ঢাকা , শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাপ-লুডু আবিষ্কার হলো যেভাবে

লুডু খেলা আমাদের বেশিরভাগ মানুষের ছোটবেলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আগে সবাই রঙিন লুডুর কোট নিয়ে খেলতে বসতো। একপাশে থাকতো ৪ ঘরের লুডু, অন্যপাশে সাপ-লুডু। খেলাটি এতই জনপ্রিয় যে, সময়ের পরিক্রমায় এখন ভার্চুয়ালি লুডু খেলা হয়। অনেকেরই বিশেষ পছন্দ সাপ-লুডু। সাপ ও মইয়ের খেলায় মেতে ওঠা, মই বেয়ে হঠাৎ অনেকটা ওপরে উঠে যাওয়া, আবার সাপের মুখে পড়ে এক লাফে নিচে নেমে আসা- এই ওঠানামাই খেলাটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলতো। এ খেলা যেন মানুষের জীবনের উত্থান-পতনেরই মতো। কিন্তু জনপ্রিয় খেলাটি কীভাবে আবিষ্কার হলো, তা অনেকেরই অজানা।
সাপ-লুডুর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় ১৯৭৭ সালে। সে সময় দীপক সিংখাদা নামের এক যুবক শিকাগোর ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন শিল্পকর্মের তালিকা তৈরির কাজ করছিলেন। জাদুঘরের এক কোণে থাকা একটি অদ্ভুত চিত্র তার নজরে আসে। রেজিস্টারে সেটিকে শুধু ‘রিলিজিয়াস ওয়ার্ক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ছবিতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেবের উপস্থিতি দেখে দীপক ভাবে, এটি কি সত্যিই শুধু ধর্মীয় কোনো চিত্র?
খোঁজখবর ও বিভিন্ন পুঁথিপত্র পড়তে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, ছবিটির সঙ্গে নেপালের কোনো প্রাচীন খেলার সম্পর্ক থাকতে পারে। একজন অধ্যাপকও তাকে জানান, নেপালের একটি জাদুঘরে একই ধরনের চিত্র তিনি দেখেছেন। রহস্যের সন্ধানে দীপক নেপালে গিয়ে ন্যাশনাল মিউজিয়ামের রেজিস্টার ঘাঁটতে শুরু করেন। সেখানে তিনি শিকাগোতে দেখা চিত্রটির মতোই একটি শিল্পকর্মের সন্ধান পান। সেটি বের করে দেখা যায়, এর নাম ‘নাগপাশ’।
দীপকের অনুসন্ধানে পরিষ্কার হয়, নাগপাশ আসলে কোনো ধর্মীয় চিত্র নয়, এটি একটি খেলার ছক। নেপালে খেলাটির শুদ্ধ নাম ‘নাগপাশ’, যদিও প্রচলিত কথায় একে ‘বৈকুণ্ঠ খেল’ও বলা হয়। আর এই নাগপাশই মূলত আমাদের পরিচিত সাপ-লুডুর প্রাচীন একটি রূপ।
নেপালি নাগপাশের আদলে তৈরী চিত্রকর্ম। ছবি : সংগৃহীত
নেপালি নাগপাশের ছকে লাল ও কালো- ২ ধরনের সাপ দেখা যায়। লাল সাপ শুভ, লাভ ও সৌভাগ্যের প্রতীক। গুটি লাল সাপের লেজের কাছে পৌঁছালে, তা খেলোয়াড়কে অনেক ওপরে তুলে দেয়। অন্যদিকে, কালো সাপ অশুভ ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক। তার মুখে গুটি পড়লে খেলোয়াড়কে অনেক নিচে নেমে যেতে হয়। আধুনিক সাপ-লুডুতেও সাপের মুখে পড়লে গুটি নিচে নেমে যায়। তবে, ওপরে ওঠার জন্য লাল সাপের বদলে এখন সাধারণত মই বা সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়। কোথাও আবার তীর, রকেট ইত্যাদিও দেখা যায়।
তবে, প্রাচীন নাগপাশের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কর্মফল, পাপ-পুণ্য এবং জন্ম-মৃত্যুর দর্শন। প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল, মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের ফল ভবিষ্যৎ জীবন এবং পরজন্মে সঞ্চিত থাকে। ভালো কাজের ফল পুণ্য এবং মন্দ কাজের ফল পাপ। পুণ্যের ফলে স্বর্গ এবং পাপের ফলে নরক ভোগ করতে হয়- এমন ধারণা থেকেই নাগপাশকে কর্মফল বোঝার এক প্রতীকী খেলা হিসেবে দেখা হতো।
নেপালে পাওয়া নাগপাশের ২টি প্রাচীন চিত্রপটই শক্ত কাপড়ের ওপর আঁকা। প্রতিটি ছকে ছিল ৭২টি ঘর এবং মোট ১৫টি লাল-কালো সাপ। নিচ থেকে ওপরের দিকে সাজানো ঘরগুলোতে মানুষের জীবনের নানা অবস্থার প্রতীকী ছবি দেখা যায়। নিচের দিকে কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহে আবদ্ধ মানুষের চিত্র; ওপরের দিকে রয়েছে জ্ঞান, চেতনা ও আত্মোপলব্ধির প্রতীক। একেবারে শীর্ষে রয়েছে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেবের ছবি।
খেলায় গুটি চালানোর জন্য সংখ্যাযুক্ত দান ব্যবহার করা হতো। যত সংখ্যা উঠত, গুটি তত ঘর এগিয়ে যেত। এই যাত্রাপথে কখনও লাল সাপের সাহায্যে ওপরে ওঠা যেত, আবার কখনও কালো সাপের মুখে পড়ে অনেক নিচে নেমে আসতে হতো। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হতো, মানুষের পাপ তাকে নিচের দিকে টেনে নেয়, অন্যদিকে ভালো কাজ তাকে উন্নত জীবনের দিকে নিয়ে যায়। বারবার ওঠা-নামার এই প্রক্রিয়া জন্মান্তরের চক্রকেও প্রতীকীভাবে তুলে ধরত।
সাপ ও মইয়ের তৈরি খেলা জ্ঞান-চৌপার। ছবি : সংগৃহীত
বিভিন্ন গবেষকের মতে, নাগপাশ নেপালে প্রচলিত হলেও এর শিকড় ভারতীয় উপমহাদেশে আরও পুরনো। ১৯৭৫ সালে হরিশ জোহারির লেখা একটি বইয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়, নেপালে নাগপাশের প্রচলন দশম শতকে হলেও তারও আগে ভারতবর্ষে একই ধরনের খেলা প্রচলিত ছিল। সেখানে এর নাম ছিল ‘জ্ঞান-চৌপার’ বা ‘মোক্ষ-পতমু’; সংক্ষেপে একে ‘মোক্ষপট’ও বলা হতো।
জ্ঞান-চৌপারের উদ্দেশ্যও ছিল জীবনের কর্মফল ও আত্মিক উন্নতির প্রতীকী প্রকাশ। এই খেলাতেও ছিল ৭২টি ঘর। তবে, এখানে লাল সাপের বদলে ব্যবহার করা হতো তীর বা বাণ, যা পরবর্তীকালে মই বা সিঁড়ির রূপ নেয়। ধারণা করা হয়, আধুনিক সাপ-লুডুতে সাপ ও মইয়ের যে কাঠামো দেখা যায়, তার উৎস এই জ্ঞান-চৌপারেই।
নাগপাশ ও জ্ঞান-চৌপারের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল খেলা শুরুর নিয়মে। জ্ঞান-চৌপারে খেলা শুরু হতো ৬৮ নম্বর ঘর থেকে। খেলোয়াড় এগোতে এগোতে নানা সাপের মুখে পড়তেন এবং ঘুরে আবার ৬৮ নম্বর ঘরে ফিরে আসতেন। এর মধ্যে ছিল এক ধরনের দার্শনিক ভাবনা- আনন্দ থেকে জীবনের যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত আবার সেই পরম আনন্দের কাছেই ফিরে যেতে হবে।
অন্যদিকে, নাগপাশ শুরু হতো প্রথম ঘর থেকে। শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের মতো জীবনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে খেলোয়াড়কে এগোতে হতো। লাল ও কালো সাপ এই যাত্রার শুভ-অশুভ কর্মফলের প্রতীক হিসেবে কাজ করত। ৭২টি ঘর অতিক্রম করতে পারলেই মোক্ষ বা মুক্তির ধারণাটি পূর্ণ হতো।
ব্রিটিশদের তৈরি সাপ-লুডু। ছবি : সংগৃহীত
পরবর্তীকালে এই ধরনের খেলায় ঘরের সংখ্যা বেড়ে ১০০ হয়, যা আধুনিক সাপ-লুডুতেও প্রচলিত। তবে, প্রাথমিক পর্যায়ে ৭২টি ঘরের বিশেষ তাৎপর্য ছিল। তৎকালীন বিশ্বাস অনুযায়ী, সংসারচক্রের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে ৭২ সংখ্যাটির সম্পর্ক ছিল। তাই ৭২ নম্বর ঘরে পৌঁছানোকে জীবনচক্রের সমাপ্তি বা মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যেও এই খেলার প্রচলন ঘটে এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট ধর্মের নীতি, আদর্শ ও উপদেশ যুক্ত হতে থাকে।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপীয়রাও এই খেলাটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। উনিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশরা নিজেদের উপযোগী করে সাপ-লুডুর একটি সংস্করণ তৈরি করে। মূল খেলার কাঠামো বজায় রেখেও তারা এতে নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতিশিক্ষামূলক বক্তব্য যোগ করে। এরপর খেলাটি ইউরোপ ও আমেরিকাতেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ভার্চুয়াল সাপ-লুডু খেলা। ছবি : সংগৃহীত
বিশ শতকে এসে সাপ-লুডু কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে সবার জন্য উপভোগ্য একটি বোর্ড গেম। সময়ের সঙ্গে এর ছক, ঘরের সংখ্যা, সাপের বদলে মই বা অন্য প্রতীক ব্যবহারের মতো নানা পরিবর্তন আসে। এমনকি বর্তমান সময়ে এসে ভিডিও গেমসের কল্যাণে ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় খেলাটি অনেকের মোবাইল ও কম্পিউটারে স্থান করে নিয়েছে। তাই কালের বিবর্তনে খেলাটিতে নানা পরিবর্তন আসলেও, এর জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। মূল আকর্ষণ আজও সেই একই- এক দানে হঠাৎ ওপরে উঠে যাওয়া, আবার পরের মুহূর্তেই সাপের মুখে পড়ে নিচে নেমে আসা।
তথ্যসূত্র : ‘সাপ-লুডুর উৎস সন্ধানে’ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

সাপ-লুডু আবিষ্কার হলো যেভাবে

আপডেট টাইম : ৩৩ মিনিট আগে
লুডু খেলা আমাদের বেশিরভাগ মানুষের ছোটবেলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আগে সবাই রঙিন লুডুর কোট নিয়ে খেলতে বসতো। একপাশে থাকতো ৪ ঘরের লুডু, অন্যপাশে সাপ-লুডু। খেলাটি এতই জনপ্রিয় যে, সময়ের পরিক্রমায় এখন ভার্চুয়ালি লুডু খেলা হয়। অনেকেরই বিশেষ পছন্দ সাপ-লুডু। সাপ ও মইয়ের খেলায় মেতে ওঠা, মই বেয়ে হঠাৎ অনেকটা ওপরে উঠে যাওয়া, আবার সাপের মুখে পড়ে এক লাফে নিচে নেমে আসা- এই ওঠানামাই খেলাটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলতো। এ খেলা যেন মানুষের জীবনের উত্থান-পতনেরই মতো। কিন্তু জনপ্রিয় খেলাটি কীভাবে আবিষ্কার হলো, তা অনেকেরই অজানা।
সাপ-লুডুর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় ১৯৭৭ সালে। সে সময় দীপক সিংখাদা নামের এক যুবক শিকাগোর ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন শিল্পকর্মের তালিকা তৈরির কাজ করছিলেন। জাদুঘরের এক কোণে থাকা একটি অদ্ভুত চিত্র তার নজরে আসে। রেজিস্টারে সেটিকে শুধু ‘রিলিজিয়াস ওয়ার্ক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ছবিতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেবের উপস্থিতি দেখে দীপক ভাবে, এটি কি সত্যিই শুধু ধর্মীয় কোনো চিত্র?
খোঁজখবর ও বিভিন্ন পুঁথিপত্র পড়তে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, ছবিটির সঙ্গে নেপালের কোনো প্রাচীন খেলার সম্পর্ক থাকতে পারে। একজন অধ্যাপকও তাকে জানান, নেপালের একটি জাদুঘরে একই ধরনের চিত্র তিনি দেখেছেন। রহস্যের সন্ধানে দীপক নেপালে গিয়ে ন্যাশনাল মিউজিয়ামের রেজিস্টার ঘাঁটতে শুরু করেন। সেখানে তিনি শিকাগোতে দেখা চিত্রটির মতোই একটি শিল্পকর্মের সন্ধান পান। সেটি বের করে দেখা যায়, এর নাম ‘নাগপাশ’।
দীপকের অনুসন্ধানে পরিষ্কার হয়, নাগপাশ আসলে কোনো ধর্মীয় চিত্র নয়, এটি একটি খেলার ছক। নেপালে খেলাটির শুদ্ধ নাম ‘নাগপাশ’, যদিও প্রচলিত কথায় একে ‘বৈকুণ্ঠ খেল’ও বলা হয়। আর এই নাগপাশই মূলত আমাদের পরিচিত সাপ-লুডুর প্রাচীন একটি রূপ।
নেপালি নাগপাশের আদলে তৈরী চিত্রকর্ম। ছবি : সংগৃহীত
নেপালি নাগপাশের ছকে লাল ও কালো- ২ ধরনের সাপ দেখা যায়। লাল সাপ শুভ, লাভ ও সৌভাগ্যের প্রতীক। গুটি লাল সাপের লেজের কাছে পৌঁছালে, তা খেলোয়াড়কে অনেক ওপরে তুলে দেয়। অন্যদিকে, কালো সাপ অশুভ ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক। তার মুখে গুটি পড়লে খেলোয়াড়কে অনেক নিচে নেমে যেতে হয়। আধুনিক সাপ-লুডুতেও সাপের মুখে পড়লে গুটি নিচে নেমে যায়। তবে, ওপরে ওঠার জন্য লাল সাপের বদলে এখন সাধারণত মই বা সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়। কোথাও আবার তীর, রকেট ইত্যাদিও দেখা যায়।
তবে, প্রাচীন নাগপাশের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কর্মফল, পাপ-পুণ্য এবং জন্ম-মৃত্যুর দর্শন। প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল, মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের ফল ভবিষ্যৎ জীবন এবং পরজন্মে সঞ্চিত থাকে। ভালো কাজের ফল পুণ্য এবং মন্দ কাজের ফল পাপ। পুণ্যের ফলে স্বর্গ এবং পাপের ফলে নরক ভোগ করতে হয়- এমন ধারণা থেকেই নাগপাশকে কর্মফল বোঝার এক প্রতীকী খেলা হিসেবে দেখা হতো।
নেপালে পাওয়া নাগপাশের ২টি প্রাচীন চিত্রপটই শক্ত কাপড়ের ওপর আঁকা। প্রতিটি ছকে ছিল ৭২টি ঘর এবং মোট ১৫টি লাল-কালো সাপ। নিচ থেকে ওপরের দিকে সাজানো ঘরগুলোতে মানুষের জীবনের নানা অবস্থার প্রতীকী ছবি দেখা যায়। নিচের দিকে কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহে আবদ্ধ মানুষের চিত্র; ওপরের দিকে রয়েছে জ্ঞান, চেতনা ও আত্মোপলব্ধির প্রতীক। একেবারে শীর্ষে রয়েছে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেবের ছবি।
খেলায় গুটি চালানোর জন্য সংখ্যাযুক্ত দান ব্যবহার করা হতো। যত সংখ্যা উঠত, গুটি তত ঘর এগিয়ে যেত। এই যাত্রাপথে কখনও লাল সাপের সাহায্যে ওপরে ওঠা যেত, আবার কখনও কালো সাপের মুখে পড়ে অনেক নিচে নেমে আসতে হতো। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হতো, মানুষের পাপ তাকে নিচের দিকে টেনে নেয়, অন্যদিকে ভালো কাজ তাকে উন্নত জীবনের দিকে নিয়ে যায়। বারবার ওঠা-নামার এই প্রক্রিয়া জন্মান্তরের চক্রকেও প্রতীকীভাবে তুলে ধরত।
সাপ ও মইয়ের তৈরি খেলা জ্ঞান-চৌপার। ছবি : সংগৃহীত
বিভিন্ন গবেষকের মতে, নাগপাশ নেপালে প্রচলিত হলেও এর শিকড় ভারতীয় উপমহাদেশে আরও পুরনো। ১৯৭৫ সালে হরিশ জোহারির লেখা একটি বইয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়, নেপালে নাগপাশের প্রচলন দশম শতকে হলেও তারও আগে ভারতবর্ষে একই ধরনের খেলা প্রচলিত ছিল। সেখানে এর নাম ছিল ‘জ্ঞান-চৌপার’ বা ‘মোক্ষ-পতমু’; সংক্ষেপে একে ‘মোক্ষপট’ও বলা হতো।
জ্ঞান-চৌপারের উদ্দেশ্যও ছিল জীবনের কর্মফল ও আত্মিক উন্নতির প্রতীকী প্রকাশ। এই খেলাতেও ছিল ৭২টি ঘর। তবে, এখানে লাল সাপের বদলে ব্যবহার করা হতো তীর বা বাণ, যা পরবর্তীকালে মই বা সিঁড়ির রূপ নেয়। ধারণা করা হয়, আধুনিক সাপ-লুডুতে সাপ ও মইয়ের যে কাঠামো দেখা যায়, তার উৎস এই জ্ঞান-চৌপারেই।
নাগপাশ ও জ্ঞান-চৌপারের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল খেলা শুরুর নিয়মে। জ্ঞান-চৌপারে খেলা শুরু হতো ৬৮ নম্বর ঘর থেকে। খেলোয়াড় এগোতে এগোতে নানা সাপের মুখে পড়তেন এবং ঘুরে আবার ৬৮ নম্বর ঘরে ফিরে আসতেন। এর মধ্যে ছিল এক ধরনের দার্শনিক ভাবনা- আনন্দ থেকে জীবনের যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত আবার সেই পরম আনন্দের কাছেই ফিরে যেতে হবে।
অন্যদিকে, নাগপাশ শুরু হতো প্রথম ঘর থেকে। শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের মতো জীবনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে খেলোয়াড়কে এগোতে হতো। লাল ও কালো সাপ এই যাত্রার শুভ-অশুভ কর্মফলের প্রতীক হিসেবে কাজ করত। ৭২টি ঘর অতিক্রম করতে পারলেই মোক্ষ বা মুক্তির ধারণাটি পূর্ণ হতো।
ব্রিটিশদের তৈরি সাপ-লুডু। ছবি : সংগৃহীত
পরবর্তীকালে এই ধরনের খেলায় ঘরের সংখ্যা বেড়ে ১০০ হয়, যা আধুনিক সাপ-লুডুতেও প্রচলিত। তবে, প্রাথমিক পর্যায়ে ৭২টি ঘরের বিশেষ তাৎপর্য ছিল। তৎকালীন বিশ্বাস অনুযায়ী, সংসারচক্রের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে ৭২ সংখ্যাটির সম্পর্ক ছিল। তাই ৭২ নম্বর ঘরে পৌঁছানোকে জীবনচক্রের সমাপ্তি বা মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যেও এই খেলার প্রচলন ঘটে এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট ধর্মের নীতি, আদর্শ ও উপদেশ যুক্ত হতে থাকে।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপীয়রাও এই খেলাটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। উনিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশরা নিজেদের উপযোগী করে সাপ-লুডুর একটি সংস্করণ তৈরি করে। মূল খেলার কাঠামো বজায় রেখেও তারা এতে নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতিশিক্ষামূলক বক্তব্য যোগ করে। এরপর খেলাটি ইউরোপ ও আমেরিকাতেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ভার্চুয়াল সাপ-লুডু খেলা। ছবি : সংগৃহীত
বিশ শতকে এসে সাপ-লুডু কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে সবার জন্য উপভোগ্য একটি বোর্ড গেম। সময়ের সঙ্গে এর ছক, ঘরের সংখ্যা, সাপের বদলে মই বা অন্য প্রতীক ব্যবহারের মতো নানা পরিবর্তন আসে। এমনকি বর্তমান সময়ে এসে ভিডিও গেমসের কল্যাণে ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় খেলাটি অনেকের মোবাইল ও কম্পিউটারে স্থান করে নিয়েছে। তাই কালের বিবর্তনে খেলাটিতে নানা পরিবর্তন আসলেও, এর জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। মূল আকর্ষণ আজও সেই একই- এক দানে হঠাৎ ওপরে উঠে যাওয়া, আবার পরের মুহূর্তেই সাপের মুখে পড়ে নিচে নেমে আসা।
তথ্যসূত্র : ‘সাপ-লুডুর উৎস সন্ধানে’ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী