ঢাকা , শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এআই শেয়ারবাজারে ধস, কেন এই আতঙ্ক ১০ রোগের উপশম হয় যে পাতা খেলে প্রাসঙ্গিকতায় ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ২০২৭ সালের সরকারি ছুটির তালিকা প্রকাশ, টানা ছুটির সুযোগ কত দিন বিএনপি একাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষের শক্তি: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শহীদ জিয়ার নেতৃত্বেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসিনাকে হ্যান্ডকাফ পরেই দেশে আসতে হবে: প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের দশম শ্রেণির ছাত্রী যুথি হত্যায় সাবেক প্রেমিকসহ গ্রেপ্তার ৩ প্রশিক্ষণ নিতে পাকিস্তানে যাচ্ছেন সরকারের ৩৫ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশের ভেতরে-বাইরে থেকে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, জবাব দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রাসঙ্গিকতায় ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর

ইতিহাসের কোনো কোনো দিন একটি জাতির রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক অভিমুখ ও আত্মপরিচয়ের পুনর্বিন্যাসের সন্ধিক্ষণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন।

উইলেম ফান শেন্ডেল তাঁর ‘আ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ১৮তম অধ্যায় ‘আ স্টেট প্রাসঙ্গিকতায় ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরইজ বর্ন’-এ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ও রাষ্ট্র গঠনের সংকট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশকে রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতির সামনে বাংলাদেশকে নতুন রূপে উপস্থাপন করার সুযোগ পান একজন সেনা কর্মকর্তা। পরবর্তীকালে বিশ্বের বুকে যিনি পরিচিতি পান একজন প্রতিশ্রুতিশীল, উন্নত-আধুনিক চিন্তার দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। একাত্তরের রণাঙ্গনের নেতৃত্ব থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশকে যিনি টেনে তোলার দায়িত্ব নেন এবং এই কাজে যিনি খুব অল্প সময়েই সফল হয়েছিলেন।

স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব খুঁজে পায়। তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এ প্রসঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান তাঁর লেখা ‘কিছু স্মৃতি কিছু কথা’ বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘৭ নভেম্বর গোটা দেশজুড়ে সৈনিক-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব উত্থান ঘটে। আর জেনারেল জিয়া সে অভ্যুত্থানের উত্তাল তরঙ্গমালার শৃঙ্গে আরোহণ করে উঠে আসেন জাতীয় নেতৃত্বের পাদপ্রদীপে।’

নওমি হোসেনের ‘দি এইড ল্যাব : আন্ডারস্ট্যান্ডিং বাংলাদেশ’স আন-এক্সপেক্টেড সাকসেস’ গ্রন্থের বিশ্লেষণে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠন, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। শেখ মুজিবের চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও আইনের শাসনের অভাবে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তদুপরি শেখ মুজিব ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেন। ‘ইজ দি বাংলাদেশ প্যরাডক্স সাসটেইনেবল?’ গ্রন্থের ‘অ্যান ইনস্টিটিউশনাল ডায়াগনস্টিক অব বাংলাদেশ’ অধ্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক বিকাশ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭৫ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ও একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।’

উইলেম ফান শেন্ডেলের ‘আ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ‘ক্রিয়েটিং আ পলিটিক্যাল সিস্টেম’ অধ্যায়ে আলোচিত ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের হত্যাকাণ্ডে দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়।

খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। ২৪ আগস্ট জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান নিযুক্ত হলেও সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একাংশের অসহযোগিতা, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রপতি ভবনকেন্দ্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরো অস্থিতিশীল করে তোলে। তালুকদার মনিরুজ্জামানের ‘বাংলাদেশ ইন ১৯৭৫ : দ্য ফল অব দি মুজিব অ্যান্ড আফটারম্যাথ’ গবেষণাপত্রের বিশ্লেষণে ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির গভীর অস্থিরতার চিত্র ফুটে ওঠে। এ সময় দেশে কার্যত নেতৃত্বের শূন্যতা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের ফলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। ধারাবাহিক অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তোলে। এই ঘটনাপ্রবাহ সাধারণ মানুষ ও সেনা সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এমন নৈরাজ্যকর অবস্থায় ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সাধারণ সৈনিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টের বিশ্লেষণে দেখা যায় সেনানিবাসের ব্যারাকে ব্যারাকে সেদিন বিপ্লবের ফুলকি ছড়িয়ে পড়েছিল। চক্রান্তকারীদের সব চক্রান্ত ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে ৭ নভেম্বর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাজপথ সাক্ষী হয় এক নজিরবিহীন ও অবিস্মরণীয় দৃশ্যের। ট্রাকে ট্রাকে, ট্যাংকের ওপর চড়ে দেশপ্রেমিক সৈনিকরা আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে তাদের বিজয়ের বার্তা ঘোষণা করে। আর রাজপথে নেমে আসে লাখো জনতা। সৈনিক ও জনতা একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে, সেনাট্যাংকের ওপর ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

এ বিষয়ে ‘রক্তাক্ত দিনগুলি’ নামক গ্রন্থে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন লেখেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল জিয়ার বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেশকে নিশ্চিত ধ্বংসের পথ থেকে বাঁচিয়েছিল। সেদিন তাঁর পাশে ঢাকা সেনানিবাসে আমিসহ ২০ থেকে ২৫ জন কর্মকর্তা দাঁড়িয়েছিলাম। সেই সময় অনেক কর্মকর্তা কর্নেল আবু তাহেরের তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হাতে নিহত হয়েছিল। সেদিন শুধু ঢাকায়ই নয়, ঢাকার বাইরেও সৈনিকরা প্রতিরোধ করেছিল। নস্যাৎ হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানচেষ্টা। এই ব্যর্থতার কারণ ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াকে বন্দি করে অভ্যুত্থান ঘটানো। খালেদ মোশাররফ এমনকি তাহেরও হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে সৈনিক ও তরুণ অফিসারদের মধ্যে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।’

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের অর্জন ও তাৎপর্যকে যদি একজন রাজনৈতিক বোদ্ধার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে এর মোটাদাগে কয়েকটি প্রধান দিক আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতীয় জীবনে আমাদের জন্য যা অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক : আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শাণিত হাতিয়ার : ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টারের ১০ নভেম্বর ১৯৭৫-এর কূটনৈতিক বার্তা, ‘লাস্ট উইক ইন বাংলাদেশ ইন রেট্রোস্পেক্ট’ (টেলিগ্রাম ৫৪৭০)-এ তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সম্ভাব্য ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কার কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে অবিনাশ পালিওয়াল তাঁর ‘ইন্ডিয়া’স নেয়ার ইস্ট : আ নিউ হিস্ট্রি’ গ্রন্থের ‘লুসিং দ্য পিস : ফেমিনিন, কপ, অ্যান্ড কাউন্টারকপ ইন বাংলাদেশ’ অধ্যায়ে ৩ নভেম্বর পরিচালিত পাল্টা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর পাশের বৈদেশিক শক্তিগুলোর সম্ভাব্য সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন।

৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল এই সব বৈদেশিক প্রভাবের কাছে নতজানু রাজনৈতিক মানসিকতা প্রত্যাখ্যান করে জাতিরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস ও সার্বভৌম সত্তার পুনর্জাগরণ। দেশবাসীর চেতনায় সেদিন নতুন করে জাগ্রত হয়েছিল স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের দৃঢ় প্রত্যয়। এই চেতনা আজও বাঙালি জাতিকে যেকোনো ধরনের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা, ফ্যাসিবাদ এবং বাহ্যিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।

ভিশনারি রাষ্ট্রনায়কের উত্থান ও জাতীয় আত্মপরিচয় : এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক প্রাপ্তি ছিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে জেনারেল জিয়াউর রহমানের আগমন। যিনি বাংলাদেশকেই শুধু নয়, এই জাতিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মতো একটি পরিচয় দিয়েছিলেন। মার্কিন গবেষক মার্কাস এফ ফ্রান্ডা তাঁর ‘জিয়াউর রহমান’স বাংলাদেশ’ (১৯৭৯) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং রণাঙ্গনে তাঁর সামরিক অবদান তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে স্বতন্ত্র পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়।

৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

ইতিহাস যেন ফিরে ফিরে আসে। এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। কোনো জাতি যখন সংকটে নিক্ষিপ্ত হয়, তখন সেই জাতির পূর্বসূরিরাই তাদের পথ দেখায়। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ছিল যেন সেই বিপ্লবেরই পরম্পরা। হাসিনার দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এ দেশের ছাত্র-জনতার যে স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান, তাতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীরও অকুণ্ঠ সমর্থন সৃষ্টি হয়। ৩৬ জুলাই ঢাকার রাজপথে হাসিনা হটাও জনস্রোত থেকে সেনাদের প্রতি সাধারণ মানুষের পুষ্পবৃষ্টি ও জনগণের প্রতি সেনা সদস্যদের অকুণ্ঠ সমর্থন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে। এ যেন আরেকটি ৭ নভেম্বর।

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর হাজারো গণতন্ত্রকামী মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে মানুষ তার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সেই সঙ্গে জাতি হিসেবে মানুষ ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশি আত্মপরিচয়। জাতিসত্তার এই গৌরবোজ্জ্বল পথচলার নেতৃত্বে সেই সৈনিকেরই পবিত্র রক্তপ্রবাহ। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি আজ দেশের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত। ‘দ্য জিয়াউর রহমান এরা : রিকনসিডারিং বাংলাদেশ ইন পলিটিকস, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড চেঞ্জ’ গ্রন্থে আলোচিত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির প্রেক্ষাপটে বলা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় করা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে ভিত্তি রচনা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন। সরকারের সিগনেচার কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, নারী শিক্ষায় অনার্স স্তর পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তা, বন্ধ মিল চালু করে তরুণদের কর্মসংস্থান, এসব উদ্যোগ তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও সঠিক অগ্রাধিকারের পরিচয় বহন করে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, সরকার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই মন্ত্রিসভার গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ৬২ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এই গতিশীলতা প্রমাণ করে, তাঁর নেতৃত্বে সরকার যথাযথভাবে ও জনকল্যাণমুখী ধারায় কাজ করছে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পর্যন্ত এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা তাই শুধু ব্যক্তির উত্থান বা একটি দলের ইতিহাস নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় আইনের শাসন ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই লক্ষ্যে সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছেন। ৭ নভেম্বরের প্রকৃত শিক্ষা জাতীয় ঐক্যকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা, সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে সেই অঙ্গীকার আজ বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস অমর হোক। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয় আত্মমর্যাদার চেতনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এআই শেয়ারবাজারে ধস, কেন এই আতঙ্ক

প্রাসঙ্গিকতায় ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর

আপডেট টাইম : ৭ মিনিট আগে

ইতিহাসের কোনো কোনো দিন একটি জাতির রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক অভিমুখ ও আত্মপরিচয়ের পুনর্বিন্যাসের সন্ধিক্ষণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন।

উইলেম ফান শেন্ডেল তাঁর ‘আ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ১৮তম অধ্যায় ‘আ স্টেট প্রাসঙ্গিকতায় ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরইজ বর্ন’-এ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ও রাষ্ট্র গঠনের সংকট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশকে রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতির সামনে বাংলাদেশকে নতুন রূপে উপস্থাপন করার সুযোগ পান একজন সেনা কর্মকর্তা। পরবর্তীকালে বিশ্বের বুকে যিনি পরিচিতি পান একজন প্রতিশ্রুতিশীল, উন্নত-আধুনিক চিন্তার দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। একাত্তরের রণাঙ্গনের নেতৃত্ব থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশকে যিনি টেনে তোলার দায়িত্ব নেন এবং এই কাজে যিনি খুব অল্প সময়েই সফল হয়েছিলেন।

স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব খুঁজে পায়। তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এ প্রসঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান তাঁর লেখা ‘কিছু স্মৃতি কিছু কথা’ বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘৭ নভেম্বর গোটা দেশজুড়ে সৈনিক-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব উত্থান ঘটে। আর জেনারেল জিয়া সে অভ্যুত্থানের উত্তাল তরঙ্গমালার শৃঙ্গে আরোহণ করে উঠে আসেন জাতীয় নেতৃত্বের পাদপ্রদীপে।’

নওমি হোসেনের ‘দি এইড ল্যাব : আন্ডারস্ট্যান্ডিং বাংলাদেশ’স আন-এক্সপেক্টেড সাকসেস’ গ্রন্থের বিশ্লেষণে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠন, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। শেখ মুজিবের চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও আইনের শাসনের অভাবে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তদুপরি শেখ মুজিব ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেন। ‘ইজ দি বাংলাদেশ প্যরাডক্স সাসটেইনেবল?’ গ্রন্থের ‘অ্যান ইনস্টিটিউশনাল ডায়াগনস্টিক অব বাংলাদেশ’ অধ্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক বিকাশ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭৫ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ও একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।’

উইলেম ফান শেন্ডেলের ‘আ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ‘ক্রিয়েটিং আ পলিটিক্যাল সিস্টেম’ অধ্যায়ে আলোচিত ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের হত্যাকাণ্ডে দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়।

খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। ২৪ আগস্ট জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান নিযুক্ত হলেও সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একাংশের অসহযোগিতা, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রপতি ভবনকেন্দ্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরো অস্থিতিশীল করে তোলে। তালুকদার মনিরুজ্জামানের ‘বাংলাদেশ ইন ১৯৭৫ : দ্য ফল অব দি মুজিব অ্যান্ড আফটারম্যাথ’ গবেষণাপত্রের বিশ্লেষণে ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির গভীর অস্থিরতার চিত্র ফুটে ওঠে। এ সময় দেশে কার্যত নেতৃত্বের শূন্যতা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের ফলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। ধারাবাহিক অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তোলে। এই ঘটনাপ্রবাহ সাধারণ মানুষ ও সেনা সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এমন নৈরাজ্যকর অবস্থায় ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সাধারণ সৈনিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টের বিশ্লেষণে দেখা যায় সেনানিবাসের ব্যারাকে ব্যারাকে সেদিন বিপ্লবের ফুলকি ছড়িয়ে পড়েছিল। চক্রান্তকারীদের সব চক্রান্ত ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে ৭ নভেম্বর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাজপথ সাক্ষী হয় এক নজিরবিহীন ও অবিস্মরণীয় দৃশ্যের। ট্রাকে ট্রাকে, ট্যাংকের ওপর চড়ে দেশপ্রেমিক সৈনিকরা আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে তাদের বিজয়ের বার্তা ঘোষণা করে। আর রাজপথে নেমে আসে লাখো জনতা। সৈনিক ও জনতা একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে, সেনাট্যাংকের ওপর ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

এ বিষয়ে ‘রক্তাক্ত দিনগুলি’ নামক গ্রন্থে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন লেখেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল জিয়ার বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেশকে নিশ্চিত ধ্বংসের পথ থেকে বাঁচিয়েছিল। সেদিন তাঁর পাশে ঢাকা সেনানিবাসে আমিসহ ২০ থেকে ২৫ জন কর্মকর্তা দাঁড়িয়েছিলাম। সেই সময় অনেক কর্মকর্তা কর্নেল আবু তাহেরের তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হাতে নিহত হয়েছিল। সেদিন শুধু ঢাকায়ই নয়, ঢাকার বাইরেও সৈনিকরা প্রতিরোধ করেছিল। নস্যাৎ হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানচেষ্টা। এই ব্যর্থতার কারণ ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াকে বন্দি করে অভ্যুত্থান ঘটানো। খালেদ মোশাররফ এমনকি তাহেরও হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে সৈনিক ও তরুণ অফিসারদের মধ্যে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।’

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের অর্জন ও তাৎপর্যকে যদি একজন রাজনৈতিক বোদ্ধার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে এর মোটাদাগে কয়েকটি প্রধান দিক আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতীয় জীবনে আমাদের জন্য যা অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক : আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শাণিত হাতিয়ার : ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টারের ১০ নভেম্বর ১৯৭৫-এর কূটনৈতিক বার্তা, ‘লাস্ট উইক ইন বাংলাদেশ ইন রেট্রোস্পেক্ট’ (টেলিগ্রাম ৫৪৭০)-এ তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সম্ভাব্য ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কার কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে অবিনাশ পালিওয়াল তাঁর ‘ইন্ডিয়া’স নেয়ার ইস্ট : আ নিউ হিস্ট্রি’ গ্রন্থের ‘লুসিং দ্য পিস : ফেমিনিন, কপ, অ্যান্ড কাউন্টারকপ ইন বাংলাদেশ’ অধ্যায়ে ৩ নভেম্বর পরিচালিত পাল্টা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর পাশের বৈদেশিক শক্তিগুলোর সম্ভাব্য সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন।

৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল এই সব বৈদেশিক প্রভাবের কাছে নতজানু রাজনৈতিক মানসিকতা প্রত্যাখ্যান করে জাতিরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস ও সার্বভৌম সত্তার পুনর্জাগরণ। দেশবাসীর চেতনায় সেদিন নতুন করে জাগ্রত হয়েছিল স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের দৃঢ় প্রত্যয়। এই চেতনা আজও বাঙালি জাতিকে যেকোনো ধরনের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা, ফ্যাসিবাদ এবং বাহ্যিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।

ভিশনারি রাষ্ট্রনায়কের উত্থান ও জাতীয় আত্মপরিচয় : এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক প্রাপ্তি ছিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে জেনারেল জিয়াউর রহমানের আগমন। যিনি বাংলাদেশকেই শুধু নয়, এই জাতিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মতো একটি পরিচয় দিয়েছিলেন। মার্কিন গবেষক মার্কাস এফ ফ্রান্ডা তাঁর ‘জিয়াউর রহমান’স বাংলাদেশ’ (১৯৭৯) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং রণাঙ্গনে তাঁর সামরিক অবদান তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে স্বতন্ত্র পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়।

৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

ইতিহাস যেন ফিরে ফিরে আসে। এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। কোনো জাতি যখন সংকটে নিক্ষিপ্ত হয়, তখন সেই জাতির পূর্বসূরিরাই তাদের পথ দেখায়। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ছিল যেন সেই বিপ্লবেরই পরম্পরা। হাসিনার দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এ দেশের ছাত্র-জনতার যে স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান, তাতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীরও অকুণ্ঠ সমর্থন সৃষ্টি হয়। ৩৬ জুলাই ঢাকার রাজপথে হাসিনা হটাও জনস্রোত থেকে সেনাদের প্রতি সাধারণ মানুষের পুষ্পবৃষ্টি ও জনগণের প্রতি সেনা সদস্যদের অকুণ্ঠ সমর্থন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে। এ যেন আরেকটি ৭ নভেম্বর।

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর হাজারো গণতন্ত্রকামী মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে মানুষ তার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সেই সঙ্গে জাতি হিসেবে মানুষ ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশি আত্মপরিচয়। জাতিসত্তার এই গৌরবোজ্জ্বল পথচলার নেতৃত্বে সেই সৈনিকেরই পবিত্র রক্তপ্রবাহ। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি আজ দেশের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত। ‘দ্য জিয়াউর রহমান এরা : রিকনসিডারিং বাংলাদেশ ইন পলিটিকস, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড চেঞ্জ’ গ্রন্থে আলোচিত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির প্রেক্ষাপটে বলা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় করা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে ভিত্তি রচনা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন। সরকারের সিগনেচার কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, নারী শিক্ষায় অনার্স স্তর পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তা, বন্ধ মিল চালু করে তরুণদের কর্মসংস্থান, এসব উদ্যোগ তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও সঠিক অগ্রাধিকারের পরিচয় বহন করে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, সরকার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই মন্ত্রিসভার গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ৬২ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এই গতিশীলতা প্রমাণ করে, তাঁর নেতৃত্বে সরকার যথাযথভাবে ও জনকল্যাণমুখী ধারায় কাজ করছে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পর্যন্ত এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা তাই শুধু ব্যক্তির উত্থান বা একটি দলের ইতিহাস নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় আইনের শাসন ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই লক্ষ্যে সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছেন। ৭ নভেম্বরের প্রকৃত শিক্ষা জাতীয় ঐক্যকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা, সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে সেই অঙ্গীকার আজ বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস অমর হোক। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয় আত্মমর্যাদার চেতনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।