেদের উন্নতি আর ব্যবসা থেকে আয় বৃদ্ধির আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে অনেক সুযোগের অনুপস্থিতি। পণ্য ক্রয়ে বা অর্ডার প্রদানে এবং মজুদ ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার মাধ্যমে তাদের ব্যবসার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব বলে মন্তব্য করা হয়েছে। স্মার্টফোনে যদি নগদ ব্যবস্থাপনা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, পণ্য ক্রয়ে অর্ডার করার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তাদের খরচ যেমনি কমবে, ঠিক তেমনি ব্যবসারও উন্নতি হবে। ৩০ শতাংশ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে স্মার্টফোন রয়েছে। তাদের ব্যবসার উপযোগী একটি স্মার্টফোনভিত্তিক অনলাইন বা অফলাইন ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করা সম্ভব হলে উৎপাদনকারী, বিতরণকারী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভোক্তারা আর অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই এ থেকে উপকৃত হবেন। আর তৈরি হবে বিশাল একটি তথ্যভাণ্ডার।

ইউএনসিডিএফ এ খাতটির উন্নয়ন বিষয়ে বেশকিছু সুপারিশ করেছে যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর্র্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এফএমসিজি তথা ফার্স্ট মুভিং কনজিউমার গুডস কোম্পানিগুলো এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিক্রয়ের রেকর্ড ডিজিটাইজ করার কথা বলেছে। একটি নতুন পেমেন্ট পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং গ্রাহক উভয়ে লাভবান হবে। এমন একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করা, যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা ক্যাশ, অ্যাকাউন্টস এবং মজুদ ব্যস্থাপনা স্মার্টফোনের মাধ্যমে করা যায়। ডিজিটাইজড ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা হলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ পণ্য উৎপাদনকারী এবং বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়ীদের বিক্রয়, মজুদ এবং বাকি বিক্রয়ের বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে তাদের ঋণপ্রদান কিংবা বাকিতে পণ্য সরবরাহ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে ডিজিটাইজড করার জন্য জোর তাগাদা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নতির আলোচনায় পোশাক খাতকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়ে থাকে; কিন্তু ইউএনসিডিএফের জরিপের তথ্য থেকে এমনটি সুপারিশ করা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কেননা অদক্ষ বেকারদের জন্য এটি একটি চমৎকার স্থান। তারা সরাসরি ভোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এফএমসিজি খাতের উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের জন্য এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হচ্ছে অন্যতম ভরসার স্থান।

জাতিসংঘের পুঁজি উন্নয়ন তহবিল বাংলাদেশের অবহেলিত এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর জরিপ পরিচালনা করে সরকারের নীতিনির্ধারক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, এফএমসিজি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য-উপাত্ত ও সুপারিশ প্রণয়ন করেছে, এজন্য তারা প্রশংসার দাবিদার।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

দেশের অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ফেলনা নন

আপডেট টাইম : ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ বাংলাদেশে আমরা রাস্তার ধারে কিংবা গলির মধ্যে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে মুদি, স্টেশনারি বা পান-সিগারেটের দোকান বলে থাকি, তাদের নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়ে থাকে।

বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পুঁজির জোগানের যে ব্যবস্থা রয়েছে, সেসব ব্যবস্থার মধ্যে এসব মুদি, মনোহারি বা পান-সিগারেটের দোকানগুলোর স্থান নেই বললেই চলে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যেসব চমৎকার কথা আমরা বলে থাকি, তার মাঝে এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণিটি বেশ কম আলোচিত এবং তা সরকারের নীতি সুবিধাতে অনুপস্থিত এমনটি বলা অত্যুক্তি হবে না।

জাতিসংঘের পুঁজি উন্নয়ন তহবিল (UNCDF) বাংলাদেশের এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের এ সংস্থাটি বাংলাদেশের অতি ক্ষুদ্র এবং স্বল্প আলোচিত ব্যবসায়ীদের নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে প্রশংসার দাবিদার হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি তথা ফিনটেকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, ফাস্ট মুভিং পণ্য উৎপাদনকারী ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা এবং নতুন উদ্যোক্তারাও এ গবেষণা প্রতিবেদন থেকে অনেকভাবেই উপকৃত হতে পারেন।

মুদি, মনোহারি বা পান দোকান বলে খ্যাত অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তাদের সঙ্গে পণ্যের সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাতিসংঘের ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড বা জাতিসংঘ পুঁজি উন্নয়ন তহবিল কর্তৃক ২০১৮ সালে পরিচালিত জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩.১০ লাখ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছে, যাদের বছরে টার্নওভার হচ্ছে প্রায় ১৮.৪২ বিলিয়ন টাকা এবং প্রায় ২০ লাখ লোক এ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত। জাতিসংঘের ক্যাপিটাল ডেভেলপমন্টে ফান্ড তাদের এ রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, ২০১২-১৩ সাল থেকে জিডিপিতে তাদের অবদান ছিল ১৩ শতাংশ। এ ১৩ লাখ ১০ হাজার অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মধ্যে ৪৪ শতাংশের প্রত্যেকের বার্ষিক বিক্রয় টার্নওভার হচ্ছে ১.৬০ লাখ টাকার ওপরে এবং বাকি ৫৬ শতাংশের টার্নওভার ১.৬০ লাখ টাকার নিচে।

এ খাতটিতে প্রায় ২০ লাখ লোক নিয়েজিত রয়েছে। এদের মাঝে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাদের কর্মচারী প্রায় ৭৪ হাজার ৯০০ এবং বেতন ছাড়া সংযুক্ত প্রায় ৭.৪৩ লাখ পারিবারিক সদস্য। প্রায় ০.৯৫ লাখ মহিলা এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায় নিয়োজিত।

জরিপ প্রতিবেদনে যেভাবে সাধারণ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর প্রোফাইল তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, সাধারণত অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গড় বয়স প্রায় ৩৮ বছর এবং তাদের প্রায় ৯ বছরের ব্যবসার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে ১৬ থকে ৩০ বছর বয়সিদের সংখ্যা প্রায় ৩৫.২ শতাংশ। ৬৫ শতাংশ কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছে। এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মধ্যে ৭২.১ শতাংশ ব্যবসা ছাড়াও অন্য উপার্জনের পথ রয়েছে। অর্থাৎ জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহের জন্য তারা কেবল অতি ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল নয়। ৬৫.৬ শতাংশ ব্যবসায়ীর কোনো সময়ে ট্রেড লাইসেন্স ছিল; কিন্তু নবায়ন না করার কারণে তাদের অনেকের ট্রেড লাইসেন্স এখন আর নিয়মিত নয়। আরও জানা যায়, তাদের একটা বিরাট অংশ আগে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল; কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা পেশা পরিবর্তন করেছে।

অতি ক্ষুদ্র নারী ব্যবসায়ীদের বিষয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এ জরিপে। যেমন, প্রায় ০.৯৫ লাখ নারী এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে মহিলারা কোনো না কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পারিবারিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হচ্ছে। যদিও এর বিনিময়ে তারা কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করে না বা তাদের দেওয়া হয় না। আবার তাদের এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিসাব কিন্তু জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে যুক্ত হয় না।

এ জরিপটির মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং কিংবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বেশকছিু তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকিং সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি বা ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলো এ জরিপ প্রতিবেদন থেকে তাদের সেবার পরিধি বৃদ্ধির রসদ সরঞ্জাম পেতে পারেন। কিংবা ফার্স্ট মুভিং পণ্য যারা উৎপাদন বা বিতরণ করে থাকেন এবং যাদের সঙ্গে এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে তারা তাদের ব্যবসার স্বার্থেই জরিপে প্রদত্ত সুপারিশ অনুযায়ী এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিজেদের ব্যবসা পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারেন।

অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে নিজস্ব আয় বৃদ্ধির বিষয়ে সচেষ্ট থাকলেও ব্যবসার মূল অন্তরায় হচ্ছে তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতিবাচক মনোভাব কিংবা সদিচ্ছার অভাব। বেশিরভাগ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। মাত্র ৪৩ শতাংশ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে। অর্থাৎ ৫৭ শতাংশ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে রয়েছে। তাদের যদি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নেটওয়ার্কে আনা যেত, তাহলে তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাটা আরও সচল হতো এমনটা বলে যায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিষয়ে কিছু নেতিবাচক ঝুঁকি ও ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদের আর্র্থিক অন্তর্ভুক্তির নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে স্বচ্ছন্দবোধ করে না।

যারা ব্যাংক হিসাব খুলেছে, তাদের মাঝে মাত্র ২৩ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া এবং ৫৩ শতাংশ হিসাব খুলেছে শুধু সঞ্চয় করার জন্য। জরিপের আগে এক বছরের মধ্যে এদের মাঝে ৬১ শতাংশ বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ নিয়েছে। যার মধ্যে ৬৮ শতাংশ ঋণ নিয়েছে ক্ষুদ্র ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এবং যাদের ব্যাংক হিসাব রয়েছে, তাদের মাঝে মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সমর্থ হয়েছে। ঋণগ্রহণকারীরা গড়ে মাত্র ৯৫ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছে এমনটাই জরিপ প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। তাদের গড় ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার টাকা।

জরিপ প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ধারণায় নেই যে, তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারে অথবা ব্যাংক থেকে কোনো ধরনের ঋণ পাওয়া যায় সে সম্পর্কে তারা অপরিচিত। বেশিরভাগ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যাংকের কাউন্টারে গিয়ে লেনদেন করে থাকে। তাদের কেউ এটিএম বুথে লেনদেন করে না অর্থাৎ তাদের কোনো ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড নেই। এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সিংহভাগই দিন শেষে তাদের বিক্রয়ের অর্থ দিয়ে পাওনাদারকে অর্থ পরিশোধ করে অথবা ঘরে নিয়ে যায় তাদের দৈনন্দিন খরচের জন্য। খুব কম ব্যবসায়ী দিন শেষে তাদের বিক্রীত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখে।

অতি ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) সঙ্গে যুক্ত। এর মাঝে মাত্র ৪৩ শতাংশ ব্যবহারকারী মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে ব্যবসায়িক লেনদেনের কাজে ব্যবহার করে থাকে। আর মাত্র ৫.৬ শতাংশ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের সাপ্লায়ারদের পাওনা পরিশোধ করে থাকে অর্থাৎ সিংহভাগই লেনদেন করে থাকে নগদ টাকায়। ব্যবসায়ীরা জানান, সাপ্লায়াররা এমএফএস সেবার মাধ্যমে পাওনা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়।

জাতিসংঘের পুঁজি উন্নয়ন তহবিলের জরিপ থেকে জানা যায়, ৫৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সেবার সুবিধা সম্পর্কে অবহিত এবং তা পছন্দ করে ও ব্যবহার করে। তাদের অপছন্দের তিনটি মূল কারণ হচ্ছে উচ্চ সেবামূল্য, নেটওয়ার্ক না থাকাকালীন সমস্যা এবং ভুল হিসাবে টাকা পাঠানোর কারণে ফেরত না পাওয়ার বিড়ম্বনা।

জরিপ প্রতিবেদনের তথ্য থেকে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিজেদের উন্নতি আর ব্যবসা থেকে আয় বৃদ্ধির আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে অনেক সুযোগের অনুপস্থিতি। পণ্য ক্রয়ে বা অর্ডার প্রদানে এবং মজুদ ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার মাধ্যমে তাদের ব্যবসার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব বলে মন্তব্য করা হয়েছে। স্মার্টফোনে যদি নগদ ব্যবস্থাপনা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, পণ্য ক্রয়ে অর্ডার করার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তাদের খরচ যেমনি কমবে, ঠিক তেমনি ব্যবসারও উন্নতি হবে। ৩০ শতাংশ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে স্মার্টফোন রয়েছে। তাদের ব্যবসার উপযোগী একটি স্মার্টফোনভিত্তিক অনলাইন বা অফলাইন ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করা সম্ভব হলে উৎপাদনকারী, বিতরণকারী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভোক্তারা আর অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই এ থেকে উপকৃত হবেন। আর তৈরি হবে বিশাল একটি তথ্যভাণ্ডার।

ইউএনসিডিএফ এ খাতটির উন্নয়ন বিষয়ে বেশকিছু সুপারিশ করেছে যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর্র্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এফএমসিজি তথা ফার্স্ট মুভিং কনজিউমার গুডস কোম্পানিগুলো এসব অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিক্রয়ের রেকর্ড ডিজিটাইজ করার কথা বলেছে। একটি নতুন পেমেন্ট পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং গ্রাহক উভয়ে লাভবান হবে। এমন একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করা, যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা ক্যাশ, অ্যাকাউন্টস এবং মজুদ ব্যস্থাপনা স্মার্টফোনের মাধ্যমে করা যায়। ডিজিটাইজড ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা হলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ পণ্য উৎপাদনকারী এবং বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়ীদের বিক্রয়, মজুদ এবং বাকি বিক্রয়ের বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে তাদের ঋণপ্রদান কিংবা বাকিতে পণ্য সরবরাহ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে ডিজিটাইজড করার জন্য জোর তাগাদা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নতির আলোচনায় পোশাক খাতকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়ে থাকে; কিন্তু ইউএনসিডিএফের জরিপের তথ্য থেকে এমনটি সুপারিশ করা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কেননা অদক্ষ বেকারদের জন্য এটি একটি চমৎকার স্থান। তারা সরাসরি ভোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এফএমসিজি খাতের উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের জন্য এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হচ্ছে অন্যতম ভরসার স্থান।

জাতিসংঘের পুঁজি উন্নয়ন তহবিল বাংলাদেশের অবহেলিত এ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর জরিপ পরিচালনা করে সরকারের নীতিনির্ধারক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, এফএমসিজি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য-উপাত্ত ও সুপারিশ প্রণয়ন করেছে, এজন্য তারা প্রশংসার দাবিদার।