ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের একমাত্র বেসরকারি আবাসিক স্কুল

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের একমাত্র বেসরকারি আবাসিক স্কুল। সেবামূলক এই স্কুলে পড়ানো হয় প্রথম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে অষ্টম, নবম থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়ানো হয় মিরপুর আইডিয়াল স্কুলে। তবে এই শিক্ষার্থীরাও এখানকার আবাসিক সুবিধা পায়। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণিতে ৭৫ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে এখানে থেকে পড়াশোনা করছে। তার মধ্যে ৪০ জন মেয়ে আছে আবাসিকভাবে। বাকিরা বাসা থেকে এসে এখানে পড়াশোনা করে
দুটি চোখ না থাকলে পৃথিবী অন্ধকার। এই দেশে দুটি চোখ নেই বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের কঠিন জীবন ভোগ করতে হয়। সেটা যদি হয় নারী তাহলে তো আরো বেশি বিপদ। কোথায় এই নারীদের ঠাঁই হয় বলুন? অনেকেরই ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিতে হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এমন দুঃখী মেয়েদের নিয়ে ভেবেছিলেন ভিনদেশি এক নারী ভ্যারোনিকা অ্যান ক্যাম্পেবেল (Veronica Ann Campbell)। ক্যাম্পেবেলের এদেশে আগমন মিশনারিজ হিসেবে ১৯৭০ সালে।
তিনি এদেশে এসে দেখেন, অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী পথে পথে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত রয়েছে। তিনি জানতে পারেন, এই দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। সে-সব নারীর দুঃখ দূর করার জন্য সে-বছরই পাঁচ জন নারীকে নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান করেন। যেখানে তাদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ার জন্য কিছু কাজ শেখান হয়। এই নারীদের কয়েক বছর শিক্ষা দিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়েও তোলেন।
কিন্তু পরে দেখেন, জেনেটিক ভাবে এদের বাচ্চারাও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করছে। তারপর ১৯৭৭ সাল থেকে ‘ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের আবাসিকভাবে শিক্ষাদান শুরু করেন। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন ক্যাম্পেবেল নিজেই। ১৯৮৬ সালে তিনি নিজ দেশে চলে যান। চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্রেইল পদ্ধতিতে হাজারও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে এ স্কুলের মাধ্যমে। এই স্কুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মেয়েরা পড়ছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের একমাত্র বেসরকারি আবাসিক স্কুল।
সেবামূলক এই স্কুলে পড়ানো হয় প্রথম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে অষ্টম, নবম থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়ানো হয় মিরপুর আইডিয়াল স্কুলে। তবে এই শিক্ষার্থীরাও এখানকার আবাসিক সুবিধা পায়। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণিতে ৭৫ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে এখানে থেকে পড়াশোনা করছে। তার মধ্যে ৪০ জন মেয়ে আছে আবাসিকভাবে। বাকিরা বাসা থেকে এসে এখানে পড়াশোনা করে।
সমাজে নানাভাবে অবহেলিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের দুঃখের কাহিনি দু-একটা অনেকেরই জানা। এখানে করুণ কাহিনি না বলে পারছি না। রিকশাচালক বাবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে পেয়ে কষ্টের বদলে খুশি হয়েছিলেন। মেয়ে যত বড় হয় বাবার স্বপ্ন আরো বড় হয়। মেয়ের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে আসবে অনেক টাকা। এরই মধ্যে বাধ সাধে মেয়েটির মা। মা মেয়েটিকে  ভর্তি করে দেয় এই স্কুলে। এই নিয়ে ঝগড়া করে সংসার ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করে নতুন সংসার পাতে বাবা।
দুঃখিনী মা অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছিল মেয়েটির। সংসারে অভাব থাকলেও এই মা ভেবেছে তার মেয়ের ভবিষত্ নিয়ে। ধনী বাবা-মা হয়তো ভাবেন তার মেয়েকে ঘরে রেখেই বড় করবেন। কিন্তু তারপর মেয়েটির ভবিষত্ কী হবে? এই বিষয়টিও ভাবতে হবে। ধনী ঘরের মেয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলে পরিবার কাউকে জানাতে চায় না। ঘরে রেখেই বড় করে। তারপর তার ভবিষত্ অন্ধকারে তলিয়ে যায়। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল সকল শ্রেণির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অন্য পাঁচটি ইন্দ্রিয় প্রখর থাকে। চোখে পুরোপুরি দেখে না—এমন এক মেয়ে পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে যদি অপরিচিত কাউকে জিজ্ঞেস করে আপনি কে, তখন লোকটি নিশ্চয়ই ভড়কে যাবে। অথবা ওদের দারোয়ান পাশ দিয়ে যেতেই বলে উঠবে, মামা কেমন আছেন? এখানে এটাই স্বাভাবিক। মজার বিষয়, এই স্কুলের মেয়েরা হোস্টেল থেকে দলবেঁধে হাতে হাত ধরে কাছের শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছে। ক্লাস শেষে হোস্টেলে ফিরে এসে নিজের কাজ প্রায় সবই নিজেরা করছে। নিজের নখ কাটা, কাপড় গোছানো, এমনকি জামা সেলাইয়ের কাজটাও করছে নিজেরাই।
নিজে না দেখলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে থাকতে পছন্দ করে। তাদের প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ হচ্ছে রেডিও। এটা দিয়ে দেশ-বিদেশ রাজনীতি ও শিল্প-সাংস্কৃতির সাথে নিজেকে যুক্ত রাখে। তাই প্রতিটি মেয়ের কাছেই একটি রেডিও থাকবেই। এখানের শিক্ষার্থীরা কেউ সাদাছড়ি ব্যবহার করে না। তাদের দেখে কেউ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বলে কল্পনাও করতে পারবে না। ওদের স্কুলের মাঠে ওরা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়—নিয়মিত পথঘাটগুলো চেনার কারণে। বাইরে সাদাছড়ি ব্যবহার করে না তারা। তারপরও কীভাবে কারো সহায়তা নিতে হবে, সে শিক্ষাটা ওদের জানা আছে ভালোই। তারা নিয়মিত কম্পিউটার শিক্ষাগ্রহণ করছে। অনেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্যবহার করছে ফেসবুক।
শিক্ষাকে আলো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাই তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মনোগ্রামে থাকে আলোর চিহ্ন। শিক্ষার সাথে আলো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের শিক্ষার জন্য আলোর দরকার হয় না। ব্রেইল বই তারা পড়তে পারে কোনোরকম আলো ছাড়াই। আলো ছাড়াই আলোকিত তারা। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থী মুসলিম। শহর ও শহরের বাইরের জেলার মেয়েরা একসাথে থেকে পড়াশোনা করছে স্বচ্ছন্দে।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করের নিকটে সেনপাড়া পর্বতায় এই স্কুলে রয়েছে প্রশস্ত মাঠ। চারদিক ফুলের বাগান আর সবুজে ছাওয়া। স্কুলভবন একতলা হলেও দোতলা আবাসিক ভবন। বিশাল খাবার ঘর। সবাই মিলে একসাথে খাবার গ্রহণ করে। দেশের যেকোনো স্থানের, যেকোনো ধর্মের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যদি ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ার অনুমতি পায় সে মেয়েই এই স্কুলে ভর্তি হতে পারে।
ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাপটিস্ট চার্চ সংঘ। শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়া এবং পড়াশোনার খরচ মিশনারিই বহন করত। এখন এটিকে মিশনারির সিস্টার কনসার্ন হিসেবে দেখলেও ফান্ড দেয় না। শুধু পড়াশোনা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিই দেখছে তারা। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পর সে সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পড়া ও থাকা খাওয়ার ফি ধার্য করা হয়েছে। এখানে একজন শিক্ষার্থীর থাকা খাওয়া এবং পড়াশোনা বাবদ মাসিক খরচ ধার্য করা হয়েছে তিন হাজার দুই শত টাকা। কম আয়ের মানুষের জন্য ন্যূনতম ৯০০ টাকা দিতে হয়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ৯০০ টাকা আদায় করা সম্ভব হয় না। অনাবাসিক শিক্ষার্থীও আছে ৪০ জন। সেখানেই তাদের মাসিক সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা খরচ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন ধার্য করায় অনেকেই বাঁকা চোখে দেখেছে। তবে আমি দেখছি এতে শিক্ষার্থীর জন্য মঙ্গলই হয়েছে। আগে একজন শিক্ষার্থীকে এখানে দিয়ে অভিভাবকরা আর খবর নিতেন না। বছরের পর বছর ফেল করলেও এ থেকে উদ্ধারে কেউ কিছু বলতেন না।
এখন যেহেতু প্রতি মাসে ফি দিতে হচ্ছে, তাই অভিভাবকরা এসে খোঁজ নিচ্ছেন তাঁদের মেয়েদের লেখাপড়ার কী অবস্থা। জাপানের জাইকার সহায়তায় শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে দক্ষতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সে হিসেবে জাপানের একজন প্রশিক্ষক এখানে কাজ করেছেন কিছুদিন। সেই প্রশিক্ষক জাপান চলে যাওয়ায় এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশি ফান্ড দিয়েই চলছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় চলছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের এই প্রতিষ্ঠানটি।
আশার কথা, তিন বছর ধরে সরকারিভাবে ব্রেইল বই পাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের সবার হাতে বই তুলে দিতে পারছি। ব্রেইল বই সরকার থেকে পেলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অন্যান্য শিক্ষা-উপকরণ সহজপ্রাপ্য নয়। সেসব উপকরণ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। যার কারণে খরচ আরও বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে তিন মাসের খরচে ঘাটতি থেকে যায়। কষ্ট করেই সেটা মেটাতে হয়।
সেনপাড়া পর্বতায় আবাসিক এলাকার এই স্কুলটিই ছিল একসময় উঁচুতে। এখন চারপাশে উঁচু ভবনের মাঝখানে একটু খোলা জায়গা। বৃষ্টি এলেই স্কুল মাঠে পানি জমে হাঁটু সমান। এই সমস্যা ছাড়া সেবামূলক এই স্কুলটি চলছে নিজের গতিতে। এখানরা শিক্ষকরা সেবা দেয়ার কথা মাথায় রেখেই চাকরিজীবন শুরু করেন। বিশেষ এই শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য তাঁদের আলাদা করে ট্রেনিং নিতে হয়। যাঁরা হোস্টেল তত্ত্বাবধান করেন। তাঁদেরও বিশেষভাবে তৈরি হতে হয়।
ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল থেকে শতাধিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে এসএসসি পাস করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে অনেকেই। এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইইআর অনুষদে লিপি নামের আমাদের এক মেয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রথম বিসিএস-এ শিক্ষা ক্যাডারে এখানের এক শিক্ষার্থী পাস করে ঢাকার একটি কলেজে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। এখান থেকে পাস করে মর্জিনা নামে একজন এনজিও করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের সহায়তা দেয়া হয়।
আমাদের এখান থেকে পাস করে অনেকেই সরকারি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। সেটা ভালো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে একটা মেয়ে কেন টেলিফোন অপারেটর হবে। তার সীমাবদ্ধতা আছে জানি। তারপরও তাদের জন্য আরও কাজের চিন্তা করতে হবে। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের পুনর্বাসনের জন্য ময়মনসিংহে একটি শাখা করেছে। সেখানে তিন জন মেয়েকে কাজ শেখানো হচ্ছে। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করা শেখানো হয়। বড়দিনে এই কার্ড বিক্রয় করা হয়।
ওদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য এটা খুব কাজে আসে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েকে আধুনিক শিক্ষাদানের জন্য আমরা তৈরি আছি। প্রচার-প্রচারণার অভাবে এবং প্রচারে আসতে না চাওয়ার কারণে আমরা অনেক শিক্ষার্থী হারাচ্ছি। আমরা আশাকরি অভিভাবকরা এগিয়ে এসে আমাদের স্কুলে ভর্তি করাবেন এবং তাঁদের সন্তানদের আলোকিত করবেন।
Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের একমাত্র বেসরকারি আবাসিক স্কুল

আপডেট টাইম : ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭
বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের একমাত্র বেসরকারি আবাসিক স্কুল। সেবামূলক এই স্কুলে পড়ানো হয় প্রথম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে অষ্টম, নবম থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়ানো হয় মিরপুর আইডিয়াল স্কুলে। তবে এই শিক্ষার্থীরাও এখানকার আবাসিক সুবিধা পায়। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণিতে ৭৫ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে এখানে থেকে পড়াশোনা করছে। তার মধ্যে ৪০ জন মেয়ে আছে আবাসিকভাবে। বাকিরা বাসা থেকে এসে এখানে পড়াশোনা করে
দুটি চোখ না থাকলে পৃথিবী অন্ধকার। এই দেশে দুটি চোখ নেই বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের কঠিন জীবন ভোগ করতে হয়। সেটা যদি হয় নারী তাহলে তো আরো বেশি বিপদ। কোথায় এই নারীদের ঠাঁই হয় বলুন? অনেকেরই ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিতে হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এমন দুঃখী মেয়েদের নিয়ে ভেবেছিলেন ভিনদেশি এক নারী ভ্যারোনিকা অ্যান ক্যাম্পেবেল (Veronica Ann Campbell)। ক্যাম্পেবেলের এদেশে আগমন মিশনারিজ হিসেবে ১৯৭০ সালে।
তিনি এদেশে এসে দেখেন, অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী পথে পথে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত রয়েছে। তিনি জানতে পারেন, এই দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। সে-সব নারীর দুঃখ দূর করার জন্য সে-বছরই পাঁচ জন নারীকে নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান করেন। যেখানে তাদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ার জন্য কিছু কাজ শেখান হয়। এই নারীদের কয়েক বছর শিক্ষা দিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়েও তোলেন।
কিন্তু পরে দেখেন, জেনেটিক ভাবে এদের বাচ্চারাও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করছে। তারপর ১৯৭৭ সাল থেকে ‘ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের আবাসিকভাবে শিক্ষাদান শুরু করেন। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন ক্যাম্পেবেল নিজেই। ১৯৮৬ সালে তিনি নিজ দেশে চলে যান। চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্রেইল পদ্ধতিতে হাজারও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে এ স্কুলের মাধ্যমে। এই স্কুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মেয়েরা পড়ছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের একমাত্র বেসরকারি আবাসিক স্কুল।
সেবামূলক এই স্কুলে পড়ানো হয় প্রথম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে অষ্টম, নবম থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়ানো হয় মিরপুর আইডিয়াল স্কুলে। তবে এই শিক্ষার্থীরাও এখানকার আবাসিক সুবিধা পায়। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণিতে ৭৫ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে এখানে থেকে পড়াশোনা করছে। তার মধ্যে ৪০ জন মেয়ে আছে আবাসিকভাবে। বাকিরা বাসা থেকে এসে এখানে পড়াশোনা করে।
সমাজে নানাভাবে অবহেলিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের দুঃখের কাহিনি দু-একটা অনেকেরই জানা। এখানে করুণ কাহিনি না বলে পারছি না। রিকশাচালক বাবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে পেয়ে কষ্টের বদলে খুশি হয়েছিলেন। মেয়ে যত বড় হয় বাবার স্বপ্ন আরো বড় হয়। মেয়ের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে আসবে অনেক টাকা। এরই মধ্যে বাধ সাধে মেয়েটির মা। মা মেয়েটিকে  ভর্তি করে দেয় এই স্কুলে। এই নিয়ে ঝগড়া করে সংসার ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করে নতুন সংসার পাতে বাবা।
দুঃখিনী মা অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছিল মেয়েটির। সংসারে অভাব থাকলেও এই মা ভেবেছে তার মেয়ের ভবিষত্ নিয়ে। ধনী বাবা-মা হয়তো ভাবেন তার মেয়েকে ঘরে রেখেই বড় করবেন। কিন্তু তারপর মেয়েটির ভবিষত্ কী হবে? এই বিষয়টিও ভাবতে হবে। ধনী ঘরের মেয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলে পরিবার কাউকে জানাতে চায় না। ঘরে রেখেই বড় করে। তারপর তার ভবিষত্ অন্ধকারে তলিয়ে যায়। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল সকল শ্রেণির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অন্য পাঁচটি ইন্দ্রিয় প্রখর থাকে। চোখে পুরোপুরি দেখে না—এমন এক মেয়ে পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে যদি অপরিচিত কাউকে জিজ্ঞেস করে আপনি কে, তখন লোকটি নিশ্চয়ই ভড়কে যাবে। অথবা ওদের দারোয়ান পাশ দিয়ে যেতেই বলে উঠবে, মামা কেমন আছেন? এখানে এটাই স্বাভাবিক। মজার বিষয়, এই স্কুলের মেয়েরা হোস্টেল থেকে দলবেঁধে হাতে হাত ধরে কাছের শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছে। ক্লাস শেষে হোস্টেলে ফিরে এসে নিজের কাজ প্রায় সবই নিজেরা করছে। নিজের নখ কাটা, কাপড় গোছানো, এমনকি জামা সেলাইয়ের কাজটাও করছে নিজেরাই।
নিজে না দেখলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে থাকতে পছন্দ করে। তাদের প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ হচ্ছে রেডিও। এটা দিয়ে দেশ-বিদেশ রাজনীতি ও শিল্প-সাংস্কৃতির সাথে নিজেকে যুক্ত রাখে। তাই প্রতিটি মেয়ের কাছেই একটি রেডিও থাকবেই। এখানের শিক্ষার্থীরা কেউ সাদাছড়ি ব্যবহার করে না। তাদের দেখে কেউ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বলে কল্পনাও করতে পারবে না। ওদের স্কুলের মাঠে ওরা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়—নিয়মিত পথঘাটগুলো চেনার কারণে। বাইরে সাদাছড়ি ব্যবহার করে না তারা। তারপরও কীভাবে কারো সহায়তা নিতে হবে, সে শিক্ষাটা ওদের জানা আছে ভালোই। তারা নিয়মিত কম্পিউটার শিক্ষাগ্রহণ করছে। অনেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্যবহার করছে ফেসবুক।
শিক্ষাকে আলো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাই তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মনোগ্রামে থাকে আলোর চিহ্ন। শিক্ষার সাথে আলো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের শিক্ষার জন্য আলোর দরকার হয় না। ব্রেইল বই তারা পড়তে পারে কোনোরকম আলো ছাড়াই। আলো ছাড়াই আলোকিত তারা। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থী মুসলিম। শহর ও শহরের বাইরের জেলার মেয়েরা একসাথে থেকে পড়াশোনা করছে স্বচ্ছন্দে।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করের নিকটে সেনপাড়া পর্বতায় এই স্কুলে রয়েছে প্রশস্ত মাঠ। চারদিক ফুলের বাগান আর সবুজে ছাওয়া। স্কুলভবন একতলা হলেও দোতলা আবাসিক ভবন। বিশাল খাবার ঘর। সবাই মিলে একসাথে খাবার গ্রহণ করে। দেশের যেকোনো স্থানের, যেকোনো ধর্মের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যদি ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ার অনুমতি পায় সে মেয়েই এই স্কুলে ভর্তি হতে পারে।
ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাপটিস্ট চার্চ সংঘ। শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়া এবং পড়াশোনার খরচ মিশনারিই বহন করত। এখন এটিকে মিশনারির সিস্টার কনসার্ন হিসেবে দেখলেও ফান্ড দেয় না। শুধু পড়াশোনা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিই দেখছে তারা। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পর সে সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পড়া ও থাকা খাওয়ার ফি ধার্য করা হয়েছে। এখানে একজন শিক্ষার্থীর থাকা খাওয়া এবং পড়াশোনা বাবদ মাসিক খরচ ধার্য করা হয়েছে তিন হাজার দুই শত টাকা। কম আয়ের মানুষের জন্য ন্যূনতম ৯০০ টাকা দিতে হয়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ৯০০ টাকা আদায় করা সম্ভব হয় না। অনাবাসিক শিক্ষার্থীও আছে ৪০ জন। সেখানেই তাদের মাসিক সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা খরচ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন ধার্য করায় অনেকেই বাঁকা চোখে দেখেছে। তবে আমি দেখছি এতে শিক্ষার্থীর জন্য মঙ্গলই হয়েছে। আগে একজন শিক্ষার্থীকে এখানে দিয়ে অভিভাবকরা আর খবর নিতেন না। বছরের পর বছর ফেল করলেও এ থেকে উদ্ধারে কেউ কিছু বলতেন না।
এখন যেহেতু প্রতি মাসে ফি দিতে হচ্ছে, তাই অভিভাবকরা এসে খোঁজ নিচ্ছেন তাঁদের মেয়েদের লেখাপড়ার কী অবস্থা। জাপানের জাইকার সহায়তায় শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে দক্ষতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সে হিসেবে জাপানের একজন প্রশিক্ষক এখানে কাজ করেছেন কিছুদিন। সেই প্রশিক্ষক জাপান চলে যাওয়ায় এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশি ফান্ড দিয়েই চলছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় চলছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের এই প্রতিষ্ঠানটি।
আশার কথা, তিন বছর ধরে সরকারিভাবে ব্রেইল বই পাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের সবার হাতে বই তুলে দিতে পারছি। ব্রেইল বই সরকার থেকে পেলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অন্যান্য শিক্ষা-উপকরণ সহজপ্রাপ্য নয়। সেসব উপকরণ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। যার কারণে খরচ আরও বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে তিন মাসের খরচে ঘাটতি থেকে যায়। কষ্ট করেই সেটা মেটাতে হয়।
সেনপাড়া পর্বতায় আবাসিক এলাকার এই স্কুলটিই ছিল একসময় উঁচুতে। এখন চারপাশে উঁচু ভবনের মাঝখানে একটু খোলা জায়গা। বৃষ্টি এলেই স্কুল মাঠে পানি জমে হাঁটু সমান। এই সমস্যা ছাড়া সেবামূলক এই স্কুলটি চলছে নিজের গতিতে। এখানরা শিক্ষকরা সেবা দেয়ার কথা মাথায় রেখেই চাকরিজীবন শুরু করেন। বিশেষ এই শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য তাঁদের আলাদা করে ট্রেনিং নিতে হয়। যাঁরা হোস্টেল তত্ত্বাবধান করেন। তাঁদেরও বিশেষভাবে তৈরি হতে হয়।
ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল থেকে শতাধিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে এসএসসি পাস করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে অনেকেই। এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইইআর অনুষদে লিপি নামের আমাদের এক মেয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রথম বিসিএস-এ শিক্ষা ক্যাডারে এখানের এক শিক্ষার্থী পাস করে ঢাকার একটি কলেজে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। এখান থেকে পাস করে মর্জিনা নামে একজন এনজিও করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের সহায়তা দেয়া হয়।
আমাদের এখান থেকে পাস করে অনেকেই সরকারি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। সেটা ভালো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে একটা মেয়ে কেন টেলিফোন অপারেটর হবে। তার সীমাবদ্ধতা আছে জানি। তারপরও তাদের জন্য আরও কাজের চিন্তা করতে হবে। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের পুনর্বাসনের জন্য ময়মনসিংহে একটি শাখা করেছে। সেখানে তিন জন মেয়েকে কাজ শেখানো হচ্ছে। ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করা শেখানো হয়। বড়দিনে এই কার্ড বিক্রয় করা হয়।
ওদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য এটা খুব কাজে আসে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েকে আধুনিক শিক্ষাদানের জন্য আমরা তৈরি আছি। প্রচার-প্রচারণার অভাবে এবং প্রচারে আসতে না চাওয়ার কারণে আমরা অনেক শিক্ষার্থী হারাচ্ছি। আমরা আশাকরি অভিভাবকরা এগিয়ে এসে আমাদের স্কুলে ভর্তি করাবেন এবং তাঁদের সন্তানদের আলোকিত করবেন।