আগামী ডিসেম্বরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম প্রায় শেষ। অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা করতে আগস্টের মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে চায় কমিশন। আরও কিছু বিষয় প্রক্রিয়াধীন। তবে আইন সংশোধন না হওয়ায় ইসি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ সীমানা পুনর্নির্ধারণ শুরু করতে পারছে না। এ জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন কিছুদিন আগেই বলেছেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য তাঁদের কাছে অনেক আবেদন আসছে। তিনি তখন বলেন, আইন সংশোধন না করলে আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করা যাবে না।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য ইসিতে আবেদন আসতে শুরু করে। বেশির ভাগ আবেদন করা হয়েছে ২০০১ সালের সীমায় ফেরানোর জন্য। কারণ, ওই বছর কমবেশি ১৫০ আসনের সীমানা কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। আসন বিলুপ্তির ঘটনাও ঘটেছে তখন। ঢাকা-১ আসন থেকে দোহার ও নবাবগঞ্জ সংসদীয় আসন (ঢাকা-১ ও ২) পুনরুদ্ধার কমিটির আবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ সালের নির্বাচনেও দোহার উপজেলা নিয়ে ঢাকা-১ ও নবাবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ঢাকা-২ আসন ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগকে ‘সুবিধা দিতে’ আসন দুটিকে এক করে ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত দোহার উপজেলা এবং ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নবাবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ঢাকা-১ আসন করা হয়। এতে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আসন পুনরুদ্ধার কমিটির আবেদনে আগের মতো দোহার উপজেলা নিয়ে ঢাকা-১ ও নবাবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ঢাকা-২ আসন করার দাবি জানানো হয়।
ফরিদপুরের সদরপুর ও চরভদ্রাসন নিয়ে ফরিদপুর-৪ পুরোনো সংসদীয় আসনটির সীমানা পুনর্বহালের দাবিতেও ইসিতে আবেদন করা হয়েছে। ‘সদরপুর-চরভদ্রাসন সংসদীয় আসন (ফরিদপুর-৪) পুনরুদ্ধার কমিটি’ এই আবেদন করে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত (শুধু ১৯৭৯ সাল ছাড়া) প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ আসন ছিল সদরপুর ও চরভদ্রাসন নিয়ে। তবে ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা উপেক্ষা করে শুধু জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দিয়ে এর সঙ্গে ভাঙ্গা উপজেলা যুক্ত করা হয়।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘৬০টি সংসদীয় আসন থেকে ৪০০-এর মতো আবেদন এসেছে। আমরা এগুলো পর্যালোচনা করছি।’
অন্য যেসব সংসদীয় আসন থেকে রদবদলের আবেদন এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে—ঢাকা-১, ২, ৭, ১২, ১৬ ও ১৯; নারায়ণগঞ্জ-১, ২, ৩, ৪ ও ৫; গাজীপুর-৩; মানিকগঞ্জ-২ ও ৩; কিশোরগঞ্জ-২; সিরাজগঞ্জ-২ ও ৫; গাইবান্ধা-৩; ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ ও ৪; ফেনী-২ ও ৩; নোয়াখালী-১ ও ২; কুমিল্লা-১, ২, ৬, ৯ ও ১০; চট্টগ্রাম-৩, ৪, ৭ ও ৮; সিলেট-৩; চাঁদপুর-১, ২, ৩, ৪ ও ৫; ফরিদপুর-৪; রাজবাড়ী-১, ২ ও ৩; শরীয়তপুর-২; যশোর-২; ঝালকাঠি-২; বরগুনা-১ ও ২; পিরোজপুর-১ ও ২ ইত্যাদি।
সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণে বিদ্যমান আইনি জটিলতা দূর করতে সংশোধিত খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে। সীমানা নির্ধারণে ইসির ক্ষমতা ‘সীমিত হয়ে যাওয়ায়’ ২০২১ সালে পাস হওয়া আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয় কমিশন। গত ২৭ জানুয়ারি ইসির আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটির বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদন করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
ইসি সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে বিদ্যমান আইনের ৪, ৬ ও ৮ নম্বর ধারায় সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মূল সংশোধনটি হচ্ছে ৮(৩) ধারায় উপধারা (১)-এর স্থলে উপধারা (২) করা। বিগত কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন ৮(৩) উপধারায় সংশোধনীর মাধ্যমে সীমানায় বড় ধরনের রদবদলের পথ বন্ধ করেছিল। অর্থাৎ এর ফলে ইসি চাইলেও সীমানায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারত না।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ইসির প্রস্তাবিত ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ খসড়ার বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ জানান, বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সংসদীয় আসনের বিদ্যমান সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে প্রস্তাব পাওয়া গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, বিদ্যমান আইনে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনসংখ্যাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে ঘনবসতিপূর্ণ শহর এলাকায় সংসদীয় আসন বৃদ্ধি পেয়েছে; আবার যেসব এলাকায় জনবসতি কম, সেখানে আসনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান আইনের ৪, ৬ ও ৮ নম্বর ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় ইসির অতিরিক্ত সচিব সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে গতি আনতে সংশ্লিষ্টদের আইন সংশোধনের প্রস্তাবে সুপারিশ করার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি এ সময় উল্লেখ করেন, এ পর্যন্ত ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০২১’-এর বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। সভায় আলোচনার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেশ কিছু পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের ধারণা ছিল জুনের মধ্যে আসন বিন্যাস শেষ করতে পারব। এটার জন্য আইনে কিছু সংশোধনসহ প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। তার চূড়ান্ত কপি আমরা এখনো হাতে পাইনি। এটি সংশোধন হলে আসন পুনর্বিন্যাস করতে পারব। আর না হলে এখন যেভাবে আছে, সেভাবেই নির্বাচন করতে হবে।’